সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ২৫)

বাউলরাজা

তৃতীয় খণ্ড

দূর থেকে আমার চেতনায় রবিঠাকুর গাইতে বসেছেন। তাঁর আলখাল্লায় অযুত রঙের ছোঁওয়া, তার মেঘ বর্ণ দাড়ি মৃদুমন্দ হাওয়ায় তাড়িত হয়ে আপন আনন্দে দুলছে। পেছনে এক আশ্রমকন্যা মোহন বীণার তারে সুর ধরেছেন।
আকাশ আমার ভরলো আলোয়
আকাশ আমি ভরবো গানে
সুরের আবীর হানবো হাওয়ায়
নাচের আবীর হাওয়ায় আনে।

ওরে পলাশ — ওরে পলাশ
রাঙা রঙের শিখায় শিখায়
দিকে দিকে আগুন জ্বালাস
আমার মনের রাগরাগিণী
রাঙা হলো রঙিন তানে
দখিন হাওয়ার কুসুমবনের
বুকের কাঁপন থামে না যে
নীল আকাশে সোনার আলোয়
কচি পাতার নূপুর বাজে।

ওরে শিরিষ — ওরে শিরিষ
মৃদু হাসির অন্তরালে
গন্ধজালে শূণ্য ঘিরিস
তোমার গন্ধ আমার কন্ঠে
তোমার হৃদয় টেনে আনে।

আকাশ আমার ভরলো আলোয়
আকাশ আমি ভরবো গানে।

গান কতক্ষণ শেষ হয়ে গেছে সে আমি জানি না। আমার দুইচোখে তখন তারারা স্বপ্নের ঘরবাড়ি বানিয়ে চলেছে। আর রবিঠাকুর ঘননীল আকাশে হালকা মেঘের আভরণে পূব থেকে পশ্চিমে ভেসে চলেছেন। আমার দুগালে যেন সেই ভেজা মেঘের পরশ লেগেছে। বহুদূর থেকে যেন এক নারীকন্ঠ ভেসে এলো —
” তোমার গন্ধ আমার কন্ঠে, আমার হৃদয় টেনে আনে — কতবড়ো পেমিক চিলেন গো তিনি ঠাকুর!
আমি অনুভব করলাম আমার দুগাল তার আপন হাতের তালু দিয়ে কেউ আমাকে আদর করছে। চোখ খুলে দেখি বাউলনির দুচোখ দিয়ে ধারা বইছে, আর সে আমাকে আদরে আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে।
–” ঠাকুর, আমরা তো জাতে বাউল গো, বালোবাসার মাধুকরীবৃত্তি নিয়ে সংসারে এয়েচি, আর তোমরা, তুমি রবিঠাকুর হচ্ছো অন্তরে বাউল। পকিতি তোমাদের কাচে ভালোবাসার মাধুকরী করতে এসে আঁচল পেতে পেমভিক্ষে করে গো। এ গান যে কে গাইলে সেটাই তো বুজতে পারলুম না। মনে হলো রবিঠাকুর স্বয়ং এসে তোমার কন্টে সুর আর কতা বেঁদে দিয়ে গেলেন। আসলে সুদুমাত্তর গাইলেই হয় না গো ঠাকুর, তোমার মতো গানকে হিদয়ে দারণ করতে হয়।

আমি আমার দুহাত দিয়ে বাউলনির দুগাল মুছিয়ে দিলুম। কে যেন আমার গলায় কথা বলে উঠলো, শুধু গাইলেই সেটা গান হয়ে ওঠে না গো বাউলদিদি, সে বাণী, সে সুরকে যে আপন আত্মায় আত্মস্থ করতে পারে, তার কাছেই সংগীত, সংগীত হয়ে ওঠে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।