T3 সাহিত্য মার্গ || ১৫০ তম উদযাপন || সংখ্যায় প্রদীপ গুপ্ত

খোয়াবনামা ( দুই)
আজ রাতে পুবের জানালা গলে চাঁদটা এসেছিলো আমার পায়ের কাছে। তখন একটা অসম্ভব ক্ষিদে আমার পায়ে মাথা কুটছে।
থলথলে একটা নরম আধাসেদ্ধ কুসুমের মতো দেখতে দেখাচ্ছিলো ওকে। আমি আর ক্ষিদে সহ্য করতে না পেরে ফেললুম ওকে গিলে। তারপর যে কী বিপত্তি কী বিপত্তি!
ভরা পেটে ঢেঁকুর উঠছে সমানে, গলগল করে বেরিয়ে আসছে শব্দ, সেসব শব্দদের কবে যে উদরস্থ করেছিলাম কে জানে! আমি আর বিন্দুমাত্র দেরী না করে শরতের উপহার দেওয়া কাশফুলের কলম বাগিয়ে নীল আকাশের নীলরঙা দোয়াতে ডুবিয়ে নিলাম। সে সময়ই তরতর করে পালতোলা ডিঙির মতো ভেসে যাচ্ছিলো একপাল মেঘ। আকাশের বুক থেকে মেঘেদের নামিয়ে এনে পেতে দিলাম ঘাসে মোড়া উঠোনে, তারপর গলগল করে বেরিয়ে আসা শব্দদের ধরে লিখে চললাম সেই শুভ্রধবল মেঘেদের পাতায়।
কী আশ্চর্য! যে সব শব্দদের আমি কখনও শুনিনি, জানিনি তাদের মর্মকথা, কোত্থেকে যে সেসব শব্দদের লিখে চলেছি আমি! আমি বলাটা ভুল হবে, বরং লিখে চলেছে কলম। কী আশ্চর্য সহজ সরল সে সব শব্দেরা। অথচ কী গভীর! যেন স্বচ্ছতোয়া নির্ঝরিণীতে ফুটে উঠছে স্বর্ণকমল। আর যেন সেই স্বর্ণকমলের ওপর প্রভাতী অরুণের সোনাছেঁচা আলোয় উড়ে বেড়াচ্ছে রঙবেরঙের প্রজাপতি। নির্ঝরিণীর জলের সাথে সোনার বরণ কমলিনীর যে প্রেম, সেই একইরকম প্রেম যেন ফুটে থাকা পঙ্কজের সাথে নবারুণের। প্রজাপতিরাও কেউ কম প্রেমিক নন, আলোর সাথে তাদের রঙিন ডানার প্রেম আবার তাদের একইরকম প্রেম পাঁপড়ি মেলে ধরে উন্মুক্ত অন্তরের পুস্পরাজের সাথে। কে যে কখন পুরুষ আর কে যে কখন নারী সে কি তারাই বুঝে উঠতে পারছে?
ক্রমশ শব্দেরা ফুটে উঠছে মেঘের পাতায়, না জানি হয়তোবা মহাকবি ফের আমার কলমে ভর করে লিখে চলেছেন এক অন্য মেঘদূতম। নয়তো বা কুমারসম্ভবম।
আর আমি শুধু শরতের দেওয়া উপহার কাশফুলের কলম বাগিয়ে বসে আছি।
এমনি সময় কোত্থেকে কীজানি উড়ুৎফুরুৎ করে একদল চড়াই এসে বসলো সেই মেঘের ‘পরে। আর কিচিরমিচির কিচিরমিচির করে খুঁটে খেতে লাগলো শব্দগুলোকে। আমি যে ওদের তাড়াবো সে উপায় নেই, একহাতে কলম আর অন্যহাতে খাতার খুলে রাখা পাতা আঁকড়ে আমি বসে আছি আর দেখে যাচ্ছি দুষ্টু চড়াইগুলোর বনমহোৎসব।
হঠাৎ করে কীযে হলো, একরাশ পূবালি হাওয়া এসে ধাক্কা দিলো জানালার শার্শিতে, জানালাটা গেলো বন্ধ হয়ে, আর,সেই সুযোগে চড়াইয়ের দল, মেঘেদের পাল শরতের দেওয়া কাশফুলের কলম আর পূন্নিমের চাঁদ যে কোথায় চলে গেলো আমাকে ফেলে, আমি বসে রইলেম একা।
শুধু আমাকে ঘিরে পড়ে রইলো সেই আশ্চর্য শব্দেরা। যেগুলো চড়াইয়ের দল খুঁটে খেয়েও শেষ করে উঠতে পারেনি।