সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৩৩)

বাউলরাজা
তৃতীয় খণ্ড
একতাল কাদা যেরকমভাবে কুমোরের হাতে পড়ে দেবী মূর্তি তৈরী করে, একখণ্ড লোহা যেরকমভাবে কামারের হাতে পড়ে কৃষি সরঞ্জাম তৈরী হয়, খিচুরিরও বুঝি সেরকমটা গুমোর আছে। কুড়িয়ে আনা শুকনো পালা আর পাতার চড়বড়ে আগুনে যেভাবে চালডালের মিশেল বাউলনির হাতে পড়ে মধুর বাস ছড়াচ্ছে সে সুবাসকে ঘ্রাণে ধরে পেট চেপে বসে থাকা এককথায় অসম্ভব। ছুটকিকে অনেকদিন বাদে দেখলাম। ও আর সেই আগের মতো খড়ি ওঠা উদোম গায়ের ছোট্টটি নেই। লজ্জাশীলা কিশোরী সে এখন। বুকে পদ্মগোটার অহংকার নিয়ে গ্রীবাভঙ্গিতে সে এখন যেন ভ্রমরা। কৃষ্ণভামার কাছে শান্ত হয়ে বসে পালার জোগান দিচ্ছে।
উঠোনে তিনজন মিলে বসে আছি। বিশুবাউল বসে একমনে তার সুদৃশ্য পেতলের কৌটো থেকে, তামাকের প্যাকেট থেকে তামাক, খৈনীর প্যাকেট থেকে খৈনী, কাটনি – সাফি, কাঠের টুকরো, একটুকরো চামড়া, পাথরের ওপর তামার রিং বসানো কলকে সব বের করে গুছিয়ে বসেছেন।
ওদিকে খিচুরির ভুরভুরে গন্ধ, এদিকে মণিপুরি তামাকের সুবাস কানাইদার মনটাকে যেন একেবারে তুরীয়াবস্থায় টেনে এনেছে।
বিশুবাবুর সৌখিনতা যে শুধুমাত্র তার রিমলেস চশমায় আবদ্ধ হয়ে নেই সেটা বুঝতে পারছি। দীর্ঘদিন সাধুসঙ্গ আর ট্রাক ড্রাইভার খালাসিদের সাথে মিশে এই গঞ্জিকা সেবনের প্রকরণগত কৌশলের দিকগুলো দেখে দেখে আমাকে যথেষ্ট অভিজ্ঞ করে তুলেছে। কিন্তু সে অপূর্ব কৌশল আর মুন্সিয়ানার খেলা এমুহূর্তে বিশুবাউলের গঞ্জিকা প্রস্তুত প্রণালিতে লক্ষ্য করছি সেরকমটা আগে কখনও দেখি নি। হাতের আঙ্গুলগুলো যেন আদর আর সোহাগ মেঘে খেলছে।
— ও ঠাকুর, ওকেনে তোমার কী কম্ম কও দেকি? তুমি তো ওসব ছাইভস্ম চেকে দেকো না, তালেপরে ওকেনে বসে হাঁ করে কী গিলচো শুনি?
কথাটা ষোলো আনা না হলেও চোদ্দ আনা খাঁটি। যে দু আনা বাকী পড়ে রইলো সেটা বিশুবাউলের অপূর্ব শিল্পকৌশল। কিন্তু সেকথা তো আর মুখ ফুটে বলা যায় না।
— তুমি ইদিকে এসো গো। হাঁরে মুকপুড়ি, বলি ঘরের ত্থে একটা মোড়া এনে দে না রে, পদীপদাদার জন্যে।
— যাওগো গোঁসাই, আমাদের সঙ্গ তোমাকে নেশাখোর বাইনে তুলপে গো, তুমি বরং তোমার ছিরাদিকের কাচে গে তেঁনার সঙ্গসুদা পান করো গে যাও।
বিশুবাউলের কথায় আমার কানের গোড়া লাল হয়ে উঠলেও আমার রক্ষাকর্ত্রী আমাকে একা এই জলে ফেলে রাখলেন না।
— ছিরাদিকে নয় গো বাউলদাদা, আমি ঠাকুরের সুভদ্দা বোন হই গো। সেকারণেই তো ওঁর চারপাশে কঞ্চির বেড়া হয়ে বেইড়ে রাকি গো।
ততক্ষণে ছুটকি ঘর থেকে মোড়া এনে, তার ওপর গদি পেতে দিয়ে ফের গিয়ে বাউলদিদির পাশে গিয়ে বসেছে। কৃষ্ণভামার চোখের ইশারায় আমি জায়গা থেকে উঠে মোড়ায় গিয়ে বসলাম।
— বুজলে পদীপদাদা, এই খিচুরি আর তামাকের গন্দ যেন পাগল করে দিচ্চে গো, এ সুময়ে যদি কিচু মনে না করো তালেপরে একটা গান ধরো না গো।
— ও পদীপদাদা, বাউলক্ষ্যাপা যাই বলুক না কেনে তুমি কিন্তু একুনি ধরো না। আমি আমার মনকে দু বাগানে পাটাতে পারবো না গো। আমি আমার হাতের কাজ আগে সেরে লিয়ে সেবনটুকু সেইরে নি। তারপর মন দে তোমার গান শুনপো আর বাউলক্ষ্যাপা খমক আর আমি ডুগডুগি ধরপো। তালেপরেই না খিচুরির ওই মন কেমন করা বাস পেটে গিয়ে গুড়গুড় কইরে ডাক ছাড়পে গো।
—- যাই বলো বিশুদাদা, তোমার মতো বাউলিয়া মন আমি এ জেবনে কমই দেকেচি, কিন্তু একটা কতা কও দিনি, মনগত বাসনা আর একটা বাউলিয়া বাতাস এদের ককনো কি পিঁড়ে পেতে বইসে রাকা যায়?
— সে কতা অবশ্যি ঠিক। তবে আরকি —
— পদীপদাদা, তুমি ধরো কেনে, মন চাইলে সে মনরে বশে রাকা খুপ মুশকিল। তুমি বরং রবিবাউলের ওই গানটা ধরো দিকি, তুমি আমার নয়নে নয়ন রেখো সংশয় মাঝে —
ক্রমশ