সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ১৩)

বাউল রাজা
তৃতীয় খন্ড (ত্রয়োদশ পর্ব)
কানাইদা যখন লজ্জা পান, সেটা একটা দেখার মতো দৃশ্য। লজ্জায় কুঁকড়ে যেতে দেখেছি অনেককে, কিন্তু এরকমটা লাল হয়ে যাওয়া – সত্যিই ভীষণ উপভোগ্য সে দৃশ্য।
– এমন করে কতা কও, যে কতার কোনো মাতামুন্ডু নেই গো। আচ্চা বিশে, তুমিই বলো দেকি, এই অন্দ আমি, আমি কীভাবে জামাকাপড় পচন্দ করি সে কতা কও দেকিনি! এটা তো কিষ্ণভামাই দিলে গো। বললে – কতোদিন বাদে আজ পদীপদাদা আসপে, এসে তোমাকে অগোচালো দেকলে ভাইববে আমি বুজি তোমায় টিকমতো দেইকে শুইন্যে রাকি না। নাও, ধুতি জামা সব নাইমে রাকলুম, স্নান সেরে ওগুলো গায়ে ঝুলিও গো গোঁসাই।
তা কতাটা কি আমি ভুল বইললাম রে? আরে কতা বল না রে কিষ্ণামা।
যেন আতান্তরে পড়ে গেছেন। বড্ড অসহায়ের মতো দেখাচ্ছে বাউলকে। অবশেষে আমাকেই কানাইদার হয়ে ব্যাট করতে এগিয়ে আসতে হলো।
– আমার মনে যে বাউলের বাস সেই বাউলের সাথে আজকের কানাইদা একদম মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সে মেলা বাহ্যিক আড়ম্বরে নয় গো, সে মেলা প্রাণের সাথে প্রাণের মেলবন্ধন। এই যে কানাই বাউল তার একতারায় পিড়িং করতেও ভুলে গেছেন আমার সাথে মিলবেন বলে মনের সে সাজে কজন সাজেন বলো দেখি! সেটাই তো রঙ গো যে রঙে শরীর না, মনটাই রাঙা হয়ে ওঠে।
বাউলনি এতক্ষণ ধরে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এইমাত্র তার শরীরকুসুমলতায় দোলা লাগলো। সে লতা যেন হাওয়ার দাপটে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো লুটিয়ে পড়তে। তার গলায় কুসুমের আঁচল পেচানো। আমি পিছিয়ে আসার সময় পেলাম না। আমার পায়ে সে কুসুমলতা এসে আনত হলো। কী লজ্জা কী লজ্জা! অতগুলো মানুষের সামনে –
– এ তুমি কী করলে বাউলদিদি! আমাকে যে মহাপাতকের দোষে দোষী করলে। আমি যে তোমাকে দিদি বলে ডাকি।
– তোমার দিদি নয় গো ঠাকুর, যে তোমার পদস্পশ্য করলো সে একজন নারী। নারীর তো বয়েস হয় না। আর আমার এ পণাম তো তোমাকে করিনি, তোমার অন্তরস্ত সুন্দরকে করেচি। এতে তো তোমার কোনো দায় নেই পদীপদাদা।
সহসা যেন একটা দমকা বাতাস এসে সে বনভূমিতে আলোড়ন তুললো, যারা উপস্থিত ছিলেন তারা সমস্বরে বলে উঠলেন – জয় রাধে, জয় জয় গো কিষ্ণ মহারাজ।
পাথরের মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছেন কানাই বাউল আর তার দুটো গলে যাওয়া চোখের আঁখিকোটর থেকে সমানে প্রেমাশ্রুর ধারা বইছে।
ক্রমশ…