ভোরের দিকে একবার একটু রোদ উঠেছিল…মাঘ মাসে শীতের শেষবেলায় অসময়ে বৃষ্টি টানা দুদিন ধরে চলছে। ভোরের কচি রোদ দেখে শিবনাথ ভেবেছিল যাক এবার তাহলে বৃষ্টিটা ধরলো…. কিন্তু তা আর হলো কই, আবার বৃষ্টি।
গত দু’দিন ধরে মালতী, রিক্সা নিয়ে শিবনাথকে বেরোতে দেয়নি কিন্তু আজ আর ঘরে বসে থাকলে হবে না… ঠান্ডা গরমের ধাত শিবনাথের, অসময়ের বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর বাঁধিয়ে বসবে তাহলে তো সাতদিন ঘরে বসে যেতে হবে…. দিন আনা দিন খাওয়া সংসার, রিক্সা চালিয়ে, মহাজনের ভাড়ার টাকা মিটিয়ে যেটুকু হাতে থাকে তা দিয়েই টানাটানির সংসার…বউটা হিসেবি… লক্ষ্মীমন্ত, তাও এই মাগ্গীগণ্ডার বাজারে এই সামান্য রোজগারে সংসার চালাতে মালতীর যে কষ্ট হয়, মুখে না বললেও শিবনাথ সেটা বোঝে। অটোরিকশার দাপটে রিক্সার বাজার এমনিতেই পড়তি… এর ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা, রিক্সা ইউনিয়ন তিন মাস অন্তর বর্ধিত হারে ভাড়া বেঁধে দিচ্ছে… দায়ে না পড়লে বেশি ভাড়া দিয়ে রিক্সার সওয়ারি কেউ হতে চায়না। মহাজনের কাছ থেকে ভাড়ার রিক্সা নিয়ে পাঁচ বছর এ লাইনে কোনোরকম টিকে থাকা। দুঃখ হয় শিবনাথের একসাথেই তো লাইনের রিক্সা চালানো শুরু…. মাধবের মত তিনটে রিক্সার মালিক না হয় নাই হলাম কিন্তু তারক দাস বা শম্ভু সাঁতরার মত নিজের একটা রিক্সাই বা হল কই। গড়িয়াতে মন্ডল এন্টারপ্রাইজের বিশাল দোকানটাতে গিয়ে কতবার নতুন রিক্সার দাম জেনেছে সে, আগে সাইকেল রিক্সার দাম করত এখন তো ব্যাটারি লাগানো ই-রিক্সাও পাওয়া যাচ্ছে…. দামটা বেশ বেশিই পড়ে- চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজারের মত কিন্তু ছোটে জোরে আর সেভাবে তো প্যাডেল করার দরকার হয়না ফলে ঘাম ঝরানো কষ্টটাও নেই। শিবনাথ স্বপ্ন দেখে নিজের একটা রিক্সা “মেরি জান”… মনের মতো করে সাজাবে তাকে, বাহারি নক্সা আঁকাবে রিক্সার পিছনে, হুডে, এলইডি বাতি লাগাবে, সিট হবে উজ্জ্বল রঙের নকশা ছাপা …. যখন চলবে সবাই তাকিয়ে দেখবে বটে…. একটা চাপা গর্বের অনুভূতির মধ্যে থেকে বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে,ভাবে ঠাকুর কি শুধু অন্ধকারই লিখেছ তার জন্য, দিন বুঝি আর ফুটবেনা!
লকডাউন কেটে গেলেও বাচ্চাদের স্কুলগুলো এখনও খোলেননি তার ওপরে বৃষ্টির দিন সকাল সকাল সওয়ারি পাওয়া মুশকিল একটু বেলা করেই রিক্সা নিয়ে বেরোনো ভালো….মালতী বলে “রান্না চাপিয়ে দিচ্ছি..একেবারে দুটো ভাত মুখে দিয়ে তারপর বেরোও “
শিবনাথ ভাবে সেই ভালো দুপুরে তাহলে আর ফিরতে হয় না…. ভালো ভাড়া পাওয়া যায় যদি তবে সব সেরে একেবারে সন্ধ্যা কাটিয়ে ফেরা যাবে।
অন্য দিন দুপুরে খেতে বাড়ি ফেরে শিবনাথ… মালতীর সঙ্গে খেতে খেতে দু পাঁচ কথা হয়, হয়তো সেদিনের ভাড়ার হাল হকিকত শোনায় মালতীকে। সারাদিন যেমন তেমন, সন্ধ্যা গড়িয়ে যখন রাত নামতে থাকে তখন ঘরে ফেরার তাড়া লাগে শিবনাথের, মালতীর জন্যে মন টানে তার… দিন শেষে সেদিনের রোজগার বউয়ের হাতে দিতে পারলে তবেই শান্তি । রোজ একই রুটিন।
পথেই সওয়ারি মিলে গেল…ছাতা মাথায়, গায়ে শাল জড়ানো, ডান কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে মাঝবয়েসি এক মহিলা হিমশিম খাচ্ছে…
“রিক্সা রিক্সা ” ডাক শুনে শিবনাথ দাঁড়িয়ে পড়ল
“মাস্টারদা সূর্যসেন মেট্রো ষ্টেশনে যাব, এই বৃষ্টিতে আমাকে পৌঁছে দিতে হবে ভাই… বাস, অটো কিছুই পাচ্ছি না”! মহিলার কথা শুনে শিবনাথ মনে মনে ভাবে বাঁশদ্রোনী উল্টো পথে, ওদিকে ষ্টেশনটা অনেকটাই দূরে, যাওয়ার ইচ্ছে ছিলনা তবে মহিলার করুণ অবস্থা দেখে শিবনাথ ভাবে একটু বেশি ভাড়া পাওয়া যাবে… দুর্দিনের বাজারে হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা বুদ্ধিমানের কাজ হবেনা।
মেট্রো স্টেশনে ঢোকার মুখেই বাস স্ট্যান্ড, সার সার দিয়ে ২০৫ নম্বর বাস দাঁড়িয়ে আছে একদিকে অন্য দিকটা কর্পোরেশন থেকে খুঁড়েছে, মাটির নীচে কি সব কাজ চলছে রিক্সা ঢুকবেনা…ওই পর্যন্তই পৌঁছান গেল। বৃষ্টিটা এবারে ধরলো মনে হয়। মহিলা একটা পঞ্চাশ টাকার নোট শিবনাথের দিকে বাড়িয়ে বললে “খুব উপকার করলে ভাই, এই টাকাটা তুমি রাখ”। ভাড়ার ওপর দশ টাকা বেশি পাওয়া গেল, মন্দ কি! এই দুর্যোগের দিনে এটা তার ন্যায্য পাওনা … শিবনাথ মনে মনে ভাবল।
ভাড়া চুকিয়ে মহিলা পা চালিয়ে এগিয়ে গেলেন মেট্রো ধরার তাড়া আছে মনে হয়। নাহ্ এবার বিড়িতে একটা সুখটান না দিলেই নয়। বিড়ির নেশাটা কিছুতেই ছাড়ছে না তাকে…. মালতী রাগ করে…. এ নেশার ফলে বুকে রোগ ধরলে আর রক্ষা নেই। বউকে লুকিয়ে খেতে হয়…. চোখ এড়িয়ে রিক্সার সিটের নীচে সযত্নে রাখা থাকে এক বান্ডিল, নেশা চাগালে বার করে নেয়….
রিক্সার সামনে পলিথিনের পর্দাটা এখনও ঝুলছে… সিটটা তুলে একটা বিড়ি বার করতে হবে… গুটিয়ে রাখবার জন্যে পর্দাটা হাতে ধরে সরাতেই চোখে পড়ল সিটের একপাশে রাখা কালো রঙের ব্যাগটার দিকে…. আরে মহিলার ডান কাঁধেই তো ঝুলছিল ব্যাগটা, সেরকমই তো চোখে পড়েছিল…কি করি এখন… এক মুহূর্ত দেরি নয়… ব্যাগটা হাতে নিয়ে শিবনাথ ছুটে গেল ষ্টেশনের দিকে… যদি দেখা মেলে…
নাহ্ মহিলার দেখা পাওয়া গেল না। কি রকম বেখেয়ালের মানুষ রে বাবা, চিনিনা জানিনা এখন তাকে খুঁজে পাবো কোথায়? চিন্তায় পড়ে সে…কি আছে ব্যাগের ভেতর? খুব দরকারি কিছু? ব্যাগের মধ্যে কি ঠিকানাটা মিলতে পারে? মুখের চেনটা খুলবে কি খুলবেনা… কিছুক্ষণ ভাবলো শিবনাথ … মধ্যে যদি কোনো দামি জিনিস থেকে থাকে? কি করবে সে? নিয়ে নেবে? কিন্তু….
খানিকটা দোনামোনা করেই ব্যাগের চেনটা টেনে খুলে দিল সে…শিবনাথ চমকে উঠল… এ কি দেখছে সে! একশো টাকার নোটের বান্ডিল… এক.. দুই.. তিন… চার… মানে চল্লিশ হাজার টাকা? নিশ্চই দরকারের টাকা…ফেরাবে কি ভাবে?…যদি ফেরাতে না পারে! এ টাকা কি তাহলে তার? বিশ্বাস হচ্ছে না যে! বুকের মধ্যে উত্তেজনা টের পাচ্ছে সে। এর আগে শুনেছে ব্যাগ ভর্তি টাকা কোনো ট্যাক্সিওয়ালা পেয়েছে, কোনো যাত্রী ফেলে নেমে গেছে… ফেরতও দিয়েছে, তাতে কখনো সখোনো ভালো বকশিশ ও জুটেছে চালকের ভাগ্যে। এতো টাকা একসাথে তো কোনোদিন চোখেই দেখেনি…কি করবে এই টাকা দিয়ে? নতুন রিক্সা… নিজের একটা রিক্সা… স্বপ্ন… পাগল পাগল লাগছে । কি করবে এখন শিবনাথ? রিক্সার ঠেকে গিয়ে জানাবে? মালতীকে বলবে? থানায় গিয়ে পুলিশকে জানাবে?.না না কাউকে কিছু জানানোর দরকার নেই এখনি… চিন্তাগুলো কেমন সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
তাড়া খাওয়া মানুষের মত রিক্সায় উঠে বসলো শিবনাথ… প্যাডেলে চাপ দিল…. তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে!
**********
আড়াই দিন পরে বৃষ্টি থেমেছে.. একটু যেন রোদের ঝিলিক দেখা যাচ্ছে মালতী ভিজে স্যাঁতসেঁতে জামাকাপড় গুলো বাইরের এক চিলতে খোলা জায়গায় টাঙানো দড়িতে মেলে দিচ্ছিল, কানে এলো শিবনাথের রিক্সার শব্দ… এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলো মানুষটা?
বলে বেরোল তো সন্ধ্যা পেরিয়ে ফিরবে, তাহলে হয়তো সওয়ারি হয়নি তাই ফেরত চলে এসেছে।
রিক্সাটা সামনের উঠোনে পাশে রেখে শিবনাথ ডাকল, “মালতী একবার ঘরে এসো, কথা আছে”, বলেই তাড়াতাড়ি ভিতরের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
ঘরে এলো মালতী, ঘরের মাঝে একটা ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে শিবনাথ। মালতী শুধোলো ‘কী?’
একটু থতমত খেয়ে শিবনাথ বলল, “এই দ্যাখো”… শিবনাথ ব্যাগের মধ্যে থেকে বের করে নিয়ে এলো একটা একশো টাকার নোটের বান্ডিল। গরীব ঘরের মেয়ে মালতী, এতো টাকা কোনো দিন একসাথে দেখেনি…”এতো টাকা? কোথায় পেলে?”
চোখ বড় বড় করে মালতী দেখে শিবনাথকে। ব্যাগের ভেতর থেকে টাকার বান্ডিল গুলো বের করতে করতে শিবনাথ বলে, “এক মহিলা সওয়ারি আজ রিক্সাতে ব্যাগটা ফেলে নেমে গেছে, কোনো দিনও আগে এ চত্বরে দেখিনি তাকে …. বুঝতেই পারছিনা এতগুলো টাকা ফেলে গেল কেমন করে? ভুল করে? এমন ভুল কেউ করে”?
– “ব্যাগের মধ্যেটা ভালো করে দেখেছ? কোনো ঠিকানা বা ফোন নম্বর আছে কি?” মালতী শুধোয়।
– “না” মাথা নাড়ে শিবনাথ।
– “তা টাকাগুলো নিয়ে এখন কি করবে?”
– “আজ তোমার কাছে রেখে দাও, কাল সকালে যা করার দেখা যাবে…কথাটা কিন্তু আবার এ কান ও কান কোরো না… দিনকাল ভালো নয়”। মালতী বিছানার তোষকের তলা থেকে চাবি বার করে বাক্স খুলে ব্যাগটা রেখে দিল।
রাতে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কথা হলো অনেক… কদিন অপেক্ষা করে দেখব…নাকি কালই নতুন রিক্সা কিনে আনবো…ই-রিক্সার দাম অনেক, অত লোভে কাজ নেই…তিন চাকার একটা নতুন সাইকেল রিক্সার কথাই তো মনে মনে ভেবেছি এতোদিন…তাহলে আর শুভ কাজ ফেলে রেখে কাজ কি? তাছাড়া সে মানুষটা শিবনাথ কে খুঁজে পাবে কোথায়… মাঝপথের সওয়ারি কোন লাইনের রিক্সা তাও তো তেনার জানা নেই…চিন্তায় পড়ল শিবনাথ।
মালতী বলল “ঠাকুর যখন পাইয়েই দিল তখন একটা রিক্সা নিয়েই ফেল…দেরি করে আর কি হবে?”.
…”হক কথা বলেছ, ঠাকুরই পাইয়ে দিয়েছে”।
**********
সকালে বিছানা ছাড়তে দেরি হল। সারারাত মনের দোলচালে দুচোখ এক করতে পারেনি শিবনাথ…ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। আজ দিনটা ভালো বিষ্যুৎবার, সব কিছু ভালোয় ভালোয় মিটলে নতুন রিক্সাতে চাপিয়ে মালতীকে নিয়ে মায়ের মন্দিরে পূজো দিয়ে আসা যাবে। শিবনাথ গেল রিক্সা কিনতে….ফিরে এলো হাসি মুখে….বলল “অনেক দর দাম করে শেষে তের হাজারে রফা হলো! বুঝলে মালতী, সস্তাই হলো…. আমি তো ভেবেছিলাম পনের হাজার লেগে যাবে”।.
হাসতে হাসতে শিবনাথ বলে “এ হলো ‘মেরি জান’ বুঝলে! মনের মত করে সাজাতে হবে, তবেই বাহার খুলবে…মাধব, শম্ভু, তারকদের চোখ টাটাবে, ভাববে হয়তো, শিবনাথ টাকা পেল কোথা থেকে…সে তখন একটা কিছু বলা যাবে যাহোক….এ আমার বহুদিনের ইচ্ছা পূরণ, বাকি টাকায় তোমাকে এক জোড়া সোনার কানপাশা গড়িয়ে দেব”।
মালতীর যেন কেমন ভয় করে, বলে “তুমি সব টাকা শেষ করে ফেলবে”?
“মনের সাধ মেটানোর সুযোগ যখন ঠাকুর একবার করেই দিলেন, শেষ পর্যন্ত সে শখ মিটিয়েই নেব”।
মালতী যেন খুশি হতে পারেনা, মনের আশঙ্কা কমতেই চায় না তার।
তার স্বামী তো চুরি করেনি, তবে? ভাগ্যে এসেছে… এ টাকা তো তাহলে তাদেরই, তবে আর হাত গুটিয়ে বসে থাকা কেন?
খাওয়া দাওয়া সেরে ওরা আজ মন্দিরে যাবে পূজো দিতে… মালতী তাড়াতাড়ি সংসারের কাজ সেরে নিচ্ছে… শিবনাথের বুকের খাঁচায় সুখ খেলছে। এমন সময়…সামনের এক চিলতে উঠোনে কাদের যেন জুতোর শব্দ। চমকে ওঠে শিবনাথ…..দরজা খোলা ছিল…. পুলিশের পোশাক পরা দুজন ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে….তাদের পিছু পিছু কালকে দেখা মাঝবয়সী সেই মহিলা।
-“তুই শিবনাথ”? শক্তপোক্ত চেহারার পুলিশ প্রশ্ন করে।
– শিবনাথের মাথাটা যেন অসাড় হয়ে যাচ্ছে, গলা যেন কেউ চেপে ধরেছে, শুকনো গলায় জবাব দেয় “হ্যাঁ বাবু, আমিই শিবনাথ”।
– হাত দিয়ে মহিলাকে দেখিয়ে বলে..”দেখতো এনাকে চিনতে পারিস কিনা”?
-“চিনি বাবু, কাল উনি আমার রিক্সাতে চড়েছিলেন”
-“ইনি তোর রিক্সাতে একটা ব্যাগ ফেলে রেখে নেমে গিয়েছিলেন, তুই পেয়েছিস সেটা”?
শিবনাথ নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল, কোন কথা না বলে কেবল মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দিল যে ব্যাগটা সে পেয়েছে।
মহিলা তখন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল শিবনাথকে… হয়তো বা ওর হতদরিদ্র অবস্থাকেও।
-“ব্যাগের ভিতর চল্লিশ হাজার টাকা ছিল….সব ঠিকমত আছে নিশ্চয়ই…ব্যাগটা তাহলে এবার নিয়ে এসো তো বাবা”, গোলগাল, বেটে চেহারার পুলিশ নির্দেশ দিল শিবনাথকে।
ভীত শিবনাথ, সারা শরীরে যেন কাঁপন লেগেছে।
“একটু দাঁড়ান বাবু, এখুনি নিয়ে আসছি”।
ভিতরের দিকে যেতে গিয়ে চোখ গেল মালতীর দিকে….শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে সে দরজার আড়ালে । মুখ নীচু করে মালতীর একেবারে কাছে গিয়ে কাঁপা গলায় বলল… “সর্বনাশ হয়ে গেছে মালতী ! ও টাকার অনেকটাই তো খরচ করে ফেলেছি…. পুলিশ যে এবার আমায় ধরে নিয়ে যাবে”।
মালতী ভাবে, তার স্বামী কি খুব অন্যায় করেছে? মহিলা তো নিজের দোষেই ওটা ফেলে গিয়েছিল, ফেরত দেবে বলে তো সে ছুটেও গিয়েছিল, তাহলে?
নিজেকে শক্ত করে।
শিবনাথকে ভরসা দেয়, বলে, “তুমি কোন অন্যায় করোনি….সত্যি কথাটাই বলবে”।
টিনের বাক্সর মধ্যে থেকে ব্যাগটা বার করে নিয়ে এলো শিবনাথ, পুলিশ দুজনের সামনে এসে দাঁড়াল, মালতী তার পেছনে । শীতের দুপুরের মরা রোদ।
ঘরটা যেন কেমন আবছা অন্ধকার হয়ে আছে। সামান্য দাঁড়িয়ে শিবনাথ ডাকলো “বাবু”!
পুলিশ দুজন তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকাল শিবনাথের দিকে।
মহিলার মুখে যেন শীতের কুয়াশা ছেয়ে আছে।
কি রকম অস্বস্তি যেন গলায় চেপে বসেছে শিবনাথের, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। তবুও শেষ পর্যন্ত সে বলল “এই ব্যাগে তের হাজার বাদ দিয়ে সব টাকাটাই আছে বাবু”।
-“মানে? এক রাতের মধ্যেই তের হাজার গায়েব করেছিস”?
মহিলা ভুরু কুঁচকে শিবনাথকে দেখছে… চোখে মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। এবার শিবনাথ আর্ত চিৎকার করে মহিলার পা চেপে ধরলো।
“মা আমায় মাপ করুন, আমি ওই টাকায় একটা নতুন রিক্সা কিনে এনেছি… আজকেই এনেছি…মিথ্যা বলছিনা…ওই দেখুন… দেখুন বাইরে রাখা আছে”।
পুলিশ অফিসার দাঁত চেপে
ব্যঙ্গাত্মক গলায় বললো -“তা এর মধ্যে রিক্সা কেনাও হয়ে গেল? কাজের কাজ তো সেরে ফেলেছিস, একেবারে তৈরী ছেলে দেখছি! কিন্তু বাছা টাকাটা তো এনাকে এবারে তোকে ফেরত দিতে হবে”.. শিবনাথ অসহায় ভাবে তাকিয়ে থাকে, মনে হয় কেউ যেন কালি লেপে দিচ্ছে ওর মুখে।
-“শালা শুয়ারের বাচ্চা…চোর!” অফিসার তেড়ে যায় এবং
-“বিশ্বাস করুন আপনারা…আমি গরীব কিন্তু চোর নই”।
ফ্যাকাসে মুখ.. ভেঙে পড়ে শিবনাথ।
– “জানিস না , কুড়িয়ে পাওয়া টাকা থানাতে জমা করতে হয়?”
– “জানি বাবু, সব জানি! স্বপ্ন…বাবু স্বপ্ন! নিজের একটা রিক্সা হবে এই স্বপ্ন যে আমি সেই কবে থেকে দেখেছি বাবু! টাকাটা পেয়ে নিজেকে সামলাতে পারিনি … বিশ্বাস করুন ব্যাগটা পেয়ে ছুটে গিয়েছিলাম যদি ধরতে পারি ওনাকে, পাইনি।…লোভ করেছি, মানছি পাপ হয়েছে! আসল কি জানেন বাবু, গরীব হওয়াটাই পাপ, গরীবের স্বপ্ন থাকতে নেই”।
-“ও সব ছেঁদো কথায় লাভ নেই… কারুর মন ভিজবে না , এখন টাকাটা কিভাবে দিবি সেটা বল”।
হুঙ্কার দিয়ে ওঠে পুলিশ অফিসার, শিবনাথ ভয়ে কাঁপতে থাকে
মালতী বলে, “একবার দেখনা মন্ডলের দোকানে গিয়ে, আজকেই তো এনেছ, সব শুনে ওরা যদি রিক্সাটা ফেরত নেয়”!
মহিলার মুখে কোনো কথা নেই, তাকিয়ে দেখছেন স্বামী-স্ত্রীকে…ওদের মনের ব্যথা কি তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে? কি জানি..কি বিচিত্র এই মনের খেলা!
মন্ডল এন্টারপ্রাইজের মালিক, সুকুমার বাবু সব শুনে রাজি হলেন রিক্সা ফিরিয়ে নিতে। ব্যাগসহ পুরো টাকা ফেরত পেয়ে মহিলা বললেন -“আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা আমার নেই…টাকাটা যখন পেয়ে গেলাম তখন শিবনাথের বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগ আমি তুলে নিতে চাই, ওকে ছেড়ে দিন আপনারা” গলায় আকুতি।
**********
সব মিটিয়ে ঘরে ফিরতে রাত হল শিবনাথের, স্বপ্ন ভাঙ্গার বেদনা, তার সাথে অপমানের জ্বালা যেন কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে।
সে রাতে বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে মালতী বলে শিবনাথকে -“যা হয়েছে ভালোই হয়েছে”
…হয়তো নিজেদের ভোলাতে চায়,তাই এ কথা।
মালতীর হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে শিবনাথ বলে -“আমি যে পাপ করেছি, সেটা তো একবার ও বললে না”।
অন্ধকার ঘরে মালতী শুধু একবার বলে, “না”।
জবাব দিল না শিবনাথ।
সামান্য পরে মালতী বলে, “তুমি কোন পাপ করোনি, স্বপ্ন দেখা পাপ নয়, ফেলে যাওয়া টাকা তুমি ফিরিয়ে দিয়েছ, সেটা কে কি পাপ বলে?.. ভালোই হয়েছে.. বাঁচা গেছে”।
শিবনাথ চুপ করে রইলো।
মালতী বোধহয় ঘুমিয়ে পড়ল, শিবনাথ ঘুমাতে পারছিল না।
বুকের ভয়টা এখনো তাজা…মালতীর ডাকে ধড়পড় করে উঠে বসে, চোখে মুখে জল দিয়ে কোনোরকমে উঠোনে গিয়ে দাঁড়ায় শিবনাথ, তখনো কুয়াশা মাখা সকালে ভালো করে রোদ ওঠেনি… দু’জন মানুষ অপেক্ষা করছে তার জন্য, একজন তো কালকের মহিলা, তার সঙ্গে হলুদ রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা বছর কুড়ি বাইশের একটি মেয়ে, চোখে চশমা। শিবনাথের কাছে আর তো কিছু নেই!
তবে এরা এতো সকালে এখানে?
কি চায় তার কাছে!
মেয়েটি এগিয়ে এলো শিবনাথের দিকে, পাশে দাঁড়িয়ে আছে মালতী…. হঠাৎ তার হাত দুটো ধরে মেয়েটি বলল, “কালকের ঘটনা সব আমার মায়ের কাছে শুনেছি! আমারা হরিদেবপুরে থাকি, আমার বাবা নেই, সামনের ফাল্গুনে আমার বিয়ে, সেই কারণেই দল কিছু জরুরী কেনাকাটা করবার জন্য টাকার দরকার ছিল, আমার মা তাই এদিকের ব্যাঙ্কে এসে টাকা তুলে নিয়ে ফিরবার সময় অসাবধানে সেটা ফেলে যায় আপনার রিক্সাতে”।
মেয়েটির কথাতে অন্যায়বোধটা নতুন করে যেন আবার চেপে ধরল শিবনাথকে…. হাত জোড় করে সে তখন প্রাণপণে বলতে থাকে,”ক্ষমা করুন, বিশ্বাস করুন আমি চোর নই.. ভুল হয়েছে আমার… আমার উচিত ছিল আরো ক’দিন দেখা! কিন্তু পুরো টাকাই তো ফিরিয়ে দিয়েছি, আমার কাছে তো আর কিছুই নেই”….তার মনের আকুতি আর্তি হয়ে যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। ঘটনার আকস্মিকতায় মালতী যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে, মনের কোণে আশংকার মেঘ, আরো না জানি কত হেনস্থা লেখা আছে তাদের কপালে।
ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলেন শিবনাথের দিকে… মুখে আজ আর কোনো কুয়াশার ছায়া নেই…হাসি মুখে বললেন..”না শিবনাথ, তুমি কোনো পাপ করোনি, অন্যায়, অধর্ম কোনোটাই করোনি, কষ্ট পেয়না তোমরা…আমরা দুজন আজ এসেছি, তোমার নতুন রিক্সাটা তোমাকে ফিরিয়ে দিতে”।
এ কি শুনছে ওরা!….
“আমার মেয়ের বিয়েতে কেনাকাটার খরচা না হয় কিছু কম হবে… মেয়েরও সেটাই ইচ্ছা….এই খামটা তোমরা রাখো, এর মধ্যে তের হাজার টাকা আছে, তুমি এই টাকা দিয়ে যদি রিক্সাটা ফিরিয়ে আনতে পার, বড় ভালো লাগবে তাহলে আমাদের”!
কথা সরেনা স্বামী-স্ত্রীর মুখে……
ওরা দাঁড়িয়ে আছে স্তব্ধ হয়ে, মা আর মেয়ে ফিরে যাচ্ছে…
উঠোনে দাঁড়িয়ে শিবনাথ আর মালতি ভিজে চোখে অপলকে চেয়ে দেখছে ওদের… আকাশের গায়ে সূর্য তখন সোনালি আলো ছড়াতে শুরু করেছে।