সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত

বাউল রাজা

দ্বিতীয় খন্ড (চত্বারিংশ পর্ব)

বুকভরা ধোঁয়া। ছাড়তে ইচ্ছে করছে না কিছুতেই। কিন্তু ইচ্ছে তো একজনেরই। বাকি সব ইচ্ছেরাই সেই ইচ্ছের মালিকের দাসানুদাস। নাক মুখ থেকে জ্বলন্ত ভিসুভিয়াসের মতো করে লাভা উদগীরণ শুরু হলো।
আমার মনে তখন প্রেম। একটা গর্ভের ছবি ফুটে উঠছে মানসচক্ষে। সেই গর্ভে যে বীজ শুয়ে আছে, গর্ভধারিণী সেই বীজকে অনুভব করছেন, কিন্তু গোচর করছেন না। প্রেমের মহিমাই এমন। ” তারে চোখে দেখিনি, শুধু বাঁশী শুনেছি, ” মনপ্রাণ সঁপে দিয়ে তারই অপেক্ষা করা।
তার শরীর থেকে খাদ্য গ্রহণ করে তিলে তিলে বেড়ে উঠছে সেই বীজরূপী ভ্রুণ। যিনি বহন করছেন, যোগান দিয়ে চলেছেন খাদ্যের, তিনি বুঝতেই পারছেন না তাঁর যোগান দেওয়ার কথা।
আহা — প্রেমের কি অপূর্ব বিস্তার! দাতা ও গ্রাহকের কি অপূর্ব সুন্দর লীলা! দান বোঝে না লালন বোঝে। গ্রহণ বোঝে না যাপন বোঝে।
–” একই কথা কিন্তু পরমব্রহ্মর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। “
মানে! এ কথাটা কি কেউ উচ্চারণ করলেন, নাকি আমার মনেই উচ্চারিত হলো?
–” ধাত্রী, যিনি ধারণ করেন, আমাদের জ্ঞানে তিনি জননীরূপিনী। কিন্তু এই যে পৃথিবী, সূর্য, চাঁদ, তারা, সারা আকাশ জুড়ে লক্ষ কোটি নক্ষত্রমন্ডল, ছায়াপথ ছড়িয়ে আছে, কী তার বিশালতা, কতই তার ব্যাপ্তি, আর সেসবকিছুকে যিনি ধারণ করে বসে আছেন তিনি না পুরুষ না নারী, তিনি অবয়বহীন এক অদ্ভুত টান। পুঁতির লক্ষকোটি নরির হারে সাজিয়ে রেখেছেন, বুনে রেখেছেন, গেঁথে রেখেছেন, এক অদৃশ্য সুতোয়। আশ্চর্য এক নাভীবৃন্তের বন্ধনে আটকে রেখেছেন তাঁর সৃষ্টি। আর এই নাড়ির টানই প্রেম।
–” আচ্ছা, প্রেমের সাথে শরীরের সম্পর্ক কী? ”
প্রশ্নটা করে ফেলেই জিভ কামড়ে ধরলাম। ইসস্, কি বোকার মতোই না প্রশ্নটা করে বসলাম ! আর করলাম কাকে? না, যিনি শরীরকে আবরণহীন করে দুনিয়ার সামনে নিজের বেআব্রু শরীরটাকে মেলে ধরেছেন।
—” না বাবা, লজ্জা পাস নে, ইয়ে শরমান্দেকি বাত নেহি। ইয়ে তো এয়স্যা এক গহেরি বাত যো, জীবন কা শুরুয়াত সে লে কর ভগবান কা পেয়ারি হোনে কা দিন তক লোগো কা মন মে আতে যাতে রহতে হ্যায় । “
বলে ভদ্রলোক কয়েক মূহূুর্তের জন্য যেন কোথায় হারিয়ে গেলেন !
— ” একটা শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে, তখন সে পৃথিবীর সবচাইতে বেশী কামআকর্ষক ক্ষেত্র যোনীপথ থেকেই নিজেকে গর্ভমুক্ত করে। কিন্তু সেসময় তার কাছে সেই যোনীপথ ঠিক যেন একটা মন্দিরের দ্বার। আর যিনি সেই শিশুকে গর্ভে ধারণ করেছেন, তিনিও কিন্তু তাঁর সেই যোনীপথ, যে পথে তিনি ইতিপূর্বে বিস্তার করে রেখেছিলেন দুনিয়ার সবচাইতে বেশী কামআকর্ষক বস্তু হিসেবে, যার ফলশ্রুতিতে তার গর্ভধারণ, সেই পথকে যেন কুসুমাস্তীর্ণ করে ঈশ্বরপুত্রের আগমনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন।
এরপর, সেই শিশু যখন তার জননীর স্তন্যপান করে, তখন সেই স্তন্য তার কাছে এক আশ্চর্য সুধাভান্ডার। এক মহিমান্বিত শস্যক্ষেত্র। আর জননীর কাছেও সেই স্তন্য তখন অপূর্ব এক মমতার সংবেদন। এক অত্যাশ্চর্য স্নেহের অঞ্চলছায়া। অথচ ইতিপূর্বে সেই স্তনযুগল যে কতো পুরুষকে কামভাবে আকর্ষণ করার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিলো, সে সম্ভবত সেই নারীও জানেন না৷।
তাহলে শরীর যেমন এক অর্থে মন্দিরের গর্ভগৃহ, মন্দিরদ্বার, সেরকমভাবেই সেই একই শরীর ভোগের বিচরণভুমি। “
কথাগুলো বলে সেই নাগা সন্ন্যাসী যেন কোথায় তলিয়ে গেলেন ! স্মিতহাস্যে তার মুখমন্ডলে খেলা করছে এক অপূর্ব জ্যোতি।
— ” তো ম্যায়নে ইয়ে নেহি বোলেঙ্গে ক্যেয়া, ভোগ উতনা সা জরুরি নেহি। উও তো জরুরি হ্যায় জরুর। কিঁউ কি নেহিতো ধরতি মে ফুল সে ফল নেহি বনেগা, ফল সে নয়া পেঁর নেহি হোগা, জীবন রুক যায়েগি, অউর ধরতি মে জীবনহি নেহি রেহেগা তো পেয়ার ফলেগা ক্যায়সে? “

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।