সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ২৮)

বাউল রাজা

তৃতীয় খণ্ড

— চেতনা কারে কয় গো পদীপদাদা?
হঠাৎ এরকম একটা প্রশ্নে হকচকিয়ে গেলাম।
— চেতনা — চেতনা হলো গিয়ে ইয়ে মানে যা অচেতন না।
— হুঁম , রবিটাকুর তাঁর কোনো একটা লেকায় চেতনা কতাটার খুব সুন্দর ব্যাক্যা দিয়েচেন। গেলো মাসে একজন কবি এসে রবিটাকুরের একটা কবিতা বলেচিলেন। শুনপে?
— কেন না? অবশ্যই শুনবো। তুমি বলো।
— আমার তো পুরোপুরি মনে নেই, তবে বিষয়টা আমার মনে গেঁতে গেচে। তিন বলেচিলেন চেতনার রঙেই আমরা সব পত্যক্ষ করি। গোলাপ লাল হয়ে দরা দেয়। পান্না পাতর সবুজ রঙে রঙিন হয়।
— আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ, চুনি উঠলো রাঙা হয়ে, আমি চোখ মেললুম আকাশে,জ্বলে উঠলো আলো পূবে — পশ্চিমে। গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম সুন্দর — সুন্দর হলো সে —
কানাইদার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠলো। এগিয়ে এসে আমার দুটো হাত ধরে ঝাঁকাতে লাগলো —
— পদীপদাদা, পত্যেকবার তুমি আমার অহংকার গুঁড়িয়ে দাও। আমি যতবার তোমার কাচে নিজেরে পকাশ করতে গেচি, ততোবারই তুমি আমার মনের কুয়েলিকাকে সরিয়ে দে, আমার সামনে আলোর দীপ নে দাঁইড়েচো।
— না গো কানাইদা, আমি তো সত্যিই বোঝাতে পারিনি চেতনা মানে কি? তুমি যদি সুতো না ধরিয়ে দিতে তাহলে তো আমি অন্ধকারে হাতড়েই মরতাম। আমি তো তোমার কাছেই শিখি গো বাউল। এখন বলো দেখি, হঠাৎ করে চেতনার কথা মনে হলো কেন?
— না, মানে ওই যে কিষ্ণামা বলচিলো না – চোকের সমুকে না দেখতি পেলে মনের মাজে বসত হয় ক্যামনে —
— এটাই তো বুঝি বাউল তত্বের গোড়াকার কথা।
কানাইদা কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন। হাতে ধরা একতাড়াটা পিড়িং করে মৃদু আওয়াজ করলো। কিছুক্ষণ চুপ। বাতাস, নদী, যেন চুপ করে দাঁড়িয়ে গেলো।
— ও মন, তুমি ক্যামন মানুষ কও
চোখের আলোয় নাড়াচাড়া দেখেও চুপ রও — বলি কোন রঙে সে রাঙালো কানাই, অন্তরে সে ভাবের গোঁসাই, চোখের আলোয় আঁধার ঢাকে, মনে জ্বলে রোশনাই রে… ও মন তুমি ক্যামন মানুষ কও —

পদীপদাদা, যে ব্যাকুল না হবে সে বাউল কীবাবে হবে বলো দেকি? তার সাতে মিলনের ভাবনায় ব্যাকুল না হলে সে মিলন হবে ক্যামনে? তার সাতে মিলবো ভাবলেই কি আর মেলা যায় গো? মিলনের লেগ্যে ব্যাকুল হতে হয়। মনের অন্দরে অশান্তি অতচ বাহিরে পশান্তি, গভীর নদীর মতো। মনের মাঝে যে চেতনা ঘাপটি মেরে বসে আচে সেই তো পরম গো। সেই তো সমস্ত সত্যাসত্যর সারাৎসার, আত্মা। মনের মানুষ। আর তার সাতে মিলবো বলে যে আকুলতা, যে আকাঙ্ক্ষা সেই তো জগৎ ভোলায়, যে কিনা আপনার আরশিতে আপনি ভোলে সেই তো বাউল গো!

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।