প্রার্থনায় জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়েছে মিনিট তিনেক হবে।ছেলেরা ক্লাসরুমে সবে ঢুকছে,আর ঠিক সেইসময় অনিরুদ্ধ পা দিলো স্কুলের গেটে।
বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউশনে শিক্ষক হিসেবে ও জয়েন করেছে বছর দশেক। প্রার্থনার পরে স্কুলে ঢুকেছে,অনিরুদ্ধর স্মৃতির পাতায় এমনটা আজ পর্যন্ত লেখা ছিলো না।খুব আফসোস লাগছে ওর।
“কি ব্যাপার.. ভাই,রেকর্ড তো ব্রেক হলো আজকে?” প্রধান শিক্ষক সুময়বাবু হাসিমুখে বলতেই আরো লজ্জা পেলো অনিরুদ্ধ।
“সরি স্যার, মাঝপথে বাইকের চাকা পাংচার…!খারাপ লাগছে..”
“ছাড়ো অনিরুদ্ধ,আমি জানি তুমি অন্যদের মতো ক্যাজুয়াল নও।ফার্স্ট পিরিয়ড আছে নাকি?”
“হ্যাঁ স্যার, ‘নাইন এ’।”
মুচকি হেসে জবাব দিয়ে অনিরুদ্ধ পকেট থেকে রুমালটা বের করে।অসহ্য গরম পড়েছে আজ। সকাল থেকে সূর্যদেবের সঙ্গে মেঘেদের লুকোচুরি খেলা চলছে অবিরাম।বৃষ্টির দেখাও নেই বেশ কয়েকদিন।
ড্রয়ার থেকে চক ডাস্টার বের করে অনিরুদ্ধ গম্ভীর মুখে পা বাড়ায় ক্লাসের দিকে । হঠাৎ মনে পড়ে,আজ আবর্তন গতি পড়ানোর কথা।গ্লোব আর টর্চটা নেওয়া হয় নি।শুরু থেকেই যেন তাল কেটে যাচ্ছে আজ। ‘আর একটু আগে বেরোলে প্রার্থনাটা মিস হতো না’….মনের মধ্যে খেদটা যাচ্ছে না ওর।
আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত ক্লাসের দিকে পা বাড়ায় ও।
“স্যার, আজ প্রার্থনায় ছিলেন না?” ক্লাসের থার্ড বয় অর্ণবের প্রশ্নে থতমত খায় অনিরুদ্ধ।
“নিরবচ্ছিন্নভাবে আদর্শকে ধরে রাখাই হলো ভালো শিক্ষক হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি..” বাবার কথাটা মনে পড়ে যায় অনিরূদ্ধের।কাজটা যে কত কঠিন আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে ও। প্রধান শিক্ষককে দেওয়া উত্তরটাই অর্ণবকে দিয়ে পড়ানো শুরু করে অনিরুদ্ধ।
হঠাৎ একটা গোলমালের শব্দে নীরবতা ভাঙে গোটা ক্লাসের। অনিরুদ্ধ দরজা খুলতেই আবর্তন গতির ক্লাসে ‘রাত থেকে দিনে’ ফেরে সকলে।
ক্লাস ‘সেভেন এ’-র চিরন্তন মনে হচ্ছে..!অনিরূদ্ধের মুহূর্তকথা শেষ হতেই ফার্স্ট পিরিয়ডের ঘন্টা পড়ে যায়।
প্রধান শিক্ষকের কক্ষের কাছে একটা জটলা।
“অনিরুদ্ধ ভাই…ছেলেগুলোকে ক্লাসে যেতে বলো তো..”
প্রধান শিক্ষক অনুরোধ করতেই ছেলেগুলোকে বুঝিয়ে ক্লাসে পাঠায় ও।
“কি হয়েছে স্যার..?” অনিরুদ্ধ কৌতূহল চাপতে না পেরে প্রশ্ন করে বসে।
“আরে..এসো ভাই।দেখো তোমার প্রিয় ছাত্রের কি করুন পরিণতি..!”
“কেন? কি করেছে চিরন্তন..?”
“বাবু মদ গিলে স্কুলে এসেছে..!”
“কি বলছেন স্যার..?” হতভম্ব হয়ে পড়ে অনিরুদ্ধ। ওর চোখ চলে যায় সুময়বাবুর সামনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট চিরন্তনের দিকে। সেই শান্ত ভদ্র চিরন্তনকে আজ বড় অচিরাচরিত লাগছে। অবিন্যস্ত চুলে মনে হচ্ছে কতদিন চিরুনির আঁচড় পড়ে নি। কালিবর্ণ মুখটা যেন একটা ‘অন্যায় না করার জিদ’কে জানান দিচ্ছে। জোরে শ্বাস নিচ্ছে বলে বুকটা একটু বেশীই ওঠানামা করছে ওর।
“হাঁ কর চিরন্তন…” ওর মুখের সামনে নিজের মুখটা নিয়ে যায় অনিরুদ্ধ। আ্যলকোহলের গন্ধটা নাকে যেতেই মুখটা সরিয়ে নেয় ও। নিজের ঘ্রানেন্দ্রিয়কে বিশ্বাস হচ্ছে না অনিরূদ্ধের।রূপকথার রাজপুত্রের মতো নির্মল মুখের ছেলেটা আজ একি অপরাধ করে বসলো..!
“চিরু…তুই কিনা….”
“স্যার বেশ করেছি…।আপনি আমার বাবাকে ডাকুন..!” অনিরূদ্ধের মুখ থেকে কথাটা কেড়ে জড়ানো কণ্ঠে বলে ওঠে চিরন্তন।
“ওকে বসাও, অনিরুদ্ধদা। ও টলছে.. দাঁড়াতে পারছে না।” পীযুষের কথায় সংবিত ফেরে অনিরূদ্ধের।ওর অব্যক্ত যন্ত্রনাটা এতক্ষনে রাগে পরিণত হয়।চুলের মুঠি ধরে চিরন্তনকে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে ও।
“মারুন স্যার…!আমায় মারুন..! কিন্তু বাবাকে ডাকুন ..।”
শেষের কথাটা তিরের মতো কানে ঢোকে অনিরূদ্ধের।’বাবাকে ডাকুন’ কথাটা এই নিয়ে দুবার বললো চিরন্তন..!থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ও।
“ও স্যার… থেমে গেলেন কেন? মারুন না…!”
হঠাৎ অনিরূদ্ধের পা’দুটো জড়িয়ে অবিশ্রান্ত ধারায় কাঁদতে থাকে চিরন্তন।বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়।আকাশের বহুরূপী মেঘগুলো যেন ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাঁদতে থাকে।
“আচ্ছা,স্যার…, চিরন্তনের খবরটা আপনাকে কে দিলো?” নীরবতার মাঝে অনিরুদ্ধ আচমকা প্রশ্ন করে বসে সুময়বাবুকে।
“কে আবার…? অরণ্য…ওর বেস্ট ফ্রেন্ড..!”
সুময়বাবুর উত্তরে বিস্মিত হয় ও।
আশ্চর্য..!অরণ্য তো চিরন্তনের প্রাণাধিক প্রিয় বন্ধু। দুজনের মধ্যে খুব মিল দেখে সবাই ওদের ‘মানিকজোড়’ বলে ডাকে।
তাহলে তো অরণ্যের চিরন্তনের খবরটা বেমালুম চেপে যাওয়ার কথা। তার বদলে অরণ্যই….!
“শোনো অনিরুদ্ধ, আমি ওর বাবাকে ডাকি।ওনার হাতে ‘টিসি’ সমেত ছেলেকে তুলে দিই।কি বলো..?”
প্রধান শিক্ষক সুময়বাবুর কণ্ঠে নিজের জগতে প্রত্যাবর্তন ঘটে অনিরুদ্ধর।
“বাবাকে ডাকুন,কিন্তু এখনই ‘টিসি’ দেবেন না।আমাকে দুদিন সময় দেবেন স্যার প্লিজ..”
“তুমি যখন বলছো,তাই হবে…দেখো জানোয়ারটার মন থেকে বন তুলে আনতে পারো কিনা….!”
“তবে চিরন্তনকে আটকে রাখুন স্যার..,ওর বাবা না আসা পর্যন্ত আপনার ঘরেই বসুক।”
অনিরুদ্ধ বেরিয়ে আসে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে।
টিফিন শেষের ঘন্টা পড়তেই চুপ করে যায় স্কুলটা। দামাল ছেলেরা আবার নিজের নিজের ক্লাসরুমে ফিরে যায়। স্কুলের মধ্যে থাকা বড় বকুল গাছটা পাখির কলরবে আনন্দে যেন মুখর হয়ে ওঠে।
গাছের নীচে সিমেন্ট বাঁধানো বেঞ্চিতে অনিরুদ্ধ অরণ্যকে ডেকে নিয়ে বসে।জটটা আজ খুলতেই হবে ওকে।
“আচ্ছা, অরণ্য তুই যে বলিস..চিরন্তন তোর প্রিয় বন্ধু..! তোদের মধ্যে এখন কি ঝগড়া হয়েছে?” অনিরুদ্ধ অরণ্যের গাল টিপে প্রশ্ন করে।
“না স্যার…ঝগড়া হতে যাবে কেন?” অরণ্য স্মিত হেসে ভ্রু কুঁচকে প্রতিবাদ করে স্যারের কথায়।
“তাহলে চিরন্তনের নামে হেডস্যারকে নালিশ করলি কেন? জানিস আজ ও কত মার ও বকুনি খেয়েছে..”
“জানি স্যার…”
“তোর কষ্ট হয় নি..?”
অনিরূদ্ধের কথায় চুপ করে যায় অরণ্য। ওর চোখ জলে ভরে ওঠে।হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলে,”আমি নালিশ করতে চাই নি স্যার, বিশ্বাস করুন..”
“সেতো আমি বুঝলাম বাবা…।” অনিরুদ্ধ বুঝতে পারে ও সঠিক পথেই এগোচ্ছে।আর একটু সময় দিলেই বেরিয়ে পড়বে আসল রহস্য।
“আপনি যদি কাউকে না বলেন,তাহলে স্যার আমি বলতে পারি…” অরণ্য করুন সুরে বলে।
“কিন্তু অরু… হেডস্যারকে তো জানাতেই হবে। নাহলে উনি তো চিরন্তনকে ‘টিসি’ দিয়ে দেবেন। সেটা কি তুই চাস…?”
“না স্যার…”
“তাহলে আমায় সবটা খুলে বল..। তবেই তো তোর বন্ধুকে আমি বাঁচাতে পারবো..।”
“বলছি স্যার..। শুনুন তাহলে..”
অনিরুদ্ধ বুঝতে পারে অরণ্য তার কথার জালে ধরা পড়েছে।
আবেগভরা কণ্ঠে বলতে শুরু করে অরন্য….
“কদিন ধরেই চিরুকে খুব অস্থির লাগছিলো স্যার।দিন চারেক আগে আমি জিজ্ঞাসা করতেই বলেছিলো,’বাবা কদিন ধরেই মদ খেয়ে রাত্রে মাকে খুব মারধোর করছে। আমি আর সহ্য করতে পারছি না অরু..!’
“তুই কিছু বললি না?”
“শুনুন না স্যার….!” একবার ঢোঁক গেলে অরণ্য।আবার বলতে শুরু করে…
“গতকাল স্কুলে এসে বললো,’আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে..!তোকে শুধু একটু হেল্প করতে হবে।’
আমি রাজী হতেই বললো,’তোর বাবাতো হোমিওপ্যাথি ডাক্তার।তুই শুধু বাবার কাছ থেকে একটা পেট গোলমালের ওষুধ নিয়ে আসবি আমার নাম করে।বাকীটা আমি সামলে নেবো।’ আজকে স্কুল বসার আগে আমার কাছে ওষুধটা নিয়ে ঢক ঢক করে জলের মতো খেয়ে নিয়ে বললো,’এবার হেডস্যারকে তুই আমার নামে নালিশ করে বল,চিরন্তন মদ খেয়ে স্কুলে এসেছে…!’ তাহলেই কেল্লা ফতে..।”
“তুই বারণ করলি না?
“আমার বারণ শুনলে তো..!শুধু বললো,’মা খুব কষ্ট পাচ্ছে অরু…আমাকে এর বিহিত করতেই হবে।”
হঠাৎ ঘন্টা পড়তেই উঠে পড়ে অরণ্য।
“স্যার, আমি আসছি…আপনি কিন্তু চিরুকে কিছু বলবেন না…” এক ছুটে ক্লাসে চলে যায় ও। অনিরুদ্ধ ওর যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে আনমনা হয়ে পড়ে।
দেখতে দেখতে শনি,রবি পেরিয়ে সোমবার এসে যায়। আজ সকাল দশটার মধ্যে স্কুলে চলে এসেছে অনিরুদ্ধ।অবসন্ন মনে স্মৃতির আয়নাকে সঙ্গী করে চিরন্তনের ঘটনাকে দিন তিনেক ধরে বিশ্লেষণ করে গেছে ও। চিরন্তনের বারবার বাবাকে স্কুলে আসতে বলার কারণটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে ওর কাছে। ছেলের এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে দায়ী করে যদি উনি মদ ছাড়েন,তাহলেই চিরন্তন সাকসেসফুল।বাঃ..খাসা বুদ্ধি বের করেছে তো ছেলেটা। কিন্তু চিরন্তন স্কুলে না আসা পর্যন্ত কিছুতেই নিশ্চিন্ত হতে পারছে না অনিরুদ্ধ।
প্রভিশনাল রুটিনের খাতায় চোখ বুলিয়ে দেখে ফার্স্ট পিরিয়ডেই ‘সেভেন এ’।চক ডাস্টার নিয়ে বেরিয়ে পড়ে স্টাফ রুম থেকে।ক্লাসে ঢুকতেই চমকে ওঠে ও।চোখ চলে যায় সেকেন্ড বেঞ্চে।আনন্দে আটখানা হয়ে জিজ্ঞাসা করে বসে,”চিরু,এসেছিস তুই?”
প্রিয় স্যারকে দেখে উচ্ছাসে দাঁড়িয়ে পড়ে চিরন্তন। খুশীতে ওর মুখ উজ্জল আজ,বুঝতে পারছে অনিরুদ্ধ।
“তোমার সঙ্গে কথা আছে স্যার..!” আনন্দে থাকলে চিরন্তন অনিরুদ্ধকে ‘তুমি’ বলে সম্মোধন করে ফেলে। এটা বিলক্ষণ জেনেও ওকে বরাবরই প্রশ্রয় দেয় অনিরুদ্ধ। বেশ উপভোগ করে বিষয়টাকে।
“বলে ফেল বাবা….”
“এখানে নয়,বকুল গাছের তলায়…”
“তাই হবে চিরু…!”
“আর মাত্র একটা কথা..! বলবো স্যার?”
“বল…..”
“আজ আমার জন্মদিন।বিকেলে বাবা-মা দুজনেই যেতে বলেছে তোমাকে…”
চিরন্তন নিজের জায়গায় বসতেই সারা ক্লাস চীৎকার করে ওঠে…
“হ্যাপি বার্থডে চিরু..”