সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৩৩)

পদচিহ্ন
বলরামবাবুর কথা
কথা বলছিলাম বলরামবাবুর সাথে। ভেবেছিলাম একটা ইন্টার্ভিউ নেবো, কিন্তু জীবনে কোনোদিনও কারো ইন্টার্ভিউ নিই নি। অগত্যা মধুসূদনকে ভরসা করে, গিয়ে হাজির হয়ে গেলাম ওর ঘরে। তিনদিন ধরে অজস্র পরিশ্রমের ধকল সইয়ে তিনি মশারির নীচে বিছানায় আশ্রয় নিয়েছেন। আমাকে দেখেই তিনি মশারির নীচে উঠে বসে, মশারি তুলে আমাকে তার ভেতরে ঢুকে বসতে বললেন। আমি সবিনয়ে বিছানার একপাশে বসে ওকে বললাম — আমাকে কিছুটা সময় দিতে হবে। তিনি শশব্যস্ত হয়ে উঠলেন।
— আচ্ছা যখন প্রথম প্রচারের আলোয় আপনার দুচোখের স্বপ্ন আকার পেতে শুরু করেছে তখন আপনার কী মনে হয়েছিলো?
প্রশ্নটা শুনে তিনি খানিকক্ষণ চোখ বন্ধ করলেন। সোজা হয়ে বসলেন।
—- সেটা ২০০৪ সালের চোদ্দই জুলাই। আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক সুব্রত গুহর প্রতিবেদন আনন্দবাজার পত্রিকায় ও পরে প্রবাসী আনন্দবাজার পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো, সে খবর আমার কাছে ছিলো না। এরপর বেশ কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী আমার সাথে যোগাযোগ করলেন। এরভেতর আমি বিষয়টা শুনেছি, কিন্তু আমার সেরকম কিছু মনে হয়নি। আমি আসলে খ্যাতির পেছনে ছুটে বেড়াই নি কোনোদিনও, তবে একথা অনস্বীকার্য যে, আনন্দ হয়েছিলো অবশ্যই। কাজের স্বীকৃতিকে আলো মনে হয় নি, তবে খুশী অবশ্যই হয়েছিলাম। হয়েছিলাম এটা ভেবে যে বাচ্চারা দুমুঠো খাবার পাবে, জামাকাপড় পাবে, ওদের মুখে হাসি ফুটবে।
আচ্ছা, যতদূর শুনেছি, আশ্রমে অনেক প্রখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত মানুষেরা এসেছেন, দিনের পর দিন আপনার সাথে গল্প করেছেন, এমনকি আপনাকে নিয়ে লিখেওছেন। আপনার কি এজন্য গর্ব বোধ হয়?
— গর্ব আর আনন্দের পার্থক্য অবশ্যই আছে। সমরেশ বাবু, সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার একাধিকবার আশ্রমে এসেছেন। ওর সাথে কথা বলার মজাই আলাদা। যখন কথা বলতে বসতেন, এতো নিজের ভেবে, সরলমনে, কথা বলে যেতেন যে কখনও মনেই হয় নি যে তিনি এতবড় সাহিত্যিক। দেশেবিদেশে তার এতো নামডাক, প্রতিপত্তি। মনে হতো যেন ঘরের মানুষ, নিজের দাদার সাথে কথা বলছি।
সুনীলবাবুও একাধিকবার এসেছেন। কখনওই মনে হয় নি তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এতো বড় মাপের একজন কবি, সাহিত্যিক। এখানে এসে বাচ্চাদের সাথে বাচ্চাদের মতো মিশে গেছেন। ওদের সাথে মজা করে খেলেছেন। ওর ভেতরে যেন একজন শিশু বাস করতো।
নবনীতাদি, নবনীতা দেবসেন এসেছেন। অমায়িকতা কাকে বলে নবনীতাদিকে দেখলে সেটা বোঝা যায়। মুখে অনর্গল হাসি লেগেই থাকতো। টিভি সাংবাদিক মৌপিয়া নন্দী এসেছেন। বুক সেলার্স গিল্ডের সম্পাদক সাহিত্যিক ত্রিদিববাবু এসেছেন। বাচ্চাদের নিয়ে বুক ফেয়ারে গেছি, আপনি বললে বিশ্বাস করবেন না। বাচ্চাদের সাথে নিয়ে মেলার স্টলে স্টলে গিয়ে ওদের জন্য বই সংগ্রহ করে ওদের হাতে তুলে দিয়েছেন। ওদের সঙ্গলাভ মনে এমন একটা আনন্দের আলো এনে দেয় যে গর্বের অন্ধকার পালিয়ে যেতে পথ পায় না।
— আচ্ছা, আপনি তো কলকাতায় সম্বর্ধনাও পেয়েছেন অনেকবার। সেই স্বীকৃতি আপনাকে কতোটা জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
— জনপ্রিয়তা মাপার কোনো যন্ত্র আছে কিনা জানি না, তবে এটুকু বুঝি, যখন ২৪ ঘন্টা আমাকে অনন্য সম্মানে সম্মানিত করেছে, বা সমবেত গোষ্ঠী রবীন্দ্রসদন মঞ্চে আমাকে আর গীতাদিকে, মানে অভিনেত্রী গীতা দত্তকে একইসাথে সম্বর্ধিত করেছে, তার প্রভাব সরাসরি না হলেও পরোক্ষে যে আশ্রমকে সুযোগসুবিধা পাইয়ে দিয়েছে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। পরবর্তীতে অনেক এসেই আমাকে সেইসব সম্বর্ধনা বা পুরস্কারের কথা জানেন বলে জানিয়েছেন।
— আচ্ছা এই পুরস্কার আপনার হাতে কে তুলে দিয়েছিলেন?
— তসলিমা নাসরিন।
— তসলিমার সাথে কি আপনার কোনো কথা হয়েছিলো? তিনি কি পরে আশ্রমে এসেছিলেন কোনোদিন?
—- না, সেরকম উল্লেখযোগ্য কথাবার্তা কিছু হয় নি, পরবর্তীতে তিনি কোনোদিন আসেন নি। তবে যেটুকু সান্নিধ্য পেয়েছিলাম, সেটুকু বেশ ভালো লেগেছিলো।
— আচ্ছা, আপনি একজন পিতা হয়ে আপনার সন্তান আপনার জেষ্ঠ কন্যাকে অন্যের কাছে দত্তক দিয়েছিলেন। এটা কেন?
— তখন সত্যি সত্যিই আমার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়েছিলো। তখন আশ্রম সবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাচ্চাদের মুখে, আমার পরিবারের সন্তানদের খাওয়ার খরচ চালাতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছি। যাদেরকে আমি আশ্রয় দিয়েছিলাম, তাদের আশ্রয়হীন করে দিতে আমার অন্তরাত্মা সায় দেয় নি। আমার মনে হয়েছিলো এর চাইতে আমার আত্মজ সন্তানকে অন্যের ঘরে দিয়ে আসাটা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই মানবিক হবে। সেকারণেই আমি আমার জেষ্ঠ সন্তান ময়নাকে তুলে দিয়ে এসেছিলাম।
ক্রমশ