সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত

বাউল রাজা

দ্বিতীয় খন্ড (তৃতীয় পর্ব)

আমি কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে রইলাম। রিক্সাওয়ালা কী ভাবছে কে জানে। ভাবছে বুঝি আমার শরীর খারাপ করেছে। কিন্তু আমার মনে যে তখনও এক স্বর্গীয় আনন্দের রেশ বয়ে চলেছে, সেটা সে বুঝবে কী করে?
চোখ খুললে দেখি, নদী নিস্তরঙ্গ ভাবে বয়ে চলেছে। আর আমার কোলে লুটোপুটি খাচ্ছে একটা স্বর্ণচাঁপা। আমি রিক্সাচালক ভাইয়ের দিকে চাইলাম।
–” আপনার শরীলটো ঠিক আছে না বাবু? তা ইখাইনকে একলা বইস্যে আছ্যেন কেনে গ? বাউলের ঠাঁয়ে চলেন কেনে –”
আমি হাত নেড়ে ইশারায় ওকে চলে যেতে বললাম। মুখ থেকে একটা শব্দও বের করতে ইচ্ছে করছে না। মন এতোটাই আবিষ্ট হয়ে আছে। ও কী বুঝলো কে জানে, উঠে গিয়ে রিক্সার প্যাডেলে পা দিলো।
নদীর বুক ফের চঞ্চল হলো। এই চঞ্চলতা মানে প্রগলভতা নয়। যেন একটু বন্ধুসুলভ চঞ্চলতা।
–” তোমাকে একেনে বসতে বলেচিলাম কেনে জানো ঠাকুর? ”
–” অন্য কোনও কারণে, তা জানি না, তবে তুমি আমায় যে শিক্ষা দিলে, সে শিক্ষা যে একজন প্রকৃত সাধন গুরু ছাড়া অন্য কেউ দিতে পারেন না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। ”
–” সেটা তো কতা উটলো বইলে। আসলে বসতে বলেচিলাম এজন্য যে তকন তুমি কানাইক্ষ্যাপার ঘরে গে ওদের পেতে না বইলে। ”
–” মানে? ”
–” মানে ওরা সেকেনে চিলেন না গো। কাল বিকেলে দু’জন মিলে কঙ্কালিতলা গৌরক্ষ্যাপার আকড়ায় গেচিলেন। তুমি আসতিচো সেটা ওরা — যাকগে,সেটা ওদের কাচ তেকেই শুনপে খন। ওই ওরা এসে পড়লো বলে। এট্টা কতা বলি ঠাকুর, তোমার কোলে যে চাঁপাফুলটা তোমার সোহাগ নিচ্চে, তার ওপরে কিন্তু আমার খুব লোভ হতিচে গো। ওটা যদি তুমি আমার চুলে পইরে দাও –”
–” তোমার চুলে পড়াবো? এ কেমন আশ্চর্য কথা কও তুমি নদী? তোমার চুল আমি পাবো কোথায়? ”
–” এই নাও, আমার বেণী তোমার কোলে দিচ্চি গো, তুমি পইরে দাও — দেরি করো না গো ঠাকুর — দাও একুনি। ”
বলতে না বলতেই বাঁধের ভেতর ঢেউ এসে ধাক্কা মারলে যেরকম জলকণিকাচূর্ণ বাঁধ অতিক্রম করে যায়, সেরকম কিছু চূর্ণিত জল অলকের রূপ ধরে আমার কোলে এসে আছড়ে পড়লো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমিও কেমন যাদুআবিষ্টের মতো সেই জলচূর্ণে আমার কোলে থাকা চাঁপাফুলটাকে অঞ্জলির মতো করে দান করলাম।
–” এই দেহেতে আছে কান্ডারী
পুরুষ নারী সঙ্গে নিয়ে রিপু পার করি
আবার মায়ার তুফান — ঝড় থামে না
নাথ বিন্দু কেন রসনা!
কেউ আমারে ভিতর থেকে
চিনতে পারল না।
আমি বাউল সেজে ছদ্মবেশে
খুঁজি মনের মানুষখানা।
ওরে মন — কেউ আমারে ভিতর থেকে
চিনতে পারলো না। “
দূর থেকে একজোড়া মানুষ মনের আনন্দে নাচতে নাচতে এগিয়ে আসছে। ক্রমে শরীর দুটো প্রকট হলো। চোখে মুখে আনন্দের কি উজ্জ্বল দ্যুতি! সারা শরীর যেন গমকে গমকে উথলে উঠছে কোন অনির্বচনীয় ঐশ্বরিক আনন্দে। কানাইদা আর কৃষ্ণভামা আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো। দু’জনেই যেন একইসাথে কথা বলবে আমার সাথে — কানাইদা বলে উঠলেন —
–” পদীপদাদা আমি কাল রাতের বেলা –”
বাউলনি বলে উঠলো —
–” ঠাকুর কাল রাতে তো আমি তোমার –”
আমি অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ঠিক যেন দুটো শিশু তাদের কাছের কোনো মানুষের দেখা পেয়েছে।
বাউলনির কাঁধে আমার ঝোলাটা ঝুলছে। তার মানে, ওরা গুরুপদবাবার আশ্রম থেকে আসছে, সেটা বুঝতে পারলাম। আমি নদীর পৈঠার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ওদের কাছে এগিয়ে গেলাম। ব্যাগটা নেওয়ার জন্য বাউলনির দিকে হাত বাড়াতেই বাউলনি ফোঁস করে উঠলো।
–” এ ঝোলার দিকি হাত বাইড়ো না কো ঠাকুর। এ ঝোলার ওপর তোমার কোনো অদিকার নেই। এটার মালিক একন আমি। দাদুর কাচ তেকে চেইয়ে নে এয়েচি। ”
কানাইদা দেখি মুচকি মুচকি হাসি হাসছেন। আসলে এই খুনসুটিটুকু উপভোগ করছেন। আমিও তেমনি করেই উত্তর দিলাম —
— ” পরের সর্বস্বকে যারা নিজের বলে দাবী করেন, তাদের স্বভাব সুবিধের হয় না। কি বলো কানাইদা? ”
কানাইদা তেমনি স্মিত হাস্যেই বলে উঠলেন -” তোমাদের দু’জনের রাগ অনুরাগের দড়ি টানাটানিতে আবার আমায় জড়ানো কেন গো পদীপদা, আমি এ ভাবনগরের বাসিন্দে হবার যোগ্য নই গো -”
–” তা হ্যাঁরে কিষ্ণভামা, নোকটাকে কি পতেই দাঁড় কইরে রাকপি, না কি ঘরের পানে নে যাবি বল দিনি? ”
আমরা তিনজন হাঁটা লাগালাম। কৃষ্ণভামাকে পেয়ে নদীর কথা ভুলেই গেছিলাম। বাউলনিই সে ভুল ভাঙালো।
–” আসি লো সই। এই যে এতোক্কণ দরে মানুষটাকে সঙ্গ দিলি, সে কতা আমি ভুলবো না রে –”
আমিও নদীর দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় চাইলাম। কানাইদা আগে আগে চলেছেন। আমরা পেছন পেছন। হঠাৎ বাউলনি আমার হাত ধরলো।
–” কাল সব্বোক্ষণ যে তোমার সাতে সাতে চিলাম, সেটা কী বুজেচো ঠাকুর? “
আমি বাউলনির কথার উত্তর না দিয়ে চুপ করে হেঁটে চললাম। পুবের সূর্য ততোক্ষণে পথচলতি মানুষজনের শরীরের পেছনে এক সুদীর্ঘ ছায়া ফেলছে।
–” আজ তুমি মাধুকরী করতে বেরোবে না বাউলদিদি? ”
–” কী পশ্নের কী উত্তর! তুমি কি কাল রাতে সত্যিই বুজতে পারোনি যে, আমি সব্বোক্ষণ তোমার সাতে সাতে চিলাম? ”
বাউলনি এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে যে, এ যেন তার মরণবাঁচনের বিষয়। আমি পূর্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে চাইলাম।
–” তুমি তো একা নও, সাথে কানাইদাও তো ছিলেন। ”
–” সেকানেই তো হয়েচে বিপত। গোঁসাই ভুল কইরে ক্ষণেকের তরে চিলেন বটে। কিন্তু সে তো কয়েক মুহূর্ত। তারপরই গোঁসাই আমার হাত ধইরে ছিটকে বেইরে গে আমারে বললেন — দ্যাখ ভামী, গৌরক্ষ্যাপা যেমনি ভদ্দর তেমনি গোঁয়ারগোবিন্দ। আমি না হয় ওর সাতেই থাকি, তুই না হয় বরং –”
–” আচ্ছা,একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো? তোমরা দু’জন যেরকমভাবে এসে আমার দু’পাশে বসেছিলে, তুমি কেন পরে এসে সেভাবে বসলে না? শুধু ছায়ার মতো ঘুরেফিরে রইলে? ”
–” ঠাকুর, দ্যাকো, গোঁসাই ছাড়া আমি বা আমাকে ছাড়া গোঁসাই অনেকটা সেই টচবাতির মতো। আমি বাতি হলি গোঁসাই ব্যাটারি অতবা আমি ব্যাটারি হলি পর গোঁসাই হলো গে বাতি। দু’জনে একঠাঁই না হলি পর আলো জ্বইলবে না গো। ”
এতো সুন্দর জলবৎ তরলং করে বোঝায় বাউলনি যে, বোঝার আর কিছু বাকি থাকে না।
–” দ্যাকো, এ জিনিসটা অনেকটা তোমাদের সংসারীদের মতো। কেউ কামাই করে আনলো তো অন্যজনা রান্নাগরের দায় নিলো। কিন্তু নদী আজ তোমারে —”
বলেই কৃষ্ণভামা জিভ কাটলো।
–” এই দ্যাকো, কতায় কতায় — তোমার সাতে কতা বলতি গেলে আমার যে কী হয়, পেটের কতা আর পেটে তাকে না। ”
–” যে কথাটা পেটের আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে,তাকে মুক্তি দেওয়াই ভালো। নইলে কখনও কখনও বিপদ হয়ে যায়। ”
–” দ্যাকো ঠাকুর, যে ম্যাস্টর পেরাইমারি ইস্কুলে পড়ান, তাকে দে উঁচু ইসকুলের পড়ানো হয় না। যে কতাটা,মুক ফুটে বইলতে গেচিলাম, সে বিষয়ে আমি অতটা — গোঁসাই –”
কথা বলতে বলতে আমরা কানাইদার আখড়ায় চলে এসেছি। দেড় বছর আগে দেখা ঘরটা এতোটুকুও বদলায় নি। খড়ের চালাটা আরেকটা বর্ষা শরীর পেতে নিয়েছে, সেও বুঝি এই বাউল যুগলের প্রেমে পড়েছে। আর সে কারণেই সমস্ত ঝড়বাদলের অত্যাচার এভাবে সহ্য করে যাচ্ছে।
দাওয়ার মাথার চালাটা থেকে গোছা গোছা খড় আবর্জনার মতো ঝুলে আছে।
দাওয়ায় মাদুর বিছোতে বিছোতে বাউলনি আমাকে আমার ঝোলাটা ধরিয়ে দিয়ে গামছা বের করতে বলে কুয়োতলায় গিয়ে জল তুলতে শুরু করলো।
–” দেরি কোরো না গো ঠাকুর, হাতমুখটা ধুয়ে নাও, আমাকে আবার মাধুকরীতে বেরোতে হপে। বেলা অনেক হয়ে গেলো। ”
হাতে গামছা নিয়ে কুয়োতলায় যেতেই সেই কাল রাতের গন্ধটা পেলাম। সারাটা এলাকা জুড়ে যেন সেই গতকাল রাতে পাওয়া সদ্য ছেঁড়া কাঁচা আমের বোঁটায় লেগে থাকা টাটকা কষের মতো একটা গন্ধ ছড়িয়ে আছে। বাউলনি একটু মুচকি হেসে দাওয়ার দিকে দৌড় লাগালো। বুঝলাম এ আর কিছুই নয়, এ ও এক ধরণের কুহক। কাল রাতের ট্রেনযাত্রার সময় ও যে আমার সাথে সাথেই ছিলো, তার প্রমাণ রেখে গেলো।
গা হাত পা মুছে, দাওয়ায় উঠে ঝোলা থেকে পাজামা বের করলাম। কিন্তু মুশকিল হলো পাজামাটা পরবো কোথায়? আর একটা বিষয়, আসার সময়ে আমরা দু’জন কথাবার্তায় এতো মশগুল ছিলাম যে কানাইদা যে আমাদের সাথে একসাথে ফেরেন নি, সেটা আমার নজরেই পড়েনি।
কৃষ্ণভামা বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পাঁচেক বাদে কানাইদা আর ছুটকি ( ওদের কাছে ছোট্টোবেলা থেকে থাকা একটা বাচ্চা মেয়ে) একসাথে এসে হাজির হলো। কানাইদার হাতে একটা পলিব্যাগ। সেই পলিব্যাগটা ছুটকির হাতে দিয়ে কানাইদা দাওয়ায় এসে উঠলেন। কানাইদার দু’চোখে লেপ্টে থাকা আঁখি পল্লবে একটা ব্যগ্রতার ছায়া দেখলাম। আমি ইতিমধ্যেই গামছা বেড় দিয়ে পাজামাটা পরে নিয়েছি।
–” ঘরে একটুও চা চিনি চিলো না গো পদীপদা। আর ছুটকিটাকেও কাল আমাদের এক পড়শী আচ্ছমে রেকে গেচিলাম। তাই তোমাদের সাতে একসাতে ফিরতে পারিনি গো। বলি রাগ কোরোনি গো, গতবার তোমার দেওয়া টাকাটা দে চাল ছাইতে পারি নি কো। বেচারা চালাটা আমার গেলো জন্মের এক মায়ের পেটের ভাই চিলো বোদয়। তাই –”
এই বুঝি শুরু হলো ফের, মনের কথা বুঝে নেওয়ার খেলা। আমি এই দেড় বছর থট রিডিং নিয়ে বাঘা বাঘা লেখকের বই পড়েছি, কিন্তু এদের সাথে কারো বিশ্লেষণের কোনোরকম মিল আমি খুঁজে পাই নি।
– ” আমি ছুটকিরে বইলে রেকেচি, কাল সারারাত ধরে তোমার খুব ধকল গেচে, ও ভেতরঘরে বিচানা পেইতে দেবে খন, তুমি একটু গইড়ে নিও।”
–” একটা কথা বলবে কানাইদা, আমি যে আসছি সেটাই বা তুমি বুঝলে কীভাবে আর আমি যে গুরুপদবাবার –”
কানাইদা হো হো করে হেসে উঠলেন, তার সারা শরীর জুড়ে, দু’টো অন্ধ চোখ জুড়ে, একটা প্রবল হাসির দমক উঠলো।
–” আচ্চা, তুমি আমায় একটা কতা কও দেকি পদীপদাদা, কোতায় কোন বনের কোণায় মদু বক্কে নে কোন পুষ্পটা পাপড়ি মেললো, মধুকর তার খোঁজ পায় কীভাবে? অতবা ধরো দিকিনি, আকাশ ঝেইপে বিষ্টি নেমে মাটির নীচে তাদের বাসা ধ্বংস কইরে দেবে, পিঁপড়েরাই বা সে খপর পায় কোত্তেকে? সবটাই অন্তরের টান গো, আত্মার পতি আত্মার ভালোবাসা। তবে একটা কতা অস্বীকার করপো না, নদী আমায় খপর দিয়েচিলো যে তুমি গুরুপদবাবার ওকেনে উটেচিলে। ”
–” আচ্ছা কানাইদা, এই নদী কীভাবে –”
–” দেকো পদীপদাদা, বস্তুতে যে জিনিসটাকে ঠাহর করা যায় না, সেকেন তেকেই ভাবের উদয় হয়। ধরো তুমি কি তোমার মা বাপের স্নেহকে ছুঁয়ে দেখতি পারো? পারো না, কিন্তু অনুভব করতে পারো। তাই না? এই যে ধরো না কেনে, আজকে নদী তোমারে — থাক সে কতা পরে হপে। তুমি আগে চা খেয়ে একটু গইড়ে নাও তো দেকি –”
ইতিমধ্যেই ছুটকি একটা এনামেলের গ্লাসের এক গ্লাস চা, একঘটি জল আর গোটাকতক বিস্কুট সামনে রেখে বলে উঠলো —
” ঘরে বিচানা কইরে দেচি গো ঠাকুর, শুয়ে নিও।”
দুপুরবেলা কি আমি কিছু খাইনি, না খেয়েছিলাম, মনে করতে পারছি না। শাঁখের ফুঁ এর আওয়াজে ঘুম ভাঙলো। কুলুঙ্গিতে একটা কেরোসিন তেলের লম্ফ, যতোটা আলো দিচ্ছে তার থেকে ধোঁয়া ছড়াচ্ছে বেশী। বাইরে, সম্ভবত বারান্দায়, একটা খমকের টুংটাং আওয়াজ কানে আসছে। তুলসিতলায় প্রদীপটাকে রেখে কৃষ্ণভামা ঘরে এসে কুলুঙ্গির সামনে দাঁড়িয়ে আঁচল গলায় দিয়ে প্রণাম করছে।
এই সময়টাতে প্রত্যেকটি বাঙালি নারীরই একটাই রূপ। প্রণাম সেরে কৃষ্ণভামা আমার দিকে চাইলো।
সে দৃষ্টিতে যেন বর্ষার জল থৈথৈ পুস্করিণীর গভীরতা।
–” বাব্বাঃ, কি ঘুম কি ঘুম, এ যেন একেবারে কুম্ভকন্ন নিদ্দা গিয়েচেন। গোঁসাই কতো দাক্কাদাক্কি করলেন, তাও — ”
–” ওই জন্যই তো ভাঙেনি, ”
আমি মুচকি হাসলাম।
–” মানে বুইজে বলো। ”
–” কানাইদা ধাক্কা না মেরে যদি তুমি –”
–” সন্দেবেলা বাজে কতা বলতি নেই। নাও, উটে বোসো দিকিনি, চা খাবে, নাকি ভাত? ”
— ” আচ্ছা বাউলদিদি, একটা কথা বলবে? বাউলরা তো কোনো ভগবান মানে না, তাহলে তুমি কেন –”
–” সন্দেবেলা পিদিম জ্বাললাম না গড় করলাম, কোনটা? ”
— ” ধরো না কেন দুটোই –”
— ” তুলসিতলায় পিদিম জ্বাললাম এজন্যি যে, তেনারা যেন এসে উপদ্দব শুরু না কইরে দেন। সন্দেবেলাতেই তো তেনাদের চারণ করার সুময়, আর গড় করি মা তারাকে আর বামদেবকে। যার রাজত্বে বাস, তারে না মানলি পরে ঘোর সব্বনাশ।”
–” আমি তাইতে পাগল হলেম না
তেমন একজন পাগল পেলাম না
দেখি নকল পাগল সকল দেশে
আসল পাগল কয়জনা —
কেউ পাগল, পিরিতের আশে
কেউ পাগল বিষয়লালসে
কেউ ধনের – জনের – যশের – মানের
পাগল সব দেশে।
দেখি নানা রঙের নানা ঢঙের
কে করে তার ঠিকানা —
দেখি নকল পাগল সকল দেশে —“
কানাইদা গান ধরেছেন। আমি দেখেছি, বাউলসঙ্গীত একটু আড়ালে শুনলে মিষ্টি বেশী লাগে। গায়ের কাঁথাটা আবার গায়ে জড়িয়ে নিয়ে আধশোয়া হলাম।
কার্তিক শেষ হয়ে গেছে। এখন পৌষের প্রথম দিক। কলকাতার শীতের ঠান্ডার সাথে এখানকার ঠান্ডার অনেক তারতম্য আছে। ছুটকি এসে সেই এনামেলের গ্লাস আর একটা কলাইকরা থালায়, বেশ তেল পেঁয়াজ দিয়ে মাখা মুড়ি চানাচুর রেখে দিয়ে গেলো। আমি দুটো পাত্তর নিয়েই কাঁথা মুড়ি দিয়ে বারান্দায় এসে বসলাম।
–” কি গো পদীপদাদা, ঘুইমে তো এক্কেরে কাদা হইয়ে গেচিলে গো। তা অবিশ্যি হবে না ই বা কেন? সারারাত টেরেনে চেইপে ফের –”
আমি বেশ আমেজ করে গালভরা মুড়ি চিবোচ্ছি। এখানকার ঢেকিছাঁটা চালে ঘরে বালির খোলায় ভাজা বেশ লাল ডুমো ডুমো মুড়ির স্বাদই আলাদা।
–” আচ্ছা, তুমি যে গানটা গাইছিলে –”
–” পাণকেষ্ট বাউলের বাঁধা গান গো — কি কতাটাই না বইলেচে বলো দিকিনি। পাগলে পাগলে ভরা দুনিয়া — এমনকি তুমি শিবের কতাই ভাবো না কেনে, ঘরে মা অন্নপূন্না থাকতি তিনি কিনা পরের দোরে ভিক্কা কইরে -”
আমার মনে কেমন করে হঠাৎ একটা ভাব এলো। কথাটা তো একশো শতাংশ খাঁটি। কোথায় ঠিকেদারি করে ভালোই ছিলাম, কিন্তু এখন আমি নাকি নদীর সাথেও —
–” তুমি কাল শুদিয়েচিলে — নদী কতা কয় কীভাবে? আচ্চা, ধরো পাহাড়ের থে পাতরের টুকরোগুলি, তোমরা যাকে নুড়ি বলো গো, নদীর বুকের মদ্যে দিয়ে গইড়ে গইড়ে যায়, তকন সেই গড়ানো পাতরগুলির তেকে এক অপূব্ব টুংটাং গানের মতো আওয়াজ বের হয় গো। যাদের কান আচে, তারা সেই গান শুনতি পান। ”
এই দেখো, ফের মনের কথা টেনে নিয়ে — এটাও কি সাধনালব্ধ?
–” সে গানের কথা না হয় বুঝলাম। কিন্তু কথা? আর — উপলব্ধি –!”
–” দেকো পদীপদাদা, এই যে দরোনা কেনে, কাল তুমি নদীর পাড়ে বসলে, এতো গল্প কইরলে, সোহাগভরে চাঁপাফুল পইরে দিলে নদীর বেণীতে, এসবই হলো গে একটা উপলব্দির ফল –”
–” কী রকম? ”
–” দরো না কেনে, একজন মানুষ যিনি পালাগান লেকেন, কী দরো গল্পই লেকেন, তিনি যতো চরিত্তিরের চালচিত্তির আঁকেন, সবাই কি তার চেনা না জানা, বলো দিকি? তার উপলব্দির গভীরে ডুব দে তিনি সেইসব মণিমুক্তা তুলে নে আসেন। ঠিক সেরকমটাই গো পদীপদা। ”
একজন অজ্ঞ, মূর্খ, অশিক্ষিত মানুষ কতো সহজেই না সাঁতরে বেড়াচ্ছেন জ্ঞানসাগরে। এতো সহজ সরল ভাবে কতো গভীর ভাবনার বুদবুদগুলো উঠে আসছে তাঁর ওষ্ঠপ্রান্তে।
–” সে নাহয় বুঝলাম গো বাউল, কিন্তু গতকাল যে গূঢ়তত্ত্বের ঝাঁপি খুলে দিলো আমার সামনে, যে তত্ত্বের কথা হয়তো অনেক বাউলই জানেন না, সেই একাঙ্গীভূত মিলনের কথাগুলোও কী –”
–” দ্যাকো পদীপদা, এ কতা হয়তো তুমি বুজলেও মানতে চাইপে না — “
–” মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন
লুকালে না পায় অন্বেষণ
কালারে হারায়ে তেমন
ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে..
ও আমার মনের মানুষের সনে
আমার মনের মানুষের সনে
মিলন হবে কতদিনে…
ওই রূপ যখন স্মরণ হয়
থাকে না লোকলজ্জার ভয়
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই
এ প্রেম যে করে সে জানে…
আমার মনের মানুষের সনে.. “
কে গাইছে গানটা? অন্ধকারের বুক থেকে এখনই বুঝি এ গান ভেসে আসার সময় হলো…

( চলবে )

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।