সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ২০)

পদচিহ্ন
আবাদী জমিতে বাস্তুকারের ফিতে পড়লো। জমিটার মাঝবরাবর রাস্তা রেখে ডানদিক আর বাঁদিকের সীমানা ঘেসে মাটিতে কোদালের কোপ পড়লো। লম্বা স্কুলবাড়ির আদলে জমির দুপাশে একশো ফুটেরও বেশী লম্বা, আর পনেরো ষোলো ফুট চওড়া বাড়ি বানানোর প্রস্তাব রাখা হলো শিশুকিশোর আশ্রমিকদের থাকার ঘর বানানোর জন্য। এছাড়াও বাঁ দিকে একটা প্রার্থনা কক্ষ আর কিচেন ও ডাইনিং রুম, যেখানে মোটামুটি আশী নব্বুইজন ছাত্রছাত্রী খাওয়াদাওয়া করতে পারে।
জার্মান প্রবাসী বাঙালি বিমল রায়ের উদ্যোগে শুরু হলো কর্মযজ্ঞের শুরুওয়াত। আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক সুব্রত গুহর খবর করা যদি শুভক্ষণের সূচনা করে, বিমল রায়ের উদ্যোগ গ্রহণ তাহলে বলরামবাবুর দুচোখের স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে রোপন করা।
ধীরেধীরে চোখের সামনে গড়ে উঠছে ইমারত। একটা নয় দুদুটো বাড়ি, একতলা বাড়ি নয় দুদুটো দোতলা বাড়ি। এক একটা বাড়িতে প্রতি ঘরে দুজন শিক্ষার্থী আবাসিকের জন্য বরাদ্দ করা হলে দুটো বাড়িতে কম করে হলেও আশী নব্বই জনের মাথা গোঁজার ঠাঁই। উত্তেজনায় রাতে ঘুমোন না বলরামবাবু, জিনি নিজে কখনওই পাকাবাড়ি, এমনকি পাকাপোক্ত ইটের গাঁথুনিও তিনি তার মাথার ওপর দেখতে পাননি সেই তিনি এতবড় সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হতে চলেছেন। মাঝেমাঝে মনে হয় এসবকিছু, যাসব ঘটছে সেসব সত্যিই সত্যি তো নাকি…
তিনি মাঝেমধ্যে গায়ে চিমটি কেটে দেখেন যে তিনি জেগে আছেন কিনা! আবার ভাবনা হয়, এই যে বিশাল মাথা গোঁজার ঠাঁই বানানো হচ্ছে সে ঠাঁয়ে বসবাস করবে কারা? বাড়ি তো হচ্ছে কিন্তু যারা সত্যিই থাকতে আসবে তাঁর স্বপ্নের সেইসব শিশুকিশোরদের অন্নজল জোটাবেন কীভাবে? কে দেবে অর্থ! শেষ পর্যন্ত এই বিশাল অট্টালিকা অব্যবহৃত পোড়ো বাড়ি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না তো! গ্রামের লোকজন তাকে নিয়ে যে আড়ালে আবডালে বিভিন্ন কথা আলোচনা করেন, তাঁর পেছনে নানারকম টিকাটিপ্পনি কাটে সেসব তিনি অনুভব করেন। আর সত্যি বলতে কী, এসব মনে হওয়াগুলো তাকে নিরুৎসাহিত না করে বরং তাকে আরও বেশী করে উদ্যোগী করে তোলে। তিনি দিনরাত্রি একাকার করে রাজমিস্ত্রিদের সাথে হাত লাগালেন। আর এইভাবেই তাঁর শরীর নিসৃত নোনাজলের সাথে স্বপ্নের রঙ একাকার হয়ে তৈরী হতে থাকলো এখানকার পাঁউশি অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রম।
ক্রমশ