সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত

বাউল রাজা
দ্বিতীয় খন্ড (চতুঃপঞ্চাশৎ পর্ব)
নাঃ, কিছুতেই ঘুম আসছে না। দূর থেকে ভেসে আসা বাউলিয়া সুরের সাথে ফোঁপানোর শব্দ মিলেমিশে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করছে যে মনটা কেমন যেন উসখুস করছে।
আর কৃষ্ণভামার শেষের কথাগুলো কেবলই ঘুরে ফিরে কানে বাজছে। — ” গতবার কিন্তু আমি বারেবারেই বারণ করেচিলাম একেনে আসতে, বলেচিলাম একেনে মায়াবী কুহকজাল আচে। বলেচি কিনা বলো দেকি? “
কথাগুলো বলার সময় যে কীভাবে ওর চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে যাচ্ছিলো সেটা অন্য কেউ লক্ষ্য করেছে কিনা জানি না, কিন্তু আমার চোখ এড়ায় নি। একইসাথে ওর দু’চোখ থেকে যে দুটো মুক্তোর ফোঁটা মাটির দাওয়ার ওপর পড়ে নিমেষেই শুকিয়ে গেছিলো, সেটাও শুধুমাত্র আমিই দেখেছিলাম। কানাইদাও নিশ্চয়ই দেখেছিলেন বাউলনির সে কঠিনে তরলে মেশানো রূপ ! আর দেখেছিলেন বলেই বুঝে নিয়েছিলেন যে ওঁর হস্তক্ষেপ ছাড়া বিষয়টা থামবে না। এসে থেকে অবধি ধ্রুবদা যে ভাবে কৃষ্ণভামাকে উপলক্ষ্য করে কথাগুলো বলে গেছেন, বাউলনি যে খোঁচা খাওয়া বাঘিনীর মতো সেসবের উত্তর দেবার জন্য মুখিয়ে আছে, সেটা বোঝার মতো পারদর্শিতা কানাইদার আছে বলেই বাউলনিকে সময়মত থামিয়ে দিয়েছিলেন। কৃষ্ণভামা কানাইদাকে অমান্য করতে পারে নি ঠিকই, কিন্তু অপমানটাকেও মেনে নিতে পারেনি। আর তারই ফল এই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না। এই কান্না যে অভিমানের কোন অতল থেকে উঠে আসছে, সেটা ভেবে আরও খারাপ লাগছে। মনের মধ্যে কতখানি কষ্ট পেলে সবার অলক্ষ্যে এইভাবে একা একাই নিজের কষ্টকে চাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে এই অসামান্যা নারী, সেটা বুঝতে পারছি বলেই আরও খারাপ লাগছে।
এ অবস্থায় আমার কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, সেই সিদ্ধান্তহীনতা যখন আমাকে, আমার মনকে অস্থির করে তুলেছে, সেই সময় ভেসে আসা অজানা, অচেনা বাউলের গান থেমে গেলো। এখন আরও পরিষ্কার ভাবে আওয়াজটা কানে আসছে। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। ধীরেধীরে দরজা খুলে দরজার চৌকাঠে পা রাখতেই চক্ষু স্থির হয়ে গেলো। এ কী দেখছি আমি? এ ও কি সম্ভব! দু’হাত দিয়ে ভালো করে চোখ কচলে তাকালাম।
ছাতিম গাছের নীচে এক অপূর্ব মায়াশরীর। যামিনীর শেষ যামে চাঁদের আলো যেন তরল দুধের মতো ছাতিমের পাতার ফাঁক গলে চুঁইয়ে পড়ছে। আর গাছের গোড়ায় দুটো শরীর একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। বাউলনির মুখে চাঁদের আলো এসে পড়েছে আর আধো আলো, আধো আঁধারিতে এক পর্ণশরীর। অযুত সংখ্যার ছাতিম পাতায় তৈরি সে শরীর বাউলনির কাঁধে মাথা রেখে সমানে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে। এও যে সম্ভব, এ দৃশ্যও যে গোচরীভূত হতে পারে, এ আমার কল্পনার বাইরে। আমি একপা নড়তে পারছি না। আমার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। আমি স্তব্ধবাক হয়ে পলকহীনভাবে দেখছি সেই অপ্রাকৃত দৃশ্য। এমন সময় একটা পেঁচা ডেকে উঠলো ঘন পাতার মধ্যে। অমনি পলকমাত্র সময়ে মুহূর্তমধ্যে সেই পর্ণশরীর থেকে পাতারা খসে পড়তে শুরু করলো। বিলীন হয়ে গেলো সেই শরীর।
মনে পড়ে গেলো, কানাই বাউল যেদিন কেঁদুলির মেলায় কুড়িয়ে পেয়েছিলেন শিশু কৃষ্ণভামাকে, সেই একইদিন শান্তিনিকেতন থেকে কুড়িয়ে এনেছিলেন এই ছাতিম শিশুকে। দুই শিশুকেই এনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর আশ্রমে। সেই থেকেই দু’জনে একইসাথে কানাইদার ভালোবাসার স্নেহরসে জারিত হয়ে একইসাথে এই আশ্রমের আশ্রয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
–” জানো ঠাকুর, সেই থেকে আমরা দুই বোন একই সাতে বড় হয়ে উটেচি গোঁসাইয়ের বালোবাসায় আর আদরে। “
কিন্তু তাই বলে — নাহ, এখন কোনোকিছুই আমার কাছে অপ্রাকৃত নয়। সবই বাস্তব। সবই সত্য। আমি অবাক হলাম বটে, কিন্তু আশ্চর্যান্বিত হলাম না। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম বাউলনির দিকে। এগিয়ে গেলাম, না কেউ আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেলো, সে আমি জানি না। আমি জানি না আমি কি হেঁটে গেলাম, না কি ওই চাঁদের আলো আমায় ভাসিয়ে নিয়ে গেলো আর একটা মৃদু হাওয়া এসে আমার ডান হাতটাকে নিয়ে ওর মাথায় রাখলো। ও চমকে উঠে আমার দিকে তাকাতেই আমি আবিষ্কার করলাম, একরাশ পাতা দিয়ে বানানো বিছানায় আমরা দু’জন দু’জনের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছি।