|| শাম্ভবী সংখ্যা ২০২১ || T3 শারদ সংখ্যায় প্রদীপ গুপ্ত

১| ফেরা

তুমি রঙ দেখেই ভেবে বসেছিলে
বুঝি ” গোলাপ “
তখনও ভারী বুটের শব্দেরা মিলিয়ে যায় নি।
ঘাসগুলো কিছুক্ষণ আগেও সবুজ ছিলো।
এখন ঘন কালো চুল রঙা রাত আর
কামারশালার গনগনে আগুন মিলে
এয়োতির সিঁদুর ঢেলে দিয়েছে ওদের বুকে।

শেষ যে ছবিটা ভেসে উঠেছিলো দু-চোখ জোড়া পর্দায়
সেখানে একটা গমরঙা ভোর ছিলো
আর ছিলো এলাচের খোঁসার মতো আলো,
একটা শালিকপাখি দু’পায়ে হাঁটতে হাঁটতে এসে
ওর নরম মখমলি ডানা দিয়ে আমার দু’চোখ…

আবার যাবো বলে আয়োজনে মেতেছে পৃথিবী।
নয়ানজুলীতে দুলছে কমলকোরক।
শিউলির বনে বসে গেছে প্রজাপতির মেলা।
এবার আর ফিরে আসা নয়।
যাবো — ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।
ক্রোধ আর প্রেমের সমস্ত আয়ুধে
কে যেন সাজিয়েছে ধুলি।

২| বৃত্ত

বিন্দুটাকে কাঁধে ফেলে হাটা লাগাই।
এ রাস্তা ও রাস্তা সে রাস্তা,
ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে বিন্দুটা ক্রমশ একটা অজগরের মতো সরলরেখা হয়ে যায়।
লম্বাটে থেকে লম্বাটেতর থেকে লম্বাটেতম।
হঠাৎ সেই অজগরটার মতো সরলরেখাটাকে
মাথার ওপরে তুলে ঘোরাতে থাকি।
ঘোরাতে থাকি, ঘোরাতে থাকি, ঘোরাতেই থাকি।
ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে ওটা ক্রমশ একটা
বৃত্ত হয়ে যায়। একটা বৃত্ত। লাট্টু যেভাবে
ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে বৃত্ত এঁকে চলে —
অথবা সূর্যের চারিদিকে পৃথিবী,
অথবা পৃথিবীর চতুর্দিকে চাঁদ।
সেই বৃত্তের ভেতর তৈরি হয় পাহাড়, নদী, সমুদ্র, জঙ্গল —
পাহাড়ের বুক চিরে ঝরে পড়ে ঝর্ণাধারা,
নদীর বুকে ভাটিয়ালি গান,
সমুদ্রের বুকে উত্তাল ঢেউ
জঙ্গলে গেয়ে ওঠে পাখি।

আচ্ছা!
তুমি তো একটা বিন্দু নিয়ে হাঁটছিলে —

ভালোবাসলে,
একটা বিন্দুতেও পৃথিবী এসে
হাজির হয়ে গান গেয়ে ওঠে।

৩| বিপরীতার্থক

পেছন ফিরে তাকালেই
পাহাড় হারিয়ে যায় আকাশের বুকে
হাঁ করে তেড়ে আসে খাদ।
আর অতল আঁধার।

তুমি কী নক্ষত্র খুঁজেছিলে?
নাকি ছায়া?
ছায়া দীর্ঘ হোক অথবা হ্রস্ব
সে আলোর দিকে তাকাতে পারে না কখনও
অথচ নক্ষত্রেরা
জ্বলজ্বল হয়ে আলো ঢালে ছায়ার বিপরীতে।

ধোঁয়া দেখে যে মশাল নেভায়
সে কোনোদিনও আলোকবাহী নয়।
ছায়াবাসী।

তুমি পেছনে ফিরো না
তুমি তো শৃঙ্গপথযাত্রী
অমৃতস্য পুত্রাঃ।

৪| বৃত্ত

যে অঙ্কুর মহীরুহ হয়ে ওঠে
সে কি আর মনে রাখে তার গর্ভের কথা?
যে আলো, মাটি, জল ….
তাঁকে স্তন্য, পরিচর্যা আর বাড়িয়েছিলো
মাতৃত্বের হাত !

এখন তাঁর পাতার ফাঁক গলে
চুইয়েও আলো পড়ে না ভূমিতে
বৃষ্টি কণাও ধরে রাখে অহংকারী পাতারা
ক্রমশ বন্ধ্যা হয়ে ওঠে তার নীচের জমি
চোখ মেলে যে জমিতে দাঁড়িয়ে
সে প্রসারিত করেছিলো
শত সহস্র বাহু,
মেলেছিলো ফুলের বাহার,
ফলের অহংকার।

তাঁর বীজেরাই মাথা কুটে মরে
তার পায়ের তলায়
আলোহীন, জলহীন বন্ধ্যা মাটিতে।

ঈশ্বর দেখেন সব, বোঝেন সব
কিন্তু নিরুপায় হয়ে দুচোখ বন্ধ রাখেন
আর নিজের কৃতকর্মের জন্য
আফসোস করেন।

৫| মায়াজাল

কিভাবে স্থির থাকি বলো
যদি বাতাস এসে না বসে দাওয়ায়
যদি কাকচক্ষু দিঘী চেয়ে থাকে
তবুও কিভাবে বন্ধ করি চোখ!

সেই যে হরিণী
তুমি যাকে মায়ামৃগ বলো
ছুটেছুটে ক্লান্ত হয়ে পড়ি
ছায়ার মায়ায়।

তার চাইতে শালুকই না হয় তুলে দেবো ফের
একশো আট কমল নয়ন
তুলে দেখো — ঠিক থিতু হয়ে
বসে গেছি মন্দিরের ঠাঁয়ে —
চোখ বোজে কাকচক্ষু জল
বসে থাকে সুবোধ বাতাস
হরিণীর স্বর্ণাভ চর্ম গালিচায়।

তখন বুঝি সন্ধ্যা নেমেছে চিরহরিৎ বনে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।