“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় প্রদীপ্ত দে

লফ্ট

১)
দীপিকা আমার স্ত্রী। সুন্দরী এবং গুনী। ফর্সা মুখশ্রী। মায়াবী দুটো চোখের ওপরে ভুরু দুটো জোড়া। হাল্কা কোঁকড়ানো চুল কোমরের আগে অবধি। কথায় আছে , রমণীর গুনে সংসার সুখের হয়। আমার ক্ষেত্রে কথাটা আংশিক। আমার সাত বছরের দাম্পত্য শিখিয়েছে রমনীর কপালগুনেই সব সুখের হয়। নাহলে কিছুই না। কলকাতায় থাকতে থাকতে সেই অসুখ ক্রমাগত বাড়ছিল। এমন সময়ে জেনেশুনেই ট্রান্সফার নিলাম মুর্শিদাবাদ। বিগত সাত বছরের স্মৃতি যাতে তাড়া করে অতদূর না পৌঁছাতে পারে। পরে অবশ্য সে ধারণা নির্মূল হয়ে গেছে। কিন্তু,ততক্ষণে …. যাক্ গে,মূল গল্পে ফিরি। গল্প ! গল্প কথাটা শ্রুতিমধুর তাই বললাম। কিন্তু,নিজের জীবনে ঘটে চলা ভয়াবহ বাস্তবের অভিজ্ঞতা ! তার সাথে গল্পের ফারাক আকাশ আর মাটির ফারাকের সমতুল্য।
আমরা গত তিনমাস যাবৎ আছি মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে। বাজারের অল্প দূরেই বাড়ি। বাড়ির পাশে একখানা খাটাল। দোতলা বাড়ির একতলায় ছোট্ট দুকামরার ছিমছাম ফ্ল্যাট। একফালি বারান্দা। চারপাশে লোকালয় কম। সেরকমই চাইছিলাম। কিন্তু,সমস্যা মিটল না। এখানেও প্রতি রাতে ঠিক সাড়ে বারোটা নাগাদ দীপিকা উঠে পড়ে । আর ঘুমোয় না ভোর অবধি। তোতন আসে। এই পুরো সময়টা‌ই সে তোতনের সাথে কাটায়। কলকাতা ছাড়লেও দীপিকার কোনো পরিবর্তন হল না।
তোতন আমার ছেলে। পাঁচবছর একমাস বয়সে মারা যায় অজানা জ্বরে। প্রচুর চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারিনি। এখন মা হিসেবে দীপিকার এটুকুই আর্তি। এইটুকু যাতে ওর থেকে না কেড়ে নিই। আমি চুপটি করে বিছানায় শুয়ে থাকি। দীপিকা তোতনের অপেক্ষা করে আলো নিভিয়ে। তোতন এসে দীপিকাকে ডাকে। তারপর দুজনে মিলে খেলা করে। গল্প করে। খাবার খায়। তারপর তোতন চলে যায়। এই সব কার্যকলাপ,কথোপকথন,সব‌ই চলে দীপিকার গলায়। আমি বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝে মুখ ডুবিয়ে শুয়ে থাকি।

দীপিকা প্রশ্ন করে,
– আজ কী খাবি তোতন ?
তোতন দীপিকার গলায় উত্তর দেয়
– চকলেট আইস ক্রিম।

আমি শুধু শুনে যাই। হতে পারে দীপিকা খুব গভীরভাবে মানসিক রোগী। তবুও আমি এই প্রক্রিয়ায় কোনো বাধা দিইনি এখনো। কলকাতায় থাকতে রাতে দাদা-বৌদির সমস্যা হত। তাদের রাতের ঘুম ভেঙে যেত। দীপিকা তখন নয় ছাদে ছুটোছুটি করতো, নয় বাগানে বল খেলত। তোতনের মন রাখতে দীপিকাকে রাতে বাইরে যেতে হতো । দাদা বহুবার আমাকে জোর করেছে মনোবিদের সাহায্য নেওয়ার জন্য। বৌদি কথা বলিয়েছে ওঝা-গুণীনের সঙ্গে। আমি কোনোটাই পারিনি। তাই কর্তৃপক্ষকে বহু অনুরোধ করে ট্রান্সফার নিয়েছি । যদি স্থানবদলে উন্নতি হয়।
২)
ছোট্ট দুকামরার ফ্ল্যাটটাতে ঢুকেই একটা ছোট্ট ড্রয়িং কাম ডাইনিং। যার ডানদিকে একটা সরু প্যাসেজ চলে গেছে। প্যাসেজের বাঁদিকে দুটো পরপর ঘর। প্রথম ঘরটার ওপাশে একচিলতে ব্যালকনি। দ্বিতীয় ঘরটা ব্যালকনিবিহীন। প্যাসেজের ডানদিকে প্রথমে রান্নাঘর ,শেষে বাথরুম। প্রথমের ঘরটাতে আমি দীপিকার শোবার বন্দোবস্ত করলাম। পরেরটাতে আমার । আমরা গত ছয়মাস আলাদাই শুচ্ছি। তা নাহলে দীপিকা বলে তোতনের আসা বাধাপ্রাপ্ত হয়। রাতে কোনোভাবেই কোনো আলো জ্বালানো বারণ। আলো জ্বালানোর সাথে সাথে দীপিকা গভীর রাতে বারান্দা বা ছাদে চলে যায়। মিথ্যে বলবো না। আমার ব্যাপারটাতে সংশয়ের থেকে ভয়‌ই বেশী লাগে। রাতে একদমই ঘুম আসত না আগে। এখন ঘুমের ওষুধ খাই। তাও হাল্কা জাগ্রত ভাব থেকে যায় উ‌ৎকন্ঠায়। তবুও উঠি না। টয়লেট চেপে থাকি। চারদিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার থাকে। বর্ষাকাল,তবুও কলকাতায় ঠান্ডা ভাবটা একটু বেশীই থাকতো আমাদের ঘরে। এখানে এসে সেটা আরো বেড়ে গেল। অন্ধকার হ‌ওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই একটা কনকনে ভাব থাকে ঘরময়। ঠিক যেন শীতকাল। সাথে যোগ হলো একটা গন্ধ। হাসনুহানা ফুলের গন্ধ। ভয়ে ঘর বন্ধ করে রাখতাম। দিনের বেলা বাড়ির চারপাশে দেখেছি। আমাদের বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে কোথাও হাসনুহানা ফুলের গাছ নেই।
কিছুদিন চলার পর একটা নতুন উৎপাত শুরু হল মাঝরাতে। ঘুমের ঘোরের মধ্যেই একদিন একটা আওয়াজ হল। মোবাইলের টর্চ নিয়ে চারপাশে বোলালাম। বিশেষ করে মেঝেতে। নতুন জায়গা। সাপখোপ নিয়ে আতঙ্ক আমার চিরকাল। কোথাও কিছু নেই। মোবাইলের লাইট বন্ধ করতে যাব এমন সময়ে হঠাৎ নজর গেল একটা জায়গায়। আমার ঘরে ঢুকে বাঁদিকের দেওয়াল বরাবর শেষের দিকে একটা দরজা। সেই দরজা খোলে বারান্দার দিকে। আর সেই দরজার ওপরেই আছে একটা লফ্ট। প্রস্থে সাড়ে তিন ফুট। উচ্চতা দুফুটের। এবং লফ্টটা বেশ লম্বা। বারান্দার ওপর বরাবর বিস্তৃত। লফ্টের পাল্লাটা দেখলাম খুলে গেছে। আশ্চর্য লাগলো ব্যাপারটা। শোবার সময় নিশ্চিত বন্ধ ছিল। অন্ধকারে কোনো আওয়াজ না করে দরজার সামনে একটা চেয়ার রাখলাম। তার ওপরে একটা টুল দিয়ে উচ্চতা বাড়ালাম। ঘুমের ওষুধ খেয়েছি বলে একটা ঝিমুনি ভাব কাজ করছে। তবুও কষ্ট করে ওপরে উঠে দেখলাম। যদি ইঁদুর বা ছুঁচো থেকে থাকে ভেতরে। পাল্লাটা সরিয়ে ভেতরে মুখ ঢোকাতেই মিষ্টি গন্ধে গা গুলিয়ে গেল। হাসনুহানা ফুলের গন্ধে ঠাসা ভেতরটা। এবং ভেতরের দেওয়ালগুলো বরফের মত ঠান্ডা। হঠাৎ কেমন যেন একটা অস্বস্তি হলো। লফ্টের সোজাসুজি দুটো চোখ যেন অন্ধকারে আমার দিকে চেয়ে আছে। ঠিক যেন একটা আবছা ছোট অবয়ব হাঁটু মুড়ে বসে আছে। বুকটা ধক্ করে উঠলো। কোনো পুতুল নয় তো ? সাথে সাথে আলো ফেললাম। কিছু নেই। চারপাশে কিছু ছেঁড়া মাকড়সার জাল আর একটা ছোট্ট মাকড়সা ছাড়া। পাল্লাটা বন্ধ করে নেমে গেলাম। তারপর বিছানায় নিজেকে ডুবিয়ে দিলাম ।
পাশের ঘরে ফিসফিসানি কানে আসছিল দীপিকার। আমার কান পেতে শোনার মত ক্ষমতা নেই। তাছাড়া সেই দৃশ্য আমি চাক্ষুষ করেছি আগে। তোতনের আত্মা আসুক চাই না আসুক। হলফ করে বলতে পারি, অন্ধকারে সেই অবস্থায় দীপিকাকে দেখে শিহরিত হবে না এমন মানুষ কম‌ই আছে। খোলা চুলের ঢাল সারা মাথা বেয়ে অবাধ্য ঝর্ণার মত নেমে গেছে। চুলের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায় দীপিকার জ্বলজ্বলে দুটো চোখ। যার মণি দুটো ক্রমাগত ওঠানামা করতে থাকে। অবর্ণনীয় সেই দৃশ্য!!
বেশিরভাগ রাতে ভয়ে দরজা বন্ধ করে ঘরেই শুয়ে থাকি । সেদিন টয়লেটে যেতেই হল। দরজা খুললাম আস্তে। সারা ফ্ল্যাটে কোনো আলোর ছিটেফোঁটা নেই। এক পা করে এগোচ্ছি আর নিজের নিশ্বাসের শব্দ শুনছি। ঘরের বাইরে ঘণীভূত অন্ধকার এসে ভয়টাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল। দীপিকার ঘরের থেকে আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। নীচু স্বরে তোতনকে রূপকথার গল্প শোনাচ্ছে দীপিকা। আমার ঘরের দরজার বিপরীতেই টয়লেট।
আমি আওয়াজ না করে টয়লেটে ঢুকে পড়লাম। মিনিট পনেরো পরে টয়লেট থেকে বেরিয়েই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। ঠান্ডা বেড়ে গেছে কয়েকগুন। সাথে হাসনুহানা ফুলের সেই গন্ধ। পেছন ফিরে টয়লেটের দরজা বন্ধ করতে গিয়ে বুকটা ধরে গেল। রাস্তার আলো আমার ঘরের ওপরের ঘুলঘুলির পেছনের সবুজ ঘষা কাঁচ ভেদ করে ঢুকছে। সেই আবছা আলোকে শুধু হাল্কা একটা সবুজাভ আস্তরণ বলা যায়। তাতে কাজের কাজ কিছু হয় না। হঠাৎ চোখ গেল বাথরুমের সাদা দরজায় সবুজাভ আলোর প্রতিফলনে। টয়লেটের দরজার ওপরের দিকে প্রথমে দেখলাম কিছুর ছায়া দুলছে। ভালো করে চেয়ে দেখার পর স্পষ্ট হল। একটি বাচ্চার হাটু থেকে পায়ের গোড়ালির ছায়া দুলছে। এবং সেই ঝুলন্ত পা বেরিয়েছে দরজার ওপরের খোলা লফ্ট থেকে। হৃদস্পন্দন থেমে গেল। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে দেখলাম তার দুলুনি থেমে গেল। তারপর দুটো পা ভেতরের দিকে তুলে নিল। সাথে সাথেই একটা দড়াম করে আওয়াজ হল । লফ্টের পাল্লা বন্ধ হয়ে গেল । সেই আওয়াজে দীপিকাও গল্প বলা থামিয়ে দিলো। তারপর তোতনের নাম ধরে ডাকতে শুরু করলো। বুঝলাম তোতন চলে গেছে। আর সেই ফুলের গন্ধটাও নেই।
৩)
সেই রাতে আর ঘুম আসেনি। ভোরের আলো ফুটলে ঘন্টা তিনেক ঘুমিয়েছি। মাথা কাজ করছে না। একবার মন বলছে, সব‌ই যদি আমার দেখা স্বপ্ন হয় ? হতেই তো পারে। পরক্ষণেই মস্তিষ্কের সায় মিলছে না। সকালে উঠেই গেলাম দীপিকার ঘরে। রোজ সকালের মত ঘুমিয়ে আছে।
খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে আসছি। দরজা দিয়ে বেড়িয়ে যাবো এমন সময় দীপিকার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরোলো একটা কথা।
– ফায়জা খুব ভালো মেয়ে। এটা তুমি ভালো করলে না।
কথাটা অদ্ভুত লাগলেও ভাবলাম হয়তো ঘুমের ঘোরে ভুল বকছে। চুপচাপ চলে এলাম। কিন্তু মাথায় সংশয়ের কাঁটাটা বিঁধেই র‌ইলো। অফিসে গিয়েও সর্বক্ষণ এই চিন্তার মেঘে আচ্ছন্ন রয়ে গেলাম। ফেরার পথে বাড়ির পাশের খাটালে গেলাম। গোয়ালা কিরণ রাইয়ের দীর্ঘদিনের খাটাল। বারান্দা থেকে বহুবার ডেকে দুধ দেওয়ার কথা বলেছি। সে কিছুতেই কথা কানে তোলে না। আজ ভেবেছি সামনে গিয়ে বলবো। প্রতিদিন বাড়িতে এক লিটার দুধ দিতে বলতেই সে অস্বীকার করল। বিরক্ত হয়ে কারণ দর্শাতে বললাম।
বহুবার খোঁচাতে তার মুখ থেকে কয়েকটা শব্দ বেরোলো
– বুরি সায়া হ্যায় বাবু। বালবচ্চেওয়ালা আদমি হ্যায়।
অনেকটা সাধ্যসাধনার পরে তার মুখ থেকে সত্যিটা বেরোলো। ঘটনা পাঁচবছর আগের। সদ্য মাতৃহারা কন্যাসন্তানকে নিয়ে একতলায় এসে ওঠেন এক মুসলিম। চারমাস পর বন্ধ একতলায় উদ্ধার হয় মেয়েটির মৃতদেহ। শ্বাসরোধ করে খুন। তারপর লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ঘরের লফ্টের ভেতরে। মেয়েটির নাম ? যা শুনতে চাইছিলাম না। ফায়জা !!
উত্তেজনায় দমবন্ধ হয়ে আসছিল। শরীরের সর্বত্র কেমন যেন কম্পন অনুভব করলাম। অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে খাটাল থেকে বেরিয়ে গেলাম উর্ধ্বশ্বাসে । পেছনে ফিরে কিরণ রাইয়ের দিকে তাকাতেও ভয় করছিল। বাড়িতে ঢুকতেই চোখাচোখি হল দীপিকার সাথে। ভয়! ভয়! ভয়! ভয় আমাকে গিলে ফেলেছে ততক্ষণ! দুটো সিদ্ধান্তে একসাথে উপনীত হয়ে গেলাম। ফায়জার ছায়াই ছিল কাল রাতে। এবং এতদিন ধরে রাতে দীপিকার কাছে তোতন‌ই আসে। দীপিকা কোনো মানসিক বৈকল্যের শিকার নয় । নাহলে সে ফায়জার নাম‌ও জানতে পারতো না।
৪)
প্রকৃতির নিয়মে রাত নামলো। যত না বাইরে তার চেয়ে ঢের বেশী মনে। বিকেল থেকেই পেট গোলাতে শুরু করলো ভয়ে। বমি বমি ভাব। দীপিকার সাথে একসাথে বসে খেলাম রুটি আর পনীরের তরকারি। দীপিকা যেন অন্য কোনো চিন্তায় নিমগ্ন। কোনো কথা নেই কারোর মুখে। খাওয়া সেরে ওঠার আগে শুধু একটাই কথা বলল
– আজ ঘুণাক্ষরেও কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠবে না। উঠলে আমি আর তোমার সাথে থাকবো না ।
এতদিন অনুরোধের সুরে ছিল কথাটা। আজ বলল শাসানোর সুরে। আমি এমনিতেই গুটিয়ে ছিলাম। আরো শামুকের মত যেন খোলসের মধ্যে সেঁধিয়ে গেলাম। রাত বাড়লো। রক্তচাপ ও উৎকণ্ঠা উর্ধ্বমুখী । মাঝরাত হতেই আবার সেই কনকনে ঠান্ডা ভাব। ফ্যান বন্ধ করলাম। আরো নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। বাইরের গাছের প্রতিটা পাতার খসখসানিও যেন কানে আসছে। বুঝলাম,এভাবে ঘুম আসবে না। উঠে ঘুমের ওষুধ নিলাম। রোজ একটা বড়ি নিই। সেদিন দুটো নিলাম। দুচোখের পাতা ভারী হয়ে গেল। তবুও ঘুমোতে পারলাম না। পাশের ঘরে দীপিকার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। খুব মৃদু স্বরে গান গাইছে দীপিকা। সাথে খুব চাপা একটা হাসির শব্দ। এবং ভয়ের কথা এইটাই যে দুটোই একযোগে শোনা যাচ্ছে। মোবাইলের আলো জ্বেলে দেখলাম লফ্টের পাল্লা খোলা। আমি ডিসেম্বরের ঠান্ডায় কুলকুল করে ঘামছি। অথচ নিজেকে শুইয়ে রাখতে পারলাম না। অন্য চিন্তা করলাম। দুটো কাঁপাকাঁপা পা নিয়ে বারান্দার দিকের দরজা খুললাম চুপিসারে। আজ বারান্দা থেকে শোনার চেষ্টা করবো। বারান্দার ঠান্ডা মেঝেতে পা দিতেই গায়ে আরো কাঁপুনি ধরলো। মেরুদণ্ডের নীচ থেকে ওপর অবধি কনকনে ঠান্ডা। অথচ ভয়ে ঘামছি। অদ্ভুত বৈপরীত্য নিয়ে আরো একটু বারান্দা ধরে এগোলাম। দরজার ভেতর থেকে শব্দ আসছে। আমি দরজার কাছাকাছি গিয়ে কান পাততেই দীপিকা গান বন্ধ করে দিলো। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম কয়েক সেকেন্ড। হঠাৎ মনে হল শরীরের ওজন কয়েক মণ বেড়ে গেল। আমি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ পেছন থেকে আমার গেঞ্জির তলাটা ধরে যেন কেউ টানলো। গায়ের রোমগুলো দাঁড়িয়ে গেল।
আমার ঘুরে তাকানোর সাহসে কুলালো না। কিছুক্ষণ পর আবার টান। এবারে পায়জামার কাপড় ধরে। বুকের ভেতরে যেন কেউ হাতুড়ি মেরে হৃৎপিণ্ড সচল রাখছে। ভঙ্গুর সাহসে ভর করে পেছনে ফিরলাম। এবং সেই যে ফিরলাম তারপর আর মনেহয় নিজের জগতে ফিরতে পারলাম না। একখানা বাচ্চা মেয়ের আবছায়া অবয়ব দেখলাম আধো- অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে খয়েরী রঙের ফ্রক। দুটো বিনুনি ঝুলছে দুপাশে। চোখের মণি দুটো ফ্যাকাশে । কোটরে ঢুকে যাওয়া চোখ যেন কত রাত ঘুমায়নি। অল্প ঠোঁটটা বেঁকিয়ে হাসতে গিয়েও হাসলো না। যেন সেই হাসি আমার অনুমতির অপেক্ষা করে আছে। আমার সারা শরীর যেন পাথরের মত ভারী হয়ে আসছে। আমি ঘরের ভেতরে আসার জন্য পা তুলতে গেলাম। কিন্তু,পারলাম না। এবং হঠাৎ অচৈতন্য হয়ে লুটিয়ে পড়লাম মেঝেতে।
৫)
সকালে নিজেকে পেলাম নিজের বিছানায়। কখন এসেছি,কে দিয়ে গেছে মনে নেই। শরীর এবং মাথা ভার হয়ে আছে। মাঝেমধ্যেই সংজ্ঞা হারাচ্ছি মনেহয়। কানে হঠাৎই তালা লেগে যাচ্ছে। দিনের এবং রাতের কিছু সময়ের হিসেব পাচ্ছি না। রাত দশটায় হয়তো টেবিলে বসে খেয়েছি। কিন্তু, রাত বারোটায় মনে হচ্ছে কিছুই খাইনি। দিনের বেলায় অসুবিধা হচ্ছে না। অফিসে তেমন অস্বাভাবিক কিছুই ঘটছে না। যা কিছু ঘটছে আড়ালে। যেমন অফিস থেকে ফেরার পথের স্মৃতি মাথায় থাকছে না। কয়েক ঘন্টা পরে হঠাৎ সন্ধ্যেবেলা নিজেকে আবিষ্কার করেছি সামনের মুসলিম কবরখানায়। রেজ‌ওয়ানা বেগমের কবরের পাশে বসে দেখলাম কাঁদছি। খোঁজ নিয়ে দেখলাম মহিলা ছিলেন ফায়জার মা।
অন্য একদিন নিজেকে পেলাম অন্য একটি কবরের পাশে। যার পেছনেই হাসনুহানার ঝোপ। যাতে থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে। মাতাল করা গন্ধে ম ম করছে চারদিক। অল্প আলোয় মার্বেলের ফলকে নামটা পড়লাম। ফায়জা ইসলাম। মৃত্যুর তারিখ পাঁচ বছর আগের। অদ্ভুত ব্যাপার একটাই। এসব দেখেও আমি ভয় পেলাম না। কেন সেটা বুঝেছি কদিন পরে। ততদিনে রাতে আমার ভেতরে আমি ক্রমশ প্রচ্ছন্ন হয়ে গেছি। এক রাতে আমার আচমকাই সম্বিত ফেরে। চোখ খুলে চারপাশটা দেখেই ভয়ে আঁতকে উঠি। অন্ধকার ঘরে আমি নিজেকে পেলাম লফ্টের ওপর বসে। কীভাবে ওপরে উঠলাম সেটাও বোধগম্য হলনা। আমার দুটো হাতে দেওয়ালে ঘষা খাওয়ার দাগ। হাটুতে ছাল উঠে গেছে ঘষা খেয়ে। শূন্যে আমার পা দুটো পেন্ডুলামের মত দুলছে। ঠিক আগের দিনের মত। তফাত একটাই। এবারের পা দুটো আকারে অনেক বড় এবং তার আবছায়াটা প্রায় পুরো দরজাটাকেই ঢেকে ফেলেছে। এবং আমি নিজেও কিছু বলে যাচ্ছি । যার মানে আমি নিজেই জানিনা। এটুকুই স্মৃতি। তারপর আবার কিছু মনে নেই।
এরপর থেকে আমি আর ভয় পাইনি। এখন দরজা খুলেই শুচ্ছি। রাতের অন্ধকারে দীপিকার ঘরেও যাচ্ছি। তোতনের সাথে আমারও কথা হচ্ছে আজকাল। ফায়জাও যোগদান করে। দুটো বাচ্চা ভাইবোনের মত মেলামেশা করতে শুরু করেছে। রাত কেটে গেলে কিছু টুকরো টুকরো স্মৃতি শুধু রয়ে যাচ্ছে মাথায়। স্বপ্ন না বাস্তব সেটা জানার এবং জানানোর ইচ্ছে এখন তলানিতে। তবে,এটুকু বুঝতে পারছি ফায়জা খুব জেদী মেয়ে। আমাকে ছেড়ে কোত্থাও যাবে না।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।