আজ হঠাৎই সান্ধ্য ভ্রমণের জন্য বেরোলাম । একটা মা কুকুর আর তার চার পাঁচটা বাচ্চা আমার পিছু নিয়েছে । আমি ঘুরতে গেলে ওরা প্রায়ই আমাকে রাস্তাটুকু পার করে দেয় । কেন, তা পরে বলব নাহয় ।
কিন্তু আজ ওদের সাথে আরেকজনও চলছে আমার পাশাপাশি । এক ঘটিগরম ওয়ালা । এর আগেও গ্যাং ডাকাতি ঘটেছে আশেপাশে । আর চুরি,পকেট মারি,গলা থেকে বা কান ছিঁড়ে সোনার গয়না নিয়ে নেওয়ার সে তো হরহামেশা । হাতে একটা সোনার আংটি ছিল, তাই ভয়েই ছিলাম বেশ । যদি আঙুলটাই কেটে নেয়? তখন??
রোজ খবর শোনার জন্যই এসব চিন্তা আর কি!
মনে এসব উল্টোপাল্টা চিন্তা। অথচ তিনি অনুসরণ করেই যাচ্ছেন । ঘুরে তাকালে থমকে যাচ্ছেম । গতিক স্বাভাবিক ত নয়ই বরং অস্বস্তিকর । আমি সহ্য করতে পারলাম না । বেশ রেগে গিয়েই বলে উঠলাম –” কী চাই আপনার? মতলবটা কী? ডাকব নাকি লোক?”
উনি সামান্য ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে বললেন — “আসলে আমি ঘটি গরম বিক্রি করি । আপনি ত ঘর থেকে বেরোনোর সময় বলে বেরোলেন আসার সময় সবার জন্য কিছু কিনে নিয়ে যাবেন । আমি শুনেছি সব রাস্তা থেকে ।”
আমি বললাম — “তো কী হয়েছে?”
উনি বললেন — ” আমি ঘটি গরম বিক্রি করি । যদি নিতেন, তবে ঘরে ছেলেকে বলেছি আজ পিৎজা খাওয়াবো ………” আর কিছুই বললেন না ।
কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন — ” আসলে আজকালকার বাচ্চা, আর আমি বাবা, সাধ তো আমারও হয় । যদি নিতেন!” চোখে অদ্ভুত আবেগ ।
সামান্য গলা নীচু করে বললাম,, “কত করে?”
উনি একটু উৎসাহিত হয়ে বললেন — ” ৫, ১০, ১৫ ।”
আমি বললাম–” ১৫ টাকার তিনটে দিন, একটাতে টক বেশি হবে ।”
বানাতে শুরু করলেন তিনি । চোখে সামান্য আনন্দ আর অনেকটা হতাশা । হয়তো এতো অল্পে কিছুই হবেনা, তাই ।
প্যাকেটটা হাতে দিয়ে যখন চলে যাবেন, তখন আমার মনে হল, আমি চাইলে কিছু একটা করতেই পারি ওনার জন্য । ওনাকে রাস্তায় দাঁড়াতে বলে আমি মাঠে নেমে গেলাম । ওখানেই মর্নিং বা ইভিনিং ওয়াকে যাই আমি । সেই সুবাদে বেশ কিছু বন্ধু আছে আমার । গিয়েই বললাম -“ঘটি গরম খাবি??”
ওদের বলতে দেরী “হ্যাঁ হ্যাঁ” করে চেঁচিয়ে উঠতে দেরী নেই । গোটা আট-দশ বন্ধুরা খাবে বলে উঠল । আমি তাকে ডেকে নিয়ে গেলাম মাঠে । একের পর এক অর্ডার হয়েই যাচ্ছে, আর তিনি বানিয়েই যাচ্ছেন । আধ ঘন্টার মতো বিক্রি হল । আমি দাঁড়িয়ে না থেকে হাঁটতে শুরু করেছি । যেতে যেতে দেখলাম ওনার সব ঝুড়িভাজা শেষ । আবারও এক রাউন্ড হেটে আসতে আসতে ভীড়ও আর নেই । যাবার সময় উনি আমার সামনে এসে বলে গেলেন — “ধন্যবাদ বোন” ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম – “আপনার ছেলের নাম কী?”
উনি বললেন – “অনিকেত” ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম — “পিৎজা হবে ত এতে? নাকি আর লাগবে?”
উনি বললেন–” না লাগবে না ,হয়ে যাবে ।”
আমি অনাকে ২০০ টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু উনি নিতে চাইলেন না । আমি বললাম — “একটু আগে বোন বললেন । তো পিসি যদি ভাইপো কে কিছু দেয়, তবে দাদা কি মাঝখানে আসে?”
উনি আর কথা বাড়ালেন না, তবে কথা দিয়ে গেলেন এদিকে গেলে দেখা নিশ্চয়ই করে যাবেন । আর আমিও বললাম ওনার ছেলেকে একবার নিয়ে আসেন যেন ।
আসলে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি । কখনো দাদা, দিদি, কাকু এসব সম্পর্ক কী জানিনা । যদি কেউ আসে তবে খুব আনন্দ হয় ।
এদিকে সন্ধ্যা হয়ে বেশ দেরী হয়ে গেছে । আমাকেও ফিরতে হবে । বাড়ির দিকে ফিরছি আমি । কিছুদূর রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে গেলেন সেই ঘটি গরম দাদা । আর অন্ধকারে সেই রাস্তা দিয়েই সাইকেল চালিয়ে ফিরে আসছে আরেক আবছা মূর্তি, আমার বাবা !