ধারাবাহিক অনুবাদ গল্পে পূর্বা দাস (পর্ব – ৩)

যুদ্ধের প্রহর 

সবুজ ইউনিফর্ম পরা মানুষটা একদম দড়াম করে আছড়ে পড়ল। কুঞ্জর গলা থেকে একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। লোকটা মরে গেল নাকি! এত দ্রুত সবকিছু ঘটল যে কুঞ্জ বেশ কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়ল। কিন্তু সব ছাপিয়ে যেটা ওর মনে হচ্ছিল, সেটা একটা ভীষণ অস্বস্তিকর অনুভূতি। ইস! লোকটা ওর নগ্ন পশ্চাদ্দেশ দেখে ফেলেছে।
কুঞ্জ অচেতন মানুষটিকে বয়ে নিয়ে এল ঘরে। ওর বাবা-মা তো বিস্ময়ে প্রায় বাক্যহারা। কুঞ্জ তো পায়খানায় গিয়েছিল। সেখান থেকে এ কাকে ও নিয়ে এলো ঘরে! তাও এমন একজন অজ্ঞান, অচৈতন্য এবং সম্ভবত বিদেশী মানুষ।
” আজকাল যে কি সব হচ্ছে!” কুঞ্জর মা গজগজ করছিল।
“যুদ্ধ, মা, যুদ্ধ। যুদ্ধ চলছে পৃথিবীতে। খুব সম্ভব যুদ্ধ করতে আসা একজন সৈনিকই হবে এ।” কুঞ্জবিহারী লোকটিকে ওর নিজের বিছানায় শোয়াতে শোয়াতে উত্তর দিল।
এতক্ষণে সৈনিকটিকে ভাল করে দেখার অবসর পেল ও।বহুদিন যেন সে ভালভাবে খেতে পায়নি লোকটা। শরীরটা ক্ষীণ হতে হতে প্রায় একটা সরু বাঁশের মত। শরীর থেকে একটা উৎকট দুর্গন্ধ আসছিল। এই দুর্গন্ধ জলে- জঙ্গলে বাস করার গন্ধ। পায়খানায় পড়ে যাওয়াতে ওর তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি। পরিষ্কার মাটিতে তেমন নোংরাও লাগেনি মুখে-চোখে। কিন্তু মুখ এবং ঠোঁট ফাটা আর পুরনো ক্ষতে ভরা। দগদগে ঘা রয়েছে এখানে সেখানে। চোখ আর কান যেন কোনোক্রমে মাথার খুলির সাথে লেগে আছে। কুঞ্জ বুঝল, লোকটি মরণাপন্ন।
” এটাকে কেন তুই এখানে আনতে গেলি ?” কুঞ্জর মাথায় সজোরে একটা চাটি মেরে বাবা রাগ রাগ গলায় বলল, ” তোর কি বুদ্ধিশুদ্ধি হবে না কখনো কুঞ্জ?”
” উফ! কি জোর তোমার আঙুলে, বাবা। বল কি করা উচিত ছিল আমার? ওই পায়খানার ঘরটাতেই ওকে ফেলে আসলে ভালো হত?” কুঞ্জ উঃ! আঃ! করতে করতে ব্যথা লাগা জায়গাটাতে হাত বোলাচ্ছিল।
“কি !” অবাক হবার আর কিছু বাকি রইল না বাবার। ” তুই ওকে পায়খানার ভেতর পেয়েছিস? সে কেমন করে হল? “
“আরে, আমি, মানে, ইয়ে… কাল রাতের খাওয়াটা একটু বেশিই হয়ে ছিল তো, পেটটা গড়বড় করছিল। তা প্রায় হয়েই এসেছিল কাজটা। আমি তো পেছন দিকে মুখ করে বসে আছি, আর ও ঝড়ের মত ঢুকে এল ভেতরে। আমি… আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম… আর বিশ্বাস কর… বুঝতে পারিনি… পিতলের বালতিটা ছুড়ে মেরে ছিলাম… সত্যি বুঝিনি…”
” কি মনে হয়, লোকটা কি মারা যাবে?” ওর দিকে নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কুঞ্জর বাবা।
” জানি না। প্রথমে মনে হয়েছিল আমি বোধহয় মেরেই ফেলেছি ওকে। কিন্তু দ্যাখো, ও কিন্তু নিঃশ্বাস নিচ্ছে এখনও। ওর বুকটা ওঠানামা করছে। খুব আস্তে আস্তে, কিন্তু করছে। করছে না বাবা? ” কুঞ্জ আশ্বাস খোঁজে।
” কিন্তু ও যদি আমাদের শত্রুপক্ষের লোক হয়?” মা ফিসফিসিয়ে বলে।
“সত্যিই কি আমাদের কোনো শত্রু আছে?” নাটকীয় ভাবে ঘাড় ঝাঁকায় কুঞ্জ। ” আমি খুশিই হতাম তাহলে। এই মানুষটাও যতদূর সম্ভব আমাদের মতই হতভাগ্য।”
” বাঃ! কি ভালো কথাই না শোনালে। তবে একথা জেনে রাখ যে, আমরা কিচ্ছুটি করতে পারব না তোমার এই হতভাগ্যের জন্য।” বাবার রাগ এখনো কমেনি।
বাবা-মা এখন দুজনেই ঝুঁকে পড়ে লোকটিকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করল।
“শোন কুঞ্জ, হয় তুমি ওকে যেখান থেকে এনেছ, সেখানে রেখে এসো; নইলে তৈরি হও ওর অন্তিমসংস্কারের দায়িত্ব নেবার জন্যে।” বাবা নিজের অভিমত জানিয়ে দেন। ” এ তো মরতে চলেছে। যেন জীবন্ত কঙ্কাল দেখছি আমি। আর আমাদের কুঞ্জ কিনা একেই পিতলের বালতি দিয়ে মারল মাথায়। কেন যে মরতে মানুষটা এখানে এল!”
বাবার স্বগোতক্তিতে আর কান দেয় না কুঞ্জ। বিছানায় শোয়া মানুষটির পাশে বসে পড়ে ও। কপালের কাটা জায়গাটায় হাত বুলোতে বুলোতে নিজের মনেই বলে, ” যাক বাবা শেষ পর্যন্ত বেঁচে আছে ও। অন্তত ওকে মেরে ফেলার পাপ কাজটা আমি করে ফেলি নি।”
” তা ঠিক। যখন সেটা তুমি করো নি, আর ওকে আমাদের ঘরেই এনে তুলেছ একজন যথার্থ উজবুকের মত; বাকি দায়িত্বটুকুও দয়া করে তুমিই নেবে আশা করি।”
“বাবা!” কুঞ্জ আহত গলায় বলে, ” তুমি তো কখনই দুঃখী আর অসুস্থ মানুষদের অবহেলা কর না। আমাকেও তো তুমি তাদের ওপর সমব্যথী হবার শিক্ষাই দিয়েছ এতদিন। তাহলে এখন…”
“ও কথা এই যুদ্ধের সময় খাটে না, বুঝলে বুদ্ধুরাম! যাই হোক, যা করবে সাবধানে।” শেষবারের মতো কুঞ্জ কে সতর্কবার্তা দিয়ে বাবা রান্নাঘরের দিকে পা চালায়।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।