হৈচৈ শনিবারের গল্পে পুলস্ত্য দেবনাথ

স্বপ্নছোঁয়া
অনুরূপ তৈরি। সঙ্গে আরও সাঁতারুরাও। দুশো মিটার ব্যাকস্ট্রোকের ফাইনাল। অনুরূপের পদক জেতার সুবর্ণ সুযোগ। হিটে সেকেন্ড হয়েছে। তাই ও জানে চাপ নিলে চলবে না।
অনুরূপ দেব। বয়স চব্বিশ । সুইমার হিসেবে নাম করেছে বেশ । তবে আমাদের জন্যে ও সাঁতারুর থেকেও বন্ধু বেশী। ভারতবর্ষে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ওর উপরে কোনো প্রভাব ফেলেনি। সাত বছর বয়স থেকেই ও জলকে ভালবেসেছে। সত্যি বলতে জলই হল ওর জীবন।
ছোটবেলা থেকেই মেডেলে ভরে যেত বাড়ির তাক। ব্যাকস্ট্রোক ছিল ওর ফেভারিট। তাই অনুরূপের প্রথম মেডেল এসেছিল ব্যাকস্ট্রোকে, মাত্র ন’বছর বয়সে।
পড়াশোনায় মোটামুটি ভাল ছিল। খুব বেশি স্কুল কামাই করত না। ব্যবহারও খুব ভাল। দুষ্টুমি করত না । বন্ধুদের মধ্যে ওই ছিল আমার সবচেয়ে কাছের ।
তেরো বছর বয়সে ওর বাবা মারা যাওয়ার পরে ওর মা হল ওর একমাত্র অবলম্বন। এক সময় সুইমিং ছাড়ার কথা ভেবেছিল অনুরূপ। তবে অনুরূপের প্রতিভার কথা আমাদের জানা ছিল, তাই যারপরনাই ওকে উৎসাহ দিতাম আমরা বন্ধুরা , ফলস্বরূপ ও সুইমিং ছাড়ল না শেষমেষ। আর ছাড়েনি বলেই কমনওয়েলথ গেমসে একটা গোল্ড আর একটা ব্রোঞ্জ এল ওর দখলে। তখনই বুঝেছিলাম ও লম্বা রেসের ঘোড়া।
আর আজ ২০৩২ এর ব্রিসবেন অলিম্পিকসে অনুরূপ ব্যাকস্ট্রোক ফাইনালে। এই অলিম্পিকসে এখনো পর্যন্ত ভারত ভাল ফল করছে। অনুরূপের উপরেও রয়েছে সারা ভারতবর্ষের নজর।
অনুরূপ পাঁচ নম্বর লেনে। তবে পরীক্ষা কঠিন হবে। তার কারণ আমেরিকার জন ব্রায়ান্ট আর চীনের চেন সুং হোয়াই। এরাই আগেরবার সাঁতারে জয়েন্ট হায়েস্ট মেডেল উইনার।
সবাই রেডি । বন্দুকের শব্দেই শুরু মেডেলের দৌড়। তবে অনুরূপ পিছিয়ে। প্রথম পঞ্চাশ মিটারের শেষে ও পাঁচ নম্বরে। তবে এখনো অনেক বাকি। কিন্তু একটা সময় মনে হল ও পারবে তো? তক্ষুনি আমার মনে পড়লো ওর বলা কথাটা,” দেখিস পুলক আমি মেডেল আনবই!”
এই ভাবতে ভাবতে আমি দেখলাম পরের পঞ্চাশ মিটার শেষ। কিন্তু মেডেল দৌড়ের অর্ধেক হয়ে যাবার পরেও অনুরূপের র্যাঙ্ক পাঁচ। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ও জিতবে।
দেড়শো মিটার শেষ, অনুরূপ এখন চার নম্বর পজিশনে।
শেষ পঞ্চাশ মিটার। আস্তে আস্তে ও গতি বাড়াচ্ছে ।আর এখন আয়ারল্যান্ডের কেভিন ডার্স্টান কে পিছনে ফেলে দিয়ে ও নম্বর তিনে।
লাস্ট পঁচিশ মিটার । হয়তো ব্রোঞ্জই আছে কপালে। কিন্তু এক সেকেন্ডের মধ্যে দেখলাম ও নম্বর দুইয়ে। পিছনে ফেলে দিয়েছে চীনের সুং কে। এবার ভারত আর আমেরিকার লড়াই। দেখলাম অনুরূপ আধ হাত এগিয়ে। কিন্তু পরক্ষনেই দুজন একই জায়গায়। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে রাজি নয়।
টিভির সামনে বসে আমি ঘামছি। ভাবলাম এবারও মনে হয় রূপো নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
আমার মনে হল অনুরূপ হাঁপিয়ে পড়েছে। তাই ওর স্পিড একটু কমলো। তবে শেষের পথে এখন এই ফাইনাল। শেষ পাঁচ মিটারে অনুরূপ জান লরিয়ে দিল। দুই সেকেন্ডের মধ্যে দুজনে ওয়াল টাচ করল।
ম্যাচ শেষ। দেখে মনে হচ্ছে, ভারত আর আমেরিকা, দুজনে একসাথে ওয়াল টাচ করেছে। নাকি ভারত পরে আমেরিকা আগে। রিপ্লেতে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তাই কনফার্মেশনের জন্য অপেক্ষা করলাম। কনফার্মেশন আসল এবং যা দেখলাম তাতে আমি বিস্মিত।। পরিষ্কার লেখা আছে–
Anurup Deb, India(Gold) time—1:54:52.
নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। কমেন্টেটর অজয় মেহতা বলছেন,”ভারতের হয়ে ইতিহাস তৈরী করলেন অনুরূপ। “
হ্যাঁ বন্ধু , তুমি পেরেছ। তোমার বাবার মৃত্যুর দিন তুমি যেমন কেঁদেছিলে, আজ মেডেল জিতেও তোমার চোখে যে জল, তা আনন্দাশ্রু বৈকি!
হয়তো এই মেডেলটা ওর বাবাকেই উৎসর্গ করবে। ওর বাবাই ওকে সাঁতারে উৎসাহ দিয়েছিল।
আমার চোখের জল বাঁধ মানছে না। অনেক দিন পর একজন ভারতীয় পোডিয়ামের মাঝখানে। আজ ভারতের গর্বের দিন।
কিন্তু আমার চোখ তখন দেওয়ালে, আমার ছোটবেলায় আঁকা একটি ছবির উপর। গোল্ড মেডেল হাতে অনুরূপ। ছবিটা এঁকেছিলাম একটা স্বপ্ন দেখে। আজ স্বপ্ন সত্যি হলো বন্ধু!