কর্মক্ষেত্র- আকাশবানী কলকাতা
শখ- লেখালিখি, বইপড়া, গীটার বাজানো, ছবি তোলা।
মৃত্যুহীন শোক ও হলোকাস্ট
শোক। ম্যুহমান করে দেয়। মৃত্যুহীন শোক। কিছু শোক আবার ঝাড়বাতির মতো দুলতে থাকে আজীবন। কখনো আলো ছড়িয়ে তার উপস্থিতি জানান দেয়।
১৯৪৩। হলোকাস্ট। অন্ধকার। ইতালির ত্রিয়েস্তের অন্ধকার কারাগার। চারিদিক ধোঁয়াশা। মাকড়সার জালের মত। সকলের চোখ এড়িয়ে গোপনে চিঠি লিখে চলেছেন এক বাবা। ড্যানিয়েল ইস্রায়েল। এক সাধারণ ইহুদি। আবার সাধারণ নয়ও। কারাগারে বন্দি। অপরাধ ‘সে ইহুদি’। ইতালি তখন জার্মানির নিয়ন্ত্রণে। ইতালিতে বাস করা ইহুদি পরিবারের মানুষজন অত্যাচারিত। তাঁদের অন্তরাত্মা ক্ষতবিক্ষত। ইহুদিরা গ্রেপ্তার হচ্ছেন। অকারণেই। ড্যানিয়েল এক ইহুদী দর্জি। শহর থেকে কিছুটা দূরে তাঁর গদি সেলাই-এর দোকান। ১৯৪৩ সালেই নাৎসি বাহিনী কারাগারে বন্দি করে তাঁকে। স্ত্রী অ্যানা ও দুই পুত্র বাড়িতে। হলোকাস্টের বাড়ি মানে তখন দেওয়ালের গায়ে লেগে থাকা দুশ্চিন্তা আর আতঙ্ক। অ্যানার বাবা এবং ড্যানিয়েলকে তাঁদের দোকান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে ত্রিয়েস্তের কারাগারে পাঠানো হয়।
অ্যানা ও তাঁর দুই পুত্র আত্মগোপন করে অন্য একটি বাড়িতে। পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই তাঁদের। দিন ও রাত ছায়াময়। এমন অবস্থাতেও প্রতিদিন সেই গোপন বাড়িতে এসে পৌঁছোয় একটা প্যাকেট। মা অ্যানা আকুলি বিকুলি করতো সেই প্যাকেটের জন্য। দুই ছেলের কৌতুহলী চোখ। কোথাও বা টুকরো অবিশ্বাসের ছোঁয়া!
কিন্তু প্যাকেট থেকে বেরিয়ে আসে ড্যানিয়েলের নোংরা জামা-কাপড়। অ্যানা জামা-কাপড় হাতে পেয়েই জামার কলার, হাতা খুঁজে বেড়ায়। তবে কি পাগলামি? নাকি ভালোবাসা! স্বামীর গন্ধ লেগে থাকা জামা-কাপড়। স্ত্রী জামার কলার, হাতার কাফের সেলাই খুলে ফেলে আস্তে আস্তে। বেরিয়ে আসে রোল করা কাগজ। কাগজে লেগে থাকা ভালোবাসা ওম। ড্যানিয়েলের চিঠি। অ্যানার চোখে জল।
হলোকাস্টে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া একটা পরিবার এভাবেই নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ টিকিয়ে রেখেছিল। যুদ্ধের ক্ষতর বুকেও টিকে ছিল ভালোবাসা। ইতিহাসে এমন নজির অনন্য।
স্বামী ড্যানিয়েল ইস্রায়েল এভাবেই চিঠি পাঠাবেন তাঁর স্ত্রী অ্যানাকে। হলোকাস্ট-এর কারণে হারানো পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের এই অভিনব পন্থা খুঁজে বের করেছিলেন ড্যানিয়েল। সঙ্গ দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। সাহায্য করেছিলেন দুই অ-ইহুদী কর্মী।
ত্রিয়েস্তের কারাগারে কয়েদিদের জামাকাপড় কাচার জন্য নিযুক্ত ছিলেন দু’জন অ-ইহুদী কর্মী। ঘটনাচক্রে তাঁরা ড্যানিয়েলের দোকানের দুই প্রাক্তন কর্মী। পরিবার-বিচ্ছিন্ন ড্যানিয়েল তখন শেকড় উপড়ে যাওয়ায় ক্ষতবিক্ষত এক মানুষ। পরিবারের খোঁজ পেতে আকুল। ওই দুই অ-ইহুদী কর্মী খুঁজে বের করেছিলেন ড্যানিয়েলের স্ত্রী-পুত্রদের গোপন আস্তানা। হলোকাস্টের ছায়া ঢাকতে পারেনি মানবিকতার আলো। উপায় ছিল না তাঁদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার। তাই এক অভিনব পন্থা খুঁজে বের করেন ড্যানিয়েল।
জেলের মধ্যেই স্ত্রীর উদ্দেশে চিঠি লিখে জামার মধ্যে সেলাই করে পাঠিয়ে দিতেন ওই দুই কর্মীর মাধ্যমে। লন্ড্রীর নাম করে সেই চিঠি পৌঁছে যেত ভালোবাসার শেকড়ের কাছে। ড্যানিয়েল-এর স্ত্রী অ্যানা গোপনেই পড়ত সেইসব চিঠি। কখনো দুই ছেলেকে শোনাত তাদের বাবার কথা। অক্ষরের মায়াজালে জড়িয়ে থাকা পরিবার। ভালোবাসা। খোঁজ। পিতৃস্নেহ। কথার মালায় লেগে থাকত বাবার ভালবাসার ওম। ”কেমন আছে ওরা?”, ”ঠিকমতো খাচ্ছে তো?” ছোট ছোট শব্দ ভরা যত্ন পৌঁছে যেত সন্তানদের কাছে। প্রায় আড়াইশোটি চিঠি।
অ্যানা ও দুই পুত্রের আত্মগোপন করা বাড়ির সকালগুলো ছিল একঘেয়ে। মলিন। ড্যানিয়েলের এক পুত্রের স্মৃতিচারণা ”যেখানে আমরা বন্দি ছিলাম, ছোট জানলা, অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে। জানলা-দরজা সারাদিন বন্ধ। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একেবারে সঞ্চয় করে রাখা হতো। রোজ এক চিলতে আলো প্রবেশ করত বাবার চিঠি দিয়ে। নোংরা জামা-কাপড় না কেচে আগে সেলাই কাটতো। জামার হাতা, কলার থেকে বেরিয়ে আসত আলোর রেখা- বাবার চিঠি।”
ভালোবাসার আরেক নাম অপেক্ষা। অ্যানার প্রত্যুত্তরে অপেক্ষায় থাকতেন ড্যানিয়েল। অ্যানাও চিঠি লিখতো স্বামীকে। একইভাবে পরিষ্কার জামায় ভরে প্রত্যুত্তর পাড়ি দিত ত্রিয়েস্তে কারাগার পর্যন্ত। তবে সব শেষে সেই চিঠির স্থান হতো কোন আস্তাকুঁড়। ড্যানিয়েল গোপনে চিঠি পড়ে সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট করে দিতেন। হলোকাস্টের ভয় মেশানো ভালোবাসা। স্বামীর অনুরোধ স্ত্রীকে “এমন কাগজে লিখবে, যা ভাঁজ করলে শব্দ না করে।” কাগজের শব্দে মৃত্যুর পরোয়ানা দেখেছিলেন ড্যানিয়েল। বিপদের আশঙ্কা। নিজের ও পরিবারের।
অ্যানা শুরু করেছিল বিশেষ কাগজে চিঠি পাঠানো। শব্দহীন শব্দ। পরিবারের প্রতি এমন ভালোবাসাই ছিল ড্যানিয়েলের জেলে-বন্দী জীবনের সম্বল। সন্তানেরা ড্যানিয়েলকে চিনেছিলেন এই চিঠির মাধ্যমেই। তারপর পেরিয়েছে অনেকগুলো বছর।
হলোকাস্টের অন্ধকার ফুঁড়ে আলো দেখা দিয়েছে। মুক্তি পেয়েছিলেন নাকি ড্যানিয়েল। কিন্তু কোথাও তাঁর খোঁজ মেলেনি। অ্যানা ও দুই পুত্রের জীবনেও জানলা খুলেছিল। মুক্তির স্বাদ পেয়েছেন ওঁরা। তবে মুক্ত হয়নি অ্যানার ভালোবাসা। প্রশ্ন আর উত্তর-এর জটিল অংক বুকে নিয়ে পৃথিবী ত্যাগ করেছে সে। কয়েক বছর আগেই ড্যানিয়েলের সব চিঠি প্রকাশ্যে এসেছে। হলোকাস্টের ক্ষতবিক্ষত বর্ণনা সমেত। শহরগুলোর মৃত্যুপুরীতে রূপান্তরিত হওয়ার ছবি। হলোকাস্টের যাত্রা-পথ পেরিয়ে কত ভালোবাসা অন্ধকারে হারিয়ে গেছে তার হিসেব নেই। অত্যাচার, রক্ত, লোভ-লালসার গ্রাস পৃথিবীর বুকে দগদগে ক্ষত তৈরি করেছে। ড্যানিয়েল-এর পুত্রের স্মৃতিচারণায় সেই অন্ধকার অতীতের রক্তাক্ত গন্ধ আজও বর্তমান।