ক্যাফে গদ্যে পিয়ালী চট্টোপাধ্যায়

সম্প্রীতি

অবিভক্ত বঙ্গ দেশের তিতাস নদীর তীরে একটি ছোট গ্রাম দুর্গানগর। সেই দুর্গা নগরের এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে আজকের নারায়ন পুজো। বাইরের সদর দেউড়িতে কলাগাছ আর মঙ্গলঘট লাগানো হয়েছে। ভিতরে অন্দরমহলে নারায়ণ পূজার জোগাড় যন্ত্র চলছে। পুরোহিত মশাই একটি কম্বলের আসনে বসে পুজোর জোগাড়ের তদারকি করছেন। বাড়ির কর্তা মেঘনাথ মুখোপাধ্যায় নারায়ণের ভোগ রান্না করছেন। পরনে গারোদের ধুতি, ধবধবে ফরসা গায়ের শোভা বর্ধন করছে সাদা উপবিত। বাড়ির গিন্নি মা সমস্ত জোগাড়-যন্ত্র করে একবার বললেন, দেখুনতো পুরোহিত মশাই সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা? বাড়ির বাচ্চারা খেলে বেড়াচ্ছে। এখনই পুজো আরম্ভ হবে। শুধু মেঘনাথ বাবুর কনিষ্ঠা কন্যা উর্বশীর মুখটা কিছুটা ম্লান।
খানিকক্ষণ পরে শঙ্খ উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে নারায়ন পুজো আরম্ভ হলো। বাড়ির বড় মেজ সেজ গিন্নি পূজা ঘরে এসে হাতজোড় করে ঠাকুরের সম্মুখে বসলো। সবার অলক্ষ্যে ঊর্বশী আস্তে আস্তে বাড়ির পিছন দিকে খামার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলো। সেখানে তার প্রানের প্রিয় বান্ধবী সায়রা অপেক্ষা করছিল। উর্বশীকে দেখে সায়রা এগিয়ে এলো। বলল, কিরে বন্ধু আজ না তোর বাড়িতে পূজা? তুই অহন আমারে এখানে ডেকে পাঠাইলি কেন ? ঊর্বশী মুখ ভার করে বলল, আমাগো বাড়িতে হগগলে রে প্রসাদ খেইতে ডাকছে আর তোগো ডাকে নাই। আমার খুব দুখ হইছে। সায়রা হো হো করে হেসে উঠে বলল, তাতে কি হইসে? তুই চুপ কইরা আমারে প্রসাদ দিয়া যাইবি অহন। তুই অহন বাড়ি যা। তোরে না দেখলে হককলে রাগ করবো। আমারে একবার ডাক দিস, আমি প্রসাদ খাইয়া যাইবো অহনে। ঊর্বশী বলল, তুই ঠিক কইতে আসিস। সায়রা বলল, হ।
ঊর্বশী বাড়িতে এসে দেখল, বাড়িতে আরতি হচ্ছে ঠাকুরের। তারপর ভোগ হলো,পুষ্পাঞ্জলী হল। উর্বশীর বাবা মেঘনাথ মুখোপাধ্যায় ছোট মেয়ের মুখের মেঘ সরে গিয়েছে দেখে খুশি হলেন। ঊর্বশী পুষ্পাঞ্জলী দিল। পুষ্পাঞ্জলী সারা হলো। হোম যজ্ঞ হলো। এবার ঠাকুর মশাই পুজো শেষ করে সবারির মাথায় শান্তি জল ছিটিয়ে দিলেন। ঊর্বশী নিজের মাথার শান্তিজল তার পরনের কাপড়ের আঁচলে মুছে রাখল।
যথা সময়ে বাড়ির বড় মেজ সেজ গিন্নি, ছোট গিন্নির খোঁজ করলো। ছোট গিন্নি সন্তান সম্ভবা তাই ঠাকুরকে অঞ্জলি দিতে পারবে না পুজোর কোন কাজে লাগবে না। কিন্তু সে ঠাকুরের আশীর্বাদ নিতে পারবে এবং প্রসাদ খেতে পারবে। অনেক কষ্টে ছোট গিন্নি ঠাকুরদালান এর নিচে এসে বসলো। ঠাকুর মশাই তার মাথায় শান্তি জল ছিটিয়ে দিলেন। হোমের ফোঁটা পরিয়ে দিলেন। মাথা নত করে ছোট গিন্নি আশীর্বাদ গ্রহণ করল। ঊর্বশী তার ছোট কাকিমার কাছে গিয়ে গা ঘেসে বসলো। কানে কানে ছোট কাকিমা কে বলল, জানো ছোটমা, হক্কলে রে প্রসাদ খাইতে কইসে অথচ আমার প্রানের বন্ধু সাইরারেই প্রসাদ খাইতে কয় নাই, এডা কেমন কথা হইল?
ছোট কাকিমা উর্বশীকে গলা জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে বললেন, ভুল হইয়া গেছে মা। তুমি ওরে ডেকে আইনে প্রসাদ খাওয়াইও। উর্বশীর মুখে হাসির রেখা দেখা দিল। উর্বশী বলল, আচ্ছা ছোটমা।
পাড়ার সকলে প্রসাদ খেতে এল, দত্তবাড়ী, গুপ্ত বাড়ি, চাটুজ্জে বাড়ি, ব্যানার্জি বাড়ি, সবাই প্রসাদ খেতে এল। এমনকি গফুর চাচা তার পরিবার, খালেদ মিয়া তার পরিবার, রফিকুল ভাই তার পরিবার কেউ বাদ গেলোনা। শুধু বাদ গেল সাইরা দের পরিবার। উর্বশীর ছোট্ট মনে দুঃখের ঢেউ। কেন সায়রা প্রসাদ পাবেনা?
সকলের প্রসাদ খেয়ে, পরিতৃপ্ত হয়ে যে যার বাড়ির পথ ধরল। এরপর পরিবারের সবাই প্রসাদ খেতে বসলো। ছোট কাকিমা খেয়াল করলেন সবাই প্রসাদ খাচ্ছে অথচ ঊর্বশী তার মধ্যে নেই। ছোট কাকিমা তার নিজের সন্তান নন্দ কে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁরে নন্দ ঊর্বশী দিদি গেল কই? তারে দেখতেছি না। নন্দ ঠোট উল্টিয়ে বলল, কি জানি? আমি দেকসি নাকি?
আস্তে আস্তে বাড়িময় সকলে জানল উর্বশী প্রসাদ খায়নি। কোথায় গেল ঊর্বশী? খোঁজ খোঁজ খোঁজ। দেখা গেল ঊর্বশী তার ঠাকুমার ঘরের খাটে বালিশে মুখ গুজে শুয়ে আছে। ঊর্বশী তোমার বাড়ির বড় গিন্নি তাকে খুব বকাবকি করতে লাগলেন। মেঘনাথ বাবু সবাইকে মুখে আঙ্গুল দিয়ে চুপ করতে বলে ঘর থেকে চলে যেতে বললেন। সবাই ঘর থেকে চলে গেলে মেঘনাথ বাবু মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইলেন, কি হয়েছে মা? তুমি কেন ঠাকুরের প্রসাদ কে অমান্য করলে?
ঊর্বশী বলল, বাবা আপনি সাইরারে প্রসাদ খাইতে ডাকেন নাই ক্যান?
মেঘনাথ বাবু বললেন, সে তুমি এখন বুঝবে না মা। তুমি বড় হও। ওর পরিবার যে সমাজচ্যুত। ওর মায়ের চরিত্রের দোষ আছে। তাই ওকে এখানে ডাকা যাবে না। উর্বশীর এক জেদ। সায়রা কে প্রসাদ না দিলে সে কিছুতেই প্রসাদ খাবেনা।
মেঘনাথ বাবু ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। পরিবারের সকলকে এক জায়গায় ডাকলেন। বললেন, সাইরার কি দোষ? সে শিশু। শিশু ভগবানের রূপ। আর যদি সায়রা প্রসাদ না পায় আমার নারায়ন অভক্ত থেকে যাবে। সবাই প্রসাদ পেলেও সায়রা আর তার মা অভুক্ত থাকলে আমার পূজা সম্পন্ন হবে না। বড় গিন্নি বললেন, পাগল হয়েছ?তোমার কথা শুনতে গেলে গোটা গ্রামকে অমান্য করতে হয়। এ কথা শোনা সম্ভব নয়।
মেঘনাথ বাবু বড়ই ধর্ম সংকটে পড়লেন। তিনি ভাবলেন, সায়রার মা স্বামীর মৃত্যুর পর বড়ই অর্থ সংকটে পড়ে, কোন এক সময় বিপথগামীনি হয়েছিল। সমাজ তাকে একঘরে করার পর এখন সে নকশি কাঁথা তৈরি করে তা বিক্রি করে কোনরকমে দিনাতিপাত করে। এখন তো সে কোন খারাপ কাজ করে না। তবে সমাজ কেন তাকে পতিত করে রাখবে?
মেঘনাথ বাবু তখনো অভুক্ত অবস্থায় ছিলেন। তার ব্রতর নিয়ম ছিল সকলকে খাইয়ে তবে তিনি খাবেন। তিনি আস্তে আস্তে বাড়ি থেকে বের হলেন। তারপর শুরু হল তার সমাজ পতিদের দরজায় দরজায় ঘোরা। মকবুল মিয়া, প্রসন্ন চ্যাটার্জী, অমিয় দত্ত,, রমজান শেখ সবাইকে এক জায়গায় ডেকে নিয়ে মেঘনাথ বাবু তার আর্জি পেশ করলেন। প্রথমে সবাই ভীষণ প্রবলভাবে আপত্তি জানালেন। তারপর ওই একরত্তি বাচ্চা সাইরার কথা চিন্তা করে, উর্বশীর সঙ্গে সায়রার অন্তরের ভালোবাসার কথা চিন্তা করে, তাদের বন্ধুত্বের কথা চিন্তা করে, সাইরা এবং তার মাকে মেঘনাথ বাবুর নারায়ণ পূজার প্রসাদ খাওয়ার সম্মতি দান করা হলো।
সেইদিন অপরাহ্ণে, মেঘনাথ বাবুর অন্দরমহলের ঠাকুরদালানে ঊর্বশী, সায়রা এবং তার মা তিনজন মাটিতে পাত পেতে বসে গৃহদেবতা নারায়ণের প্রসাদ গ্রহণ করল। মেঘনাথ বাবু নারায়ণের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন নারায়ণের মুখে এক চিলতে অর্থপূর্ণ হাসি।
সেদিন মেঘনাথ বাবুর অন্দরমহলের ঠাকুরদালান মানবতার এক উজ্জ্বল আলোকে আলোকিত হয়ে উঠল।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।