।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় পায়েল চ্যাটার্জী

পরশপাথর

শালুক। তাকে নাকি ছোটবেলায় শালুক ফুলের মতো দেখতে ছিল। গোলাপি রঙের গাল। পুতুল রানী। বাবা এই নামেই ডাকত। ছোট্ট, মিষ্টি একটা পুতুল হাতে দিয়ে বাবা বলেছিল ‘ ঠিক তোর মত দেখতে’, ঠোঁটগুলো এক্কেবারে তোর মত’। আয়নার সামনে নিজের ঠোঁট দুটোতে হাত বোলাচ্ছিল নিশা। পান খেয়ে রং খয়েরি। কাঠিন্য। শালুক এখন নিশা। এ পাড়ায় যেমনটা হয় আর কি। নাম বদলে যায়। কিন্তু ভেতরটা! বদলানো যায়? তাইতো আজও নিজেকে শালুক নামেই ডাকে নিশা। শালুক থেকে নিশা হয়ে ওঠার পথের গল্পটা ভীষণ ক্লীশে। আর পাঁচ জনের মতই। বাবা ছোট্ট একটা কারখানায় কাজ করতো। দড়ি পাকানোর। তারপর লক আউট। প্রায় এক বছর। মা মাঝে মাঝে শালুক ফুল তুলে আনত পুকুর ঘাট থেকে। রান্না করার জন্য। বাবা কোনদিন খায়নি। শালুক তখন ষোড়শী। কারখানা আর কখনো না খুললেও বাবার হাতে পাকানো দড়িগুলো শেষ পর্যন্ত বাবার গলায় পৌছে শালুকের জীবনকেও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল। মাকেও তারপর খুব বেশিদিন জীবনের ভার বইতে হয়নি। শালুকের পড়াশোনা করার খুব শখ ছিল। মায়ের সৎকার করার সময় বইগুলো সেই আগুনে পুড়িয়ে এসেছিল। একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল ধোঁয়ার দিকে। কুণ্ডলীকৃত ধোঁয়া। মায়ের মৃত দেহের অস্থিভস্ম ও বইগুলোর অবশিষ্টাংশ মিলেমিশে এক। শালুক ওসব বিসর্জন দেয় নি। ও নিজেও জানতনা কেন! কোন অপেক্ষা? কিসের! শোক পালনের সময় পায়নি শালুক। একটা শোক এসে আরেকটাকে মিইয়ে দিয়েছিল।
সন্দীপনদার সঙ্গে সম্পর্কটাও জীবনপথের কোনো এক বাঁকে মিলিয়ে গেল। সম্পর্করা কি এমনই হয়? শুধু যাওয়া-আসা! অলীক স্রোতে ভাসা। স্কুলের গেটের বাইরে আলাপ সন্দীপনদা’র সঙ্গে। ওর সাইকেলে চেপে বাড়ি ফেরা। মাঠের পাশে গোপনে আদর-টাদর। মা চলে যাওয়ার পর কয়েকবার মুখোমুখি হয়েছিল দুজনে। অন্তঃসারশূন্য। মনের বিধ্বস্ত অবস্থায় নতুন কোন দুঃখ বিপর্যস্ত করতে পারেনি শালুককে। তারপর রুমেলাদি’র হাত ধরে এখানে আসা। তবে নিশার চমকের আড়ালে হারিয়ে যায়নি শালুক। চোখের কোণে কালি , যোনিপথে যন্ত্রণা বড় যত্নে ঢেকে রেখেছে। ‘মনটা বেঁধে রাখিস, শরীর ধুয়ে ফেলা যায়, মন নয়’। রুমেলাদি’র এই কথা বেদবাক্যের মত মনে রেখেছে শালুক। শরীরের সঙ্গে মনের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
তবে আজকাল মনের একটা জানালা খুঁজে পেয়েছে শালুক। কিছু একটা যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, বুঝতে পারে ও। কেমন যেন ঘোর লেগে যায়। বই পড়তে পড়তে। শালুকের যোগাযোগের নাম সাহিত্য’। ‘আনন্দমঠ’। প্রথমবার কোন এক ক্লায়েন্টের ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে পেয়েছিল বইটা। অক্ষরদের সঙ্গে শালুকের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে অনেকদিন। প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হয়েছিল। দিপালীদি এখানে সবচেয়ে বেশি পড়াশোনা জানে। তার থেকে সাহায্য নিয়ে শেষ করেছিল বইটা। তারপর থেকেই নেশা। বই পড়া নেশার মত পেয়ে বসেছে ওকে।
প্রথমবার যখন একটা পুরুষালী শরীর নিশার ওপর চেপে বসেছিল, শালুকের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল কোন ভারী ট্রাক যেন ওর বুকের উপর চেপে বসেছে। তবে আজকাল আর অসুবিধা হয় না। নিশার কাজের সময় শালুকের প্রবেশ নিষিদ্ধ ।‌ আজকাল এক নতুন অনুভূতি পেয়ে বসেছে ওকে। একটার পর একটা শরীর যখন মিশে যায় নিশার সঙ্গে, মনে মনে সদ্য পড়া বইয়ের একেকটা পাতা আত্মস্থ করার চেষ্টা করে চলে শালুক। কখনো ‘পথের দাবী’‌ বা ‘চরিত্রহীন’। ‘চোখের বালি’। শম্পা, শতাব্দীরা হাসাহাসি করে আজকাল শালুককে নিয়ে। ‘পুঁইশাকের আবার ক্যাশ মেমো’। ওসব কথা চামড়া ভেদ করে মন অবধি পৌঁছতে পারে না আর। শালুকের এক কাস্টমারের যাতায়াত আছে কলেজ স্ট্রিটে। সেই মাঝে-সাঝে বই এনে দেয়। বদলে খানিকটা সময় বেশি ভোগ করে নেয় ওকে। দেয়া-নেয়া। শালুক এসবে অভ্যস্ত। শরীরের বিনিময়ে দামী রত্ন সংগ্রহ করতে পারছে ও।
রুমেলাদি সেদিন খুব রাগ করেছিল। মারধরও করেছিল শালুককে। কোন এক কাস্টমার ফিরে গেছে। আনস্যাটিসফায়েড। সাহিত্য, উপন্যাসের জগতে বুঁদ হয়ে থাকা বেশ্যার শরীর দিয়ে নাকি যৌন খিদে মেটে না। ‘শালী, ব্যবসা বন্ধ করাবি নাকি’। রুমেলাদির মারের দাগ ছিল শালুকের পিঠে। মন জুড়ে শুধুই সাহিত্যের আঁকিবুকি। এই পাড়ার পাশে একটা ঝিল আছে। মাঝে মাঝেশালুক বইটা নিয়ে বসে তার পাশে। আশেপাশের হাল্কা আলোয় বেশ লাগে কল্পনার জগত বুনতে। যেন বাবুই পাখির বাসা। কাল্পনিক খড়কুটো দিয়ে মনে মনে সাজায় ও । নিশার ঘরে কাস্টমারদের বীর্য, অন্তর্বাস, ঘাম মেশানো গন্ধে কখনো গা গুলিয়ে ওঠে ওর। ঝিলের পাশে সবটুকু উগরে দিয়ে তারপর বই নিয়ে বসে। শালুকের পরশপাথর।
‘তোর মাথা খারাপ হলো নাকি?’। দিপালীদি, রুমেলাদি মারতে আসছিলো শালুককে। ঝিলের পাশে খুবলে খাওয়া শরীর নিয়ে মেয়েটা পড়েছিল। শ্বাস-প্রশ্বাস পড়ছে। ডাক্তার দেখিয়ে শালুক নিজের কাছে নিয়ে এসেছে। কেউ রাজী নয় মেয়েটাকে থাকতে দিতে। মেয়েটার মুখে কোন কথা নেই। নিষ্পলক দৃষ্টি।
মেয়েটার চোখে একটুও জল নেই। জীবনের রুক্ষতার ক্লান্তি। বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত জীবনের সব ভার বহন করছিল ওর দুটো চোখ। শালুক লড়াই করছে সকলের সঙ্গে। মেয়েটাকে নিয়ে। শালুকের কাজে মন নেই।’ফ্রিজিড মাল’। কমপ্লেইন করছে নিশার কাস্টমাররা। ওই মেয়েটার কাছে কয়েকজন লোক এসেছিল। জোর করে। ভাগ্যিস সময়মতো শালুক এসে পড়েছিল। মেয়েটা কাঁদেনি। শুধু অপলক দৃষ্টিতে শালুকের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। শালুক ওদের কাজকে অসম্মান করে না। তবে ইচ্ছার বিরুদ্ধে নয়। মেয়েটার চোখদুটো বড় চেনা। নিশা হয়ে ওঠার আগের শালুকের কি? মেয়েটা এখন একটু প্রকৃতিস্থ। হাতে একটা বই। পড়ছে মনে হয়। নিজের মত থাকুক ও। নিশা হতে হবে না ওকে। বইটা পড়া শেষ করে শালুকের হাতে দিল। চোখে কয়েক ফোঁটা জল। শালুকের হাতে পড়ল। এখন জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে দু’জনে। এবার যাত্রা শুরু হবে। দিকশূন্যপুরের দিকে। তবে তা অন্তঃসারশূন্য নয়। শালুক পণ করেছে মনে মনে। যাওয়ার আগে মায়ের সেই অস্থিভস্মটা ভাসিয়ে দিতে হবে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।