পেশা আর নেশা দুটোই একই; নৃত্য শিল্প।
গুরুমা হিসেবে পেয়েছিলেন মমতাশঙ্করকে। ছোটদের জন্য গড়ে তুলেছেন নৃত্য শিক্ষার একটি স্কুল। ওঁর শিল্পী জীবনের গল্প বলার জন্য এই প্রথম হাতে তুলে নিয়েছেন কলম।
পর্ব – ২
আমি যখন উদয়নে ভর্তি হই তখন আমাদের গ্রুপে ছাত্রীর সংখ্যা ছিল জনা ত্রিশ-বত্রিশ হবে। প্রথমে সপ্তাহে দুদিন ক্লাস ছিল রবিবার ও বুধবার। সময় ছিল বিকেল ৬টা থেকে ৮টা। প্রতিদিনের ক্লাস আমাদের শুরু হতো Exercise এর দ্বারা টানা ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা অবধি বিভিন্ন রকমের (গা,হাত,পা) Exercise হতো। দু-তিন জন আন্টি আমাদের ক্লাস নিতেন এবং সঙ্গে থাকতেন মম মাসীও। এখানে আমার ভীষণ বলতে ইচ্ছে করছে, আমাদের ক্রিয়েটিভ নৃত্য পদ্ধতিটির সম্পর্কে। প্রচলিত যে কোনো একটি গানের সঙ্গে প্রথাগত নৃত্য পদ্ধতির পরিবেশন থেকে উদয়শঙ্কর ক্রিয়েটিভ স্টাইলটা সম্পূর্ণ আলাদা। প্রচলিত যেকোনো মিউজিক অথবা গানের সঙ্গে মাধুর্যপূর্ণ অঙ্গভঙ্গির সামঞ্জস্যের মাধ্যমে এবং নতুন ভাবরসের সমন্বয়ের মাধ্যমে দর্শকমনে চিরতরে জায়গা করে নেওয়াই এই নৃত্য রসের আসল উদ্দেশ্য। এরসঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সাজসজ্জা এবং সঙ্গতিপূর্ণ আলোক সম্পাতের অবদান অনস্বীকার্য। জানেন, অদ্ভুদভাবে আমরা এই নৃত্য রসের মাধুর্যতা লাভ করেছিলাম। মম মাসীর শিক্ষণীয় পদ্ধতির প্রশংসা অনস্বীকার্য। হঠাৎ করে উনি ক্লাস চলাকালীন বলতেন-“ যার যেমন খুশি ইচ্ছা বসে পড়”, আবার কোন সময়ে বলতেন-“ দুটো হাতকে তুলে ডানা ভেবে পাখীর মতো চলতে থাকো কিন্তু কেউ কাউকে স্পর্শ করবে না”। এর সাথে নাচের যে কি সম্পর্ক তখন তা বুঝতাম না। হঠাৎ করে তিনি কোন কারন ছাড়াই সকলকে মাঝে মাঝে বকে উঠতেন এবং লক্ষ্য রাখতেন এর ফলে সকলের Facial (মৌখিক) Expression কেমন হয়। তারপর একদিন ক্লাসে বললেন-“যার যে নামের প্রথম অক্ষর সেটাকে figure এ লিখে দেখাও”। আমার তো নামের প্রথম অক্ষর p দিয়ে শুরু, তা আমি ভেবে রাখলাম p টাকে কতো সুন্দর ভাবে হাত-পা নেড়ে লেখা যায়। এরপর ডাক পড়ার সাথে সাথে আন্টিদেরকে দেখালাম, কিন্তু অবাক হলাম তখনই যখন p অক্ষরটিকে আন্টিরা নানানভাবে যেমন কখন রেগে, কখনো আনন্দে আবার কখনো দুঃখে নানান ভঙ্গিমায় ফুটিয়ে তুলতে লাগলেন। বিশ্বাস করুন তাদের হাতের কোন ভঙ্গিমাই সেই নির্দিষ্ট অক্ষরের বাইরে যেত না। এরপর থেকেই ক্লাসের প্রতি আমার ক্রমশ আগ্রহ, ভালবাসা বাড়তে থাকে। ক্রমশ আমাদের ক্লাসের মেয়ের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এরপরই উদয়নের ক্লাসের সঙ্গেই সামঞ্জস্য রেখে গ্রুপ ভাগ করে ক্লাস শুরু হয় ‘মুরুলিধর গার্লস স্কুল’ এর বিরাট হল ঘরে।
আমি আগেই বলেছি অভিজ্ঞতা সবসময়ে ভালো খারাপ মিশিয়েই হয়, আমার জীবনও তার ব্যাতিক্রম নয়। এখন সেই অভিজ্ঞতাই আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। আমি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অন্যদের কাছে স্নেহধন্য হয়ে উঠেছিলাম। তার কারন ছিল দুটি- প্রথমত,আমার বাসস্থানের দুরত্ব এবং দ্বিতীয়ত আমার মুখাভিনয় আমাকে অন্যদের থেকে একটু আলাদা করেছিল। কিন্তু ক্লাসের কিছু সংখ্যক বন্ধুদের কাছে আমি সমালোচনার পাত্র হয়ে উঠেছিলাম। আমি তাদের মতো ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী না হওয়ায় তথাকথিত ইংলিশ মিডিয়ামের পড়ুয়াদের মতো স্মার্টনেস আমার ছিল না (মাননীয় শ্রোতাগণ বর্তমান পরিস্থিতির দ্বারা আমার অভিজ্ঞতা বিচার করবেন না)। ওই ছোট বয়সে বাস্তবিক আমি এই পরিস্থিতির শিকার হয়ে ছিলাম। ক্লাসের কিছু সংখ্যক মেয়ের কাছে আমি ছিলাম নিতান্তই গেঁয়ো। মাঝে মাঝে তারা আমাকে নিয়ে কোন কারন ছাড়াই হাসাহাসি করত। তখন আমার মন খারাপ হয়ে যেত কিন্তু মম মাসী আর অন্য আন্টিদের স্নেহময় পরশ আমার সেই কষ্টের উপর মলম লাগিয়ে দিত। আবার এরই মধ্যে কিছু সংখ্যক ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের পেয়েছিলাম যারা তথাকথিত ইংলিশ বা বেঙ্গলি মিডিয়ামের ছিল।