সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে পাপিয়া ভট্টাচার্য (পর্ব – ৮)

আলোধুলোর দিন
বছরের কোন মাসটা যে উৎসবের ছিল না আমাদের, মনে পড়ে না ! আশ্বিন সংক্রান্তি থেকে আকাশপ্রদীপ জ্বলবে ,তার প্রস্তুতিও বেশ হইচই করে। কাপাস তুলোর পলতে, শনের দড়ি, একটা বেতের চুবড়ির মধ্যে বসানো প্রদীপ,লম্বা বাঁশ, আকাশপ্রদীপ প্রস্তুতির সব সরঞ্জাম নিয়ে গুছিয়ে বসত বাবা।এটা আন, ওটা কই করে আমাদেরও সংগী করে রাখত।আর সন্ধ্যের মুখে সেই প্রদীপ বাঁশের মাথায় বসে ওই উঁচুতে উঠে জ্বলত টিমটিম করে।
কেন এটা জ্বালানো হয় বল্ তো ? বাবা প্রতিবার প্রদীপ আকাশে তুলে জিগ্যেস করত। উত্তরও মুখস্থ ছিল, আমাদের পূর্বপুরুষদের আলো দেখানোর জন্যে। তাঁরা এই আলোর পথ চিনে সত্যিই নেমে আসেন কিনা,এসব প্রশ্ন কখনও ওই ছোট মাথায় আসেনি। বরং উঠোনে বা চাতালে দাঁড়িয়ে খুব মুগ্ধ হয়ে দেখতাম আকাশভর্তি ওই গগনের দীপগুলোর সঙ্গে আলোর সংগে কেমন মিশে আছে এই মিটমিট করে জ্বলা আলোটিও, আলাদা করা যাচ্ছে না আর ।
ঋতুরা তখন মোটামুটি নিয়ম মেনে আসা যাওয়া করত। ফলে হেমন্তের শুরু মানেই হিম পড়তে শুরু করেছে তখন, খোলা জায়গায় একটু দাঁড়ালেই মাথা ভিজে যায়, বাবার বকুনি খেয়ে বাইরে থাকা যেত না।আলোটা কতক্ষণ জেগে থাকে,দেখা হয়নি কোনোদিন ।
আস্তে আস্তে কবে যে আকাশ থেকে নেমে এসে উঠোনের তুলসীমঞ্চে বসল সে প্রদীপ, ঠিক মনে নেই। খুব সকাল সকাল আমারও তো বিয়ে হয়ে গেল তারপর।
দীপাবলির আগের দিন ভূতচতুর্দশী, চোদ্দ প্রদীপ জ্বলবে। সেই প্রদীপ বাড়িতে মাটি এনে গড়া হত।মায়ের একদম ডানহাত যাকে বলে, সেই গীতার পিসির সংগে মাও গড়ত মাটির প্রদীপ, সব বাড়িতেই তাই হত। ছবিটি আমার চোখের ভেতর রয়ে গেছে। বাবার একটা আগভা ক্যামেরা ছিল, ছবি তোলার নেশাও ছিল ,অথচ অমূল্য এই ছবিগুলি কেন যে নেই !
ভূতচতুর্দশীর সেই পূর্বপুরুষদের আসার পথে আলো ধরা প্রদীপ গুলোতে আমি আবার একটু আতপচাল বাটার কারিকুরি করতাম। অন্ধকার নামার মুখে মা বাড়ির বিশেষ বিশেষ জায়গায় সেগুলি বসিয়ে দিত। ওইদিন আমাদের পিসির মাথা খারাপ হয়ে থাকত বাগান থেকে পুকুর পাড়,ঝোপঝাড় সব ছুটে ছুটে। উঠোনে পা ছড়িয়ে ক্লান্ত মানুষ টি তুলে আনা শাক মিলিয়ে ভাগ করে করে রাখছে, সাদা আটহাতি থানের শীত গ্রীষ্মে ব্লাউজহীন পিসি। মা রান্নাঘর থেকে উদ্বিগ্ন মুখে জিগ্যেস করছে, চোদ্দ রকম হল তো?
লাউ ,কুমড়ো, পুঁই ,কলমি, সুজনি, সজনে,সব আলাদা করতে করতে খেই হারিয়ে পিসি বকত, থামো দিকি বউদিদি, গোল করো নি। তারপর লালনটে,সাদা নটে, মেথি,হিংচে, সরষে, পলতা, বেতো শাক করেও চোদ্দ দফা মেলাতে না পেরে ডাকত, মায়ীরে, আয় না একবার, করকম হল দ্যাখতো!
আর খাবার সময় নিজে দাঁড়িয়ে থাকত, খা,খেয়ে ফ্যাল।ফেলতে নাই মাগো, অনত্থ হয়। শরীল ঠান্ডা হবে,অসুখ বিসুখ করবে নি।
দীপাবলি তো চিরদিনই আলোয় আলো।মশলা কিনে তুবড়ি তৈরি করত বাবা নিজে।শব্দ বাজি থাকতই না।খুব জোর কালি পটকা। চড়বড় করে মৃদু আওয়াজে ফাটত তারা।এছাড়া রঙ মশাল, চরকি,তুবড়ি, সাপবাজি।আর তুমুল হই চই করে ফুলঝুরি ছোঁড়ার প্রতিযোগিতা হত। ফুলঝুরির লম্বা শিক বেঁকিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে ছুঁড়ে কে কতবার সামনের ওই কৃষ্ণচূড়া আর বাবলা গাছের ডালে ঝোলাতে পারে। আলোর ফুলকি ছড়াতে ছড়াতে তারা কোনটা গাছের ডালে ঝুলে ঝিলমিল করত,কোনটা সোজা পুকুরের জলে। সেটা নিয়ে একদম বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর মত উত্তেজিত থাকতাম আমরা।বাবাই প্রথম হত প্রতিবার, বোনও পেছনেই থাকত।
চারদিকে প্রদীপ, মোমবাতি, টুনি বালবের আলো, ঢাক, একসংগে অনেক বক্স মাইকের একটায় মান্নার ‘দীপ ছিল শিখা ছিল ‘র সঙ্গে অন্যটায় ‘পান্নালালের কিছুই তো থাকবে না গো মা, কেবলমাত্র কথা রবে’ জড়াজড়ি হয়ে যাচ্ছে তখন। চাতালে ঘুরন্ত চরকি বাজির সংগে লাফিয়ে ঘুরতে ঘুরতেও আমার চোখ চলে যেত কামিনী গাছের নিচে কলার খোলায় শুয়ে থাকা গোবর আর ফেলে দেওয়া চুলে হত কুচ্ছিত করে গড়া অলক্ষ্মীর দিকে, যাকে একটু আগেই পুজো করে আমরা কুলো বাজিয়ে, পাটকাঠির ধোঁয়া দিয়ে বিদায় করেছি ঘর থেকে। মাথার কাছে একটা মাটির প্রদীপ জ্বেলে রাখা ছিল, নিভে গেছে এখন। ভরা উৎসবের মধ্যে অলক্ষ্মী নামের মেয়েটি শিশিরে ভিজছে একা একা! আর তাঁরই বোন লক্ষ্মী ,মায়ের হাতে গড়া ধবধবে সাদা পিটুলিতে সুসজ্জিত লক্ষ্মী কুবের কেমন সযত্নে ঘরের সিংহাসনে বসা।খুব মন খারাপ করত ।
উৎসব তো একের পর এক চলছেই,এদিকে নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বার্ষিক পরীক্ষা। দুমাস ধরে বই মুখের সামনে ধরে শুধু ফাঁকিবাজি, পড়াশুনা ওই নমো নমো করে। মানে আমার আর বোনের আর কি! যদিও আমার দাদা নিজের প্রথম স্থানটির ধারে কাছে আসতে দিত না কাউকে, তার সবই নিয়মমতো ।
মিলি,মানে আমার বোনের দল সেসময় বছর দশ এগারো বয়স হয়েছে কি হয়নি, নিজেদের বন্ধু গ্রুপ করে কালীপুজো শুরু করল। দলেরই এক বাচ্চা প্রতিমা গড়ত,আর সদ্য পৈতে হওয়া এক বাচ্চা দাদাকে ধরে আনত পুজোয়।সে বেচারির উচ্চারণে একটু ট এর দোষ ছিল। মন্ত্রও ওংবিট্টু ,ওং বিট্টুর বাইরে জানত না তেমন কিছু ,বারবার একই কথা শুনে কে বোধহয় তার ভুল ধরেছিল ,সে ক্ষেপে উঠে বলল , আমি আড় টোটের পুটো কোনোডিন কড়ব নি।টোড়া অন্য পুটুত ডিয়ে পুটো কড়বি।
বয়সের দোষে হাসাহাসি করলেও সেই সরল ছেলেটিকে আমরা কিন্তু ভালোই বাসতাম। বছর দুয়েকের পর মিলিদের উৎসাহও এসব থেকে সরে গেছল।পুরুতের দরকার হয়নি আর ।
দীপাবলির পর দুদিন খুব মন দিয়ে পড়তে শুরু না করতেই রাসফুল এসে গেল বাড়িতে বাড়িতে। শোলা, রঙীন কাগজ, আঠা,চুমকির মত সামান্য জিনিস দিয়ে একেবারেই ঘরের মেয়ে বউদের হাতে বানানো অসামান্য শিল্পকর্ম।দামও সামান্য। রাসমঞ্চ, ঠাকুরের সিংহাসন, তুলসীতলা, বাড়ির সামনে সব সুন্দর করে সাজানো হত। আর কী সব সামান্যতেই ঝলমল করত জায়গাগুলো! শুধু এসবের প্রস্তুতি থেকেই বুঝে যেতাম আসছে আর একটা উৎসব ।মানে আর একটা সন্ধ্যে পড়াশোনা থেকে ছুটি ,আর একটা দিন বাড়িতে খুব ব্যস্ততা, আবার ঠাকুরের কাঁসা পেতল পাথরের বাসন বেরোনো,পঞ্চপ্রদীপে তেল সলতে। বাবার সংগে রাসের মেলায় যেতাম কোনো কোনো বছর নিমতলা,নবগ্রাম। মেলায় ওইসময় খুব পুতুল নাচ হত। সারা গায়ে সুতো জড়ানো পুতুলেরা অদৃশ্য হাতের টানে নেচে নেচে ওদের গল্প বলত। সে কী মুগ্ধতা আমাদের !
সেসব অবশ্য হত কালেভদ্রে , আমাদের আসল রাস উৎসব শুরু হত সকাল থেকে। সেই পূর্ণিমার দিন ছিল আমার দাদার জন্মদিন। সদ্য জগদ্ধাত্রী পুজো গেছে ,সেদিন আবার আমার জন্মদিন। বেশ বড় করে পালন হত দিনটা। সমস্যা একটাই ছিল, মায়ের বিয়ের তত্ত্বে পাওয়া বিশাল রূপোর থালাটি।বন্ধুদের হাতে গাঁথা বাগানের ফুলের মালাটি পরে আমাদের লাল দুয়োরে লাইন দিয়ে বসা পাড়ার ছেলেমেয়েদের মাঝে দাদা লজ্জিত হাসিমুখে বসত নতুন আসনে ,সামনে ওই ঝকঝকে থালার চারদিক ঘিরে ওই সেটেরই খান বড় বড় ছয় বাটি। আমার ভাগে ওরই একটি ছোট থালা,আর বাটিই বা অত পাবে কোথায় মা !
আমি জেদ ধরে বসতাম আমিও বড় থালায় খাব। মা অপ্রস্তুত ,ওই সাইজের থালা তো একখানিই।শেষে রাত্রে আমি ওতে খাব,দাদা ছোট থালায় ,এই প্রতিশ্রুতিতে আবার সব পাশাপাশি।
সন্ধ্যের পর আর এসব মনে থাকে! তখন বাড়ির পাশে আলো দিয়ে সাজানো মন্দির, রাধেশ্যাম দাসের…রাধু ঢাকির মলিন পালকে ছাওয়া ঢাকে কাঠি ,সঙ্গে তার ছোট্ট ছেলেটির কাঁসির সংগত। আর মন্দিরের বাইরে হ্যাজাকের আলো যতদূর পৌঁছত, তার ঠিক পরেই হিম পড়া মাঠে বন্ধুরা মিলে বিশাল হুটোপাটি। মাঝে মাঝে শাঁখ উলুধ্বনি শুরু হলে পালা করে এক একজন ছুটে গিয়ে মন্দিরের ঘন্টার দড়ি টেনে ঢং ঢং ঢং ঢং…. ।
রাধুর ছেলের হাতের কাঁসিটি বাবার বাজনার সংগে নির্ভুল সঙ্গত দিত ,কিন্তু তার সতৃষ্ণ চোখ থাকত আমাদের দিকে। আমরা কোনোদিন ভাবিই নি তাকে ওই খেলার আসর থেকে আমাদের মধ্যে ডেকে নেবার কথা।