সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে পাপিয়া ভট্টাচার্য্য (পর্ব – ৬)

আলোধুলোর দিন 

আমাদের এই ঘাটাল মহকুমার মারাত্মক বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের ভয়াবহ অবস্থার কথা প্রায় সকলেরই জানা। বর্ষা বেশ বাড়াবাড়ি রকমের হলেই জানতাম সে আসছে আর সারা অঞ্চল আতংকে থমথমে হয়ে উঠত। কারণ আমাদের সারা বছরের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি নির্ধারিত হত তার আসা যাওয়ার ওপর। বন্যা যে বছর বিধ্বংসী হয়ে আসতো, সেবছর কী ভয়ংকর দুর্গতির মধ্যে যে কাটাতে হত মানুষকে, ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ কল্পনাও পারবে না। প্রতিবারই সবাই আশা আশঙ্কা নিয়ে অপেক্ষায় থাকত যে এবার বোধহয় অত বাড়বে না, প্রত্যেক বাড়ির সামনে লম্বা লম্বা বাঁশের কঞ্চি পুঁতে রাখা হত জল কতটা বাড়ছে দেখতে। চাল ডাল মজুত করা ,জিনিসপত্র সরানো, এসবের মধ্যে একদম সমুদ্রের মত গর্জন করতে করতে তীব্র জলস্রোত ঢুকে আসত গ্রামের পর গ্রাম ভাসিয়ে। আর কী আশ্চর্য , এই সারা গ্রাম তলিয়ে যাওয়ার কাজটা সে করত অন্ধকার রাত্রিতে।ফলে মানুষ আরো দিশেহারা হয়ে পড়ত আতঙ্কে । সব বাড়ি থেকে তখন পরপর শাঁখ বেজে যাচ্ছে, তাতে বিপদ অবশ্য কিছু কমতে দেখিনি। এই শাঁখ আবার কোনো কোনো গভীর রাত্রে বেজে উঠত যেদিন নৌকা নিয়ে লুঠ করতে বেরোত ডাকাতরা । জলের তুমুল স্রোতের কারণে পাশের বাড়ি যাওয়া আসারও উপায় নেই কারো, এই সুযোগে প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই ওরা লুঠপাঠে নামত ।
এক বছরের কথা মনে আছে, ওইরকম দূরে এক বাড়িতে গভীর রাতে কান্নার রোল উঠল, সংগে সংগে শাঁখ বেজে উঠল এদিক ওদিক থেকে, কেউ কিছুই করতে পারবে না জেনেও। ভয়ে আমরা মা ঠাকুমাকে জড়িয়ে বসে আছি, একটু পরেই ছপ ছপ করে অনেকগুলো বৈঠা টানার শব্দ শোনা গেল আমাদের চাতাল ঘেঁসে। বন্ধ দরজা ভাঙতে আর কতক্ষণ, আর ভাঙলে কিছুই বাঁচানো যাবে না জেনেও বাবা আর আশ্রিত কজন লাঠি ,দরজার হুড়কো যে যা পেল নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল দরজার পাশে হাঁটু জলে। নৌকা একবার থামল, তারপর আবার ঝপ ঝপ শব্দ। অসম্ভব ভয়ে সেদিন আমাদের বাড়িতে শাঁখ বাজানোর শক্তিও ছিল না কারো।
ঘাটাল মহকুমার প্রায় অধিকাংশই ততক্ষণে জলের তলায়। আমাদের বাড়িটি উঁচু জায়গায় হওয়ার কারণে গোটা গ্রামের একতলা ডুবে যাওয়ার পর জল ঢুকত এ বাড়িতে ,তার আগেই ডুবন্ত বাড়িগুলো থেকে বন্যার তীব্র স্রোত লাঠি হাতে ঠেলে ঠেলে অনেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। মাটির বাড়িগুলো সবই প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। কাঁদতে কাঁদতে এক কাপড়ে আসা মানুষগুলির শুকনো জামা কাপড়ের ব্যবস্থা করত বাবা। মা হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে বেঞ্চের ওপর তোলা উনুনে সবার জন্যে খিচুড়ি রাঁধত। সেই বয়সে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং পরবর্তী আর্থিক সমস্যার কথা না বুঝে এত লোকজন বাড়িতে ,স্কুলও জলের তলায়,ফলে অনির্দিষ্টকাল ছুটি, বাড়িতেও পড়াশোনার বালাই নেই, এসব নিয়ে প্রথম প্রথম আমরা ছোটরা একটু লাফালাফি করে ফেলতাম অবশ্য ,যদিও উদ্বেগে অশান্তিতে অস্থির বাবা মার সামনে সেভাব গোপন করে দুঃখী মুখে থাকতে শিখে গিয়েছিলাম তখনই ।
পরদিন থেকে খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে থাকত ঘাটাল। সাংবাদিকরা অবশ্য উত্তাল জল স্রোতের মধ্যে নৌকায় চড়ে বেশি ভেতরে আসার সাহস পেত না ,ফলে কিছু নির্দিষ্ট জায়গার ছবিই থাকত বছর বছর পাতা জুড়ে। পরে কাগজ হাতে পেলে আমরা হাসাহাসি করতাম, দেখেছ, এবারও সেই জিতেন ডাক্তারের চেম্বারের সামনে, এবারও সেই এক নম্বর চাতাল ইত্যাদি…. ছবিই দিয়েছে। ফলে ভেতরের প্রকৃত দুরবস্থার কথা কেউ জানতই না প্রায়। টিভি আসেনি তখনও, রেডিও ছাড়া বাইরের জগতের খবর পাবার উপায় ছিল না বলে রেডিও খোলা থাকত সারাক্ষণ। আর সব খবরের শেষে ‘ ডিভিসি আরো এতো হাজার কিউসেক জল ছাড়ছে’ শুনে অসহায় রাগে বাবা চিৎকার করত, ওটাকে বন্ধ কর, জলে ফেলে দে ,একটা ভালো খবর দিতে পারে না ।
দিনের আলোয় বড়রা জলের মধ্যে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে তুমুল উত্তেজনায় সরকারের মুন্ডুপাত করত।দীর্ঘকাল ধরে প্রশাসনের লাল ফাঁসে আটকে থাকা ঘাটালের মাস্টার প্ল্যান কার্যকরী হলে এ অবস্থা হত না আজ, এইসব চেঁচামেচি চলত খুব। যে প্ল্যানের কথা বাবারাও শুনে এসেছে আজীবন ,আমরাও শুনতে শুনতে বড় হয়েছি।এক সরকার গিয়ে অন্য সরকার এসেছে প্রতিশ্রুতি আর প্রত্যাশা জাগিয়ে, আমরা যে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরেই ।
কখনও সখনও ডুবন্ত গ্রামগুলির ওপর খুব নিচু হয়ে উড়ে যেত হেলিকপ্টার, আমরা ভেতরের লোক গুলোকে স্পষ্ট হাত নাড়তে দেখতাম। তারা হাত বাড়িয়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে যেত চিঁড়েগুড়ের প্যাকেট,অগাধ জলের স্রোতে ভাসা অবস্থায় সাঁতরে ধরত কিছু মানুষ। আমার খুবই ইচ্ছে করত ওইরকম সাঁতার দিয়ে আমিও দেখি প্যাকেটে কী আছে ! বাপরে,বাবা তাহলে মেরে ঠ্যাং ভেংগে দেবে। বাবা মেজদাদুরাই তখন পঞ্চায়েতের মাথা, কিন্তু সেসময় আমাদেরও ভীষণ প্রয়োজনীয় একটা ত্রিপল অবধি ঘরে ঢুকতে পেতো না। মধ্যবিত্তদের জন্যে ওসব নয় ,কোন সাহায্য,কোন ত্রাণই না ,সে তারা যত অসুবিধেয় কষ্টে থাকুক, কঠোর ভাবে এসব মেনে চলত বাবারা ।
শীলাবতীর পক্ষপাত বরাবর ওপারের ওপর,ওপার চট করে ভাসত না। অপেক্ষাকৃত নিরাপদ সেই পাড়ের বাঁধ জলের ক্রমাগত ভয়ংকর চাপে ভেঙ্গে গেলে আমরা এপারের মানুষেরা নিষ্ঠুরের মত আনন্দ পেতাম এই ভেবে যে যাক ,আমরা তো বেঁচে গেলাম এবারের মত। তার আগে অবধি ক্রমাগত আকাশ ঝলসে ওঠা গনগনে লাল রঙা বিদ্যুতের সঙ্গে একটানা বৃষ্টি, বন্যার গা শিউরে ওঠা শব্দ, অনির্দিষ্টকালের জন্যে বিদ্যুৎহীন টিমটিমে হ্যারিকেনের আলোয় আরো বিপদের আশংকায় ঘন হয়ে সবাই একস্ংগে বসে কাটাতাম সারারাত। সাপের ভয়ও ছিল ,জল ঢোকার সঙ্গে অনেক সাপ ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে খাটের পায়া ,দরজার পাল্লা জড়িয়ে ধরে উঠত। বিষধর সাপও থাকত তাদের মধ্যে কিন্তু স্রোতে ভেসে এসে একদম নির্জীব। বাবা মারতে দিত না ,বলত, ওরা তো আধমরা হয়েই প্রাণের ভয়ে শুকনো জায়গার খোঁজে এসেছে ,আর মারিস না। লাঠিতে জড়িয়ে ফের তাদের স্রোতের মুখে ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না যদিও। সাপের কামড়ে মৃত্যু আখছার ঘটত এসময়। চারদিকে জলের মধ্যে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না, বিনা চিকিৎসায় ছটফটিয়ে মারা যেত কতজন।
জল একটু কমলে আর বাবারা সব ব্যস্ত হয়ে ত্রাণে বেরিয়ে গেলে আমাদের কাজের ছেলেটি তার বাড়ির ডোঙা নিয়ে আসত,আমরা ওতে চড়ে ঘুরব বলে। বাবা নেই তো আর ভয় কিসের, মায়ের মত নেওয়া তো এক মুহূর্তের ব্যাপার।
‘ যাসনি রে, ডিঙি উলটে সর্বনাশ হবে….জানি না বাবা কি করে এমন অবাধ্য হলি তোরা,’ এই পর্যন্ত মায়ের বকুনির দৌড়।
বন্যা আস্তে আস্তে কমলেও প্রধান সড়কপথ ডুবে থাকত কখনও একমাস বা তারও বেশি। অগত্যা বড় হয়ে কলেজে পড়ার সময় নৌকায় করে যাতায়াত ছাড়া উপায় ছিল না। তবে ওইভাবে যেতে খুব ভাল লাগত আমার। বিশেষ করে কলেজ থেকে ফেরার সময় সন্ধ্যে হয়ে আসত প্রায়। চারদিকে অথৈ জল ছাড়া অনেক দূরে দূরে দু একটা ডুবে থাকা বাড়ি শুধু, যে বাড়ি ফেলে সবাই কোথাও চলে গেছে, হু হু করে বইছে ঠান্ডা হাওয়া , শুধু দাঁড়ের শব্দ ছাড়া যাত্রীরা সবাই চুপচাপ,বেশি নড়াচড়া করলে বা পাশ দিয়ে একটা বড় নৌকা গেলে আমাদের নৌকা ভয়ংকর দুলত। যতই সাঁতার জানি, এখানে ডুবলে বাঁচার আশা কম,তবু কে জানে কেন এই যাত্রাপথটা খুব ভালো লাগত আমার।
বন্যা কমলে কদিন আগেই দেখা আদিগন্ত মাঠ জুড়ে লকলকিয়ে ওঠা সবুজ কচি ধানের চারাগুলির পচাগলা অবস্থা দেখে জল আসত চোখে। কি বিপুল ক্ষতি! মাঠের পর মাঠ ধান নষ্ট, বিশাল বিশাল পুকুর ভর্তি মাছ ভেসে গিয়ে একদম সর্বস্বান্ত অবস্থা তখন। তার ওপর চারদিক থেকে সব পচে উঠে দুর্ঘন্ধ ,ডুবে থাকা টিউবয়েলের জল, পুকুরের জল সবই ব্যবহারের অযোগ্য..অসুখ বিসুখ ঘরে ঘরে। বিষাক্ত সব দিন !
তো সেবার সমস্ত উৎসব গুলি সেরকমই ম্লান হত।পঞ্চমী অবধি পুজোর জামাকাপড় হবে কিনা সংশয় ছিল।আমার স্কুল শিক্ষক বাবার বেতন আসারও সেসময় ঠিক ঠিকানা ছিল না কোনও ।
কলকাতা থেকে মাসীমণি আর বড়মামা জামা কাপড় নিয়ে পৌঁছলে হাসি ফুটত মুখে ।
যে বছর বন্যা কম রুদ্রানী রূপ ধরত, সারা শীত জুড়ে মেলা যাত্রা থিয়েটার । যাত্রার তখন রমরমা অবস্থা। নট্ট কোম্পানি থেকে মোহন অপেরা ,বীণাপাণি অপেরা সব আসত। থাকার ব্যবস্থা বাড়ির সামনের স্কুলে।স্কুলের বাথরুমের অবস্থা তত ভালো নয় বলে নায়িকা সহ দুচারজন আসত আমাদের বাড়িতে । আসলে আমাদের বাড়িটি বাবা মার বদান্যতায় একটি ধর্মশালা ছিল। তো জলজ্যান্ত যাত্রার নায়িকাকে সামনে দেখে আমরা তো কৃতার্থ। মা নিশ্বাস ফেলত যাত্রাদলের মোটাসোটা মেয়েগুলিকে দেখে।আমি তখন ক্লাস নাইন টেন এবং বেশ রোগা।শাড়িপরা স্কুলফেরত আমাকে দেখে কোন একটা দলের মনে নেই, ম্যানেজার প্রস্তাব দিল , ‘এ মেয়ে আমাদের দলে এলে এক বছরের মধ্যেই নায়িকা হতে পারবে, আর দেখবেন মেয়ের চেহারাও ফিরে যাবে কেমন !
বাবা ছিল চূড়ান্ত রসিক। বলল, প্রথমেই নায়িকা ? বাহ বাহ ! তার চেয়েও বড় কথা ,মোটাও হয়ে যাবে বলছেন ! বেশ বেশ। তা দেবেন টেবেন কেমন ?
ম্যানেজার মহোৎসাহে এ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছিল, মাঝ থেকে বাবার বন্ধুরা হো হো করে হেসে উঠতেই ভদ্রলোকের মুখখানা হয়েছিল দেখার মতো।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।