রন্ধনশালার ইতিহাসে পিয়াংকী (পর্ব – ১)

পাকপ্রণালী

“ম্যৎস্যাস্তস্য সমাচক্ষু: ক্রুদ্ধস্তাগ্নিরব্রবীৎ
ভক্ষ্যা বৈ বিবিধৈ র্ভাবৈর্ভবিষ্যথ শরীরিণাম”

…চরকসংহিতা-র একটি বিখ্যাত শ্লোকবাক্য দিয়ে সূচনা হল এই যাত্রাপথের। অগ্নিসংযোগ সর্বপ্রথম, তবেই রন্ধনশালার উৎপত্তি। অন্যথা পাকচক্রের কোনও নামই থাকত না। আহার অর্থে খাদ্যগ্রহনের এই যে প্রক্রিয়া, বিবর্তন বলে এ একদিনে তো আসেনি। সৃষ্টির আদিতে যদি তাকানো যায় দেখা যাবে মানুষ ফলমূল খেয়েই জীবন ধারণ করত। জৈবিকক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য খিদেবোধ এবং তা নিবারণ করার এই যে একটি সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি তাতে ধীরে ধীরে যুক্ত হয় অগ্নিকূল। যজ্ঞের আগুনে ঘি-এর মতো অতি সন্তর্পণে আসতে থাকে আগুনের ব্যবহার। আজ ‘পাকপ্রণালী’র সূচনা পর্ব লিখতে বসে তাই সামান্যতম চেষ্টা করছি ছুঁয়ে যেতে সেই ইতিহাস যা আমাদের কৃষ্টির আদিতে জড়িত।

ওপরে যে শ্লোকটি উল্লেখ করেছি তার সরলীকরণ করলে দাঁড়ায়, মৎসকূল ভবিষ্যৎ-এ বিভিন্ন প্রকারে শরীরিগণের ভক্ষ্য হইবে অর্থাৎ যে মৎস্য প্রাণিসম্পদ হিসেবে বঙ্গের মানুষের কাছে এত নিকটতম তা একদিন মানুষই ভক্ষণ করবে। অগ্নিদেবতার এহেন ক্রোধ আমরা লক্ষ করি মহাভারতের আদিগল্পে। এখন প্রশ্ন হল এই অগ্নি কথা কেন আনলাম লেখায়? এর স্পষ্ট উত্তর হল আগুনই সেই যুগ সেই অনুঘটক যার সাহায্য আজকের খাদ্য বা খাদ্যশস্য রান্নায় পরিণত হয়েছে। আগুনের ব্যবহার শিখেই প্রথম মানুষ পুড়িয়ে খেতে শিখেছে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে রন্ধন বলে বোঝাতে গেলে তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে আগুনের ব্যবহার। ভারতবর্ষের রান্নার গন্ধ রঙ ঘনত্ব রূপ, এই সবকিছু যদি বিচার করি, যদি খুঁজতে চেষ্টা করি তার ভ্যারাইটি তাহলে মূলত চার ধরন পাব। পোড়া সেঁকা ভাজা সেদ্ধ। আগুন আবিস্কারের ইতিহাস তাই শুধুমাত্র যে ভারতের রান্নাকে পরিপাটিত্য দিয়েছে তা নয় এক আমূল পরিবর্তন এনেছে সমগ্র বিশ্বের খাদ্যকোষে।

আগুনের পরেই কথা বলতে বলতে চলে যাব কৃষির কাছে। কেন কৃষি? রান্নার সাথে এর কিসের যোগসূত্র? আছে। নব্যপ্রস্তরযুগীয় সময়কালে আনুমানিক খ্রীস্টপূর্ব ৯০০০ বছর আগে ভারতে সূচনা হয়েছিল কৃষিকাজের। এ’কথা বলতে বলতেই মনে পড়ে যাচ্ছে মাতৃসাধক রামপ্রসাদ-এর সেই বিখ্যাত গান,”মনরে কৃষিকাজ জানো না/এমন মানব জমিন রইল পতিত /আবাদ করলে ফলত সোনা”। সত্যিই কৃষি জানলে কত সহজেই মাঠভর্তি ফসল উৎপাদন করা যায় তা আর আমরা বুঝলাম কই।যাই হোক প্রসঙ্গে আসি, কৃষিকর্ম শেখার ফলস্বরূপ বাংলার রান্নাঘর পেয়েছে ফসল শস্য। এই বাংলার প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিবর্তন, পর্যাপ্ত বৃষ্টি পরিমিত উত্তাপ, সূর্যের নিরক্ষীয় অবস্থানের আলো…ফলনে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে এরা। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ফুলেফেঁপে উঠেছে এভাবেই।

ঐতিহাসিক নীহার রঞ্জন রায় তাঁর বিখ্যাত “বাঙালির ইতিহাস ” গ্রন্থে লিখেছেন, “এই কৃষি আমাদের প্রধান ধন সম্বল, এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যপাদ পর্যন্ত যে সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারা আমাদের দেশে চলিয়া আসিয়াছে তাহাকে যদি একান্তভাবে কৃষিসভ্যতা ও সংস্কৃতি আখ্যা দেওয়া যায় তাহা হইলে খুব অন্যায় হয় না “

এই যে খাদ্যশস্য উৎপাদন তারপর আহরণ এবং পরবর্তী পর্যায়ে আহার — এই বিশাল কর্মকাণ্ডের পর আসে রন্ধন।আসে রন্ধনশালা। আসে রন্ধনপদ্ধতি বা রন্ধন সম্পর্কিত পাত্র, যন্ত্র আরও অনেককিছুই। ধীরে ধীরে বলব সেসব।

বাংলার অতিপ্রাচীন রান্নায় ঝাল ঝোল অম্বলের সাথে ছেঁচকি চচ্চড়ি ঘন্ট ডালনা ভাঁপা কালিয়া বা এসেছে যত বড়া দোলমা বা পোড়ার কথা — হলফ করে বলতে পারি এত রকমারি আয়োজন হয়তো আর কোথাও নেই। শুধু বিশ্ব বলি কেন একটু চোখ খুলে তাকিয়ে যদি দেখেন ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যের রান্নাঘর, দেখবেন সেই সমস্ত’র তুলনায় মশলায় গন্ধে ফোড়নে বাংলা এক্ষেত্রেও এগিয়ে অনেক। যেখানে অন্যান্য রাজ্যগুলোয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেথি কারিপাতা বা কাঁচা ডাল রাইসর্ষে ফোড়ন দিয়ে প্রায়সেদ্ধ পদ্ধতিই অবলম্বন করা হয় বেশি সেখানে বাংলার প্রায় প্রতি ঘরেই মধ্যাহ্ন ভোজনের আয়োজনে থাকে হরেক মশলার রংদার ব্যবহার। পঞ্চব্যঞ্জনে সুসজ্জিত কাঁসার থালায় রবিবারের ছুটির দুপুর না হলে কবেই বা জমেছে বাঙালির ছেলেমেয়ের হাসিমুখ।

একটানে মোহগ্রস্ত দিনলিপির মতো যেন লিখে গেলাম কতকিছু। রান্না শুধুমাত্র একটি পদ্ধতি তো নয় এর সাথে চলার পথে জুড়ে যায় হাজারো টুকিটাকি। সবজি কাটার পদ্ধতি, তরকারি অনুযায়ী কাটা-সবজির সাইজ, যে যন্ত্রে রান্না হবে তার পরিমাপ (সে উনুন হোক বা গ্যাসওভেন বা মাইক্রোওভেন মেশিন), খাবার তৈরির পর তা সাজিয়ে রাখার জন্য উপযুক্ত পাত্র(এই পাত্রের আবার হরেক নাম গামলা, সসপ্যান, জামবাটি, হাঁড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি)। জুড়ে যায় বিভিন্ন ঘরোয়া টীকাটিপ্পনীও যা এক রাঁধুনিকে সাহায্য করে আরও পারফেকশনিস্ট হয়ে উঠতে। এ ধারাবাহিকে ইতিহাস বলার সাথে সাথে আমি খুব চেষ্টা করব সেসব বিষয়গুলোকেও ছুঁয়ে যেতে যা সরাসরি না হলেও রন্ধনশিল্পের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত

আমার মত যারা রান্না করতে, সাজাতে আর বেড়ে খাওয়াতে পছন্দ করি তাদের কাছে গ্রহনকারীর আঙুল চেটে খাওয়া টক্ টক্ শব্দ আর তৃপ্তির ঢেঁকুর হয়ত সর্বাধিক প্রিয়মুহূর্ত। ‘রান্নাবান্না’ শব্দবন্ধটাই এক্ষেত্রে একটি রিলেশনের মতো,আর কে কবে রিলেশনকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা রেখেছে বলুন তো!

৭ ই শ্রাবণ, ১৪৩০
সোমবার, সকাল ১১:০০

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।