T3 || সৌরভ সন্ধ্যায় || লিখেছেন পিয়াংকী

মাননীয় আপনাকেই বলছি
“একটা বাস এল ফাঁকা ফাঁকা
মৃত্যু কি আজ কাওকে পায়নি
আমাকে একাই যেতে হবে… ” সৌরভ মুখার্জি। যার নামেই লেগে থাকে গন্ধ।অদ্ভুত গন্ধ।গন্ধরাজ লেবুর গন্ধ, তুলসীপাতার গন্ধ অক্সিজেনের গন্ধ, সবচেয়ে বড় কথা হল আপনার নামে লেগে আছে মানুষের গন্ধ। আপনি তো এই বিয়াল্লিশেই জীবনকে অনেক দেখেছেন, বুঝেছেন।অনেকভাবে কবিতায় লেখায় সেসব বুঝিয়েওছেন।
আমি আপনাকে দেখেছি বহুবার। রাস্তায়ঘাটে কবিতাসভায় নন্দনে, লিটল ম্যাগাজিন মেলায়। আপনি তো খুব প্রাণবন্ত মশাই। কিভাবে ছুটেছেন, হাঁটতে দেখেছি কম। এই লাস্ট ছোটাটায় দম শেষ হয়ে গেল? কতবার আপনাকে বলেছে সবাই একটু শান্ত হতে। ঠিকঠাক নিশ্বাসটুকুও নেবার সময় পাননি। আকড়ার বাড়ি, ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজার ভিডিও, নাচ, পুজোর আয়োজন সবকিছুতে ছিল অদম্য উৎসাহ।
আচ্ছা মাননীয়, আপনি কি টের পেতেন চলে যাবার? সেভাবে প্রচুর কথা তো বলা হয়নি আপনার সাথে। তবু আপনার ওই দীঘল দুটো চোখের টান বড় বেশি মায়ার ছিল হয়তো। আজ তিনদিন কেটে গেল।আপনি তো মশাই আরও দীর্ঘ হচ্ছেন।দীর্ঘতর হচ্ছে আপনার ফেসবুক প্রোফাইল।
দামাল ছেলে। অকাট্য যুক্তি। দুটো হাত দিয়ে আগলে রাখতে চেয়েছিলেন নন্দনকে। আপনি আমার কেও না দাদা না ভাই না বন্ধু না নিদেনপক্ষে পাড়ার চেনা পড়শীও না। তবু কেন আপনার ওপারে চলে যাবার খবরে কাঁদলাম বলতে পারেন? কেন আপনি চলে যাবার পরই আরও অনেক অনেক বেশি করে আপনার কবিতা পড়তে বসছি?
আপনার ধর্মকুকুরকে আজ হঠাৎ দেবতা মনে হচ্ছে কেন? উত্তর দিন মাননীয়। আপনি তো এতদিন এতজনের উত্তর নিয়েছেন, আজ আমরা কয়েক হাজার একসাথে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছি। উত্তর দিন। কেন নিশ্বাস নিতে পারলেন না? কেন এভাবে বিট্রে
করলেন?
মনে পড়ে সেদিনটার কথা। এই তো মাস তিনেক আগে, লিটিল ম্যাগ মেলা। জীবনানন্দ সভাঘর। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমির কবিতা উৎসব। অনেকের কবিতার সাথে আপনারও দুটো কবিতা শোনার সৌভাগ্য হল।অবশ্য তার আগেও শুনেছিলাম কয়েকবার। ভেবেছিলাম একদিন আপনাকে সাহস করে বলবই যে “আপনি দারুণ পাঠ করেন”। নাহ সেই সাহসটুকু অর্জন করতে হল না আমায়। আপনি বড্ড ফাঁকিবাজ। চুপচাপ মায়ের কোলে আদর খেতে চলে গেলেন।
আচ্ছা ” ঘর” কবিতায় কেন লিখেছিলেন “পরেরদিন ভোরবেলা শুনলাম
আমাদের পাড়ার কিছু ফেরিওয়ালা নিরুদ্দেশ
তবে গতকাল কাদের সঙ্গে বাড়ি ফিরলাম?”
প্রশ্ন করে চলে গেলেন। এতো প্রশ্ন কেন করতেন?এত স্বচ্ছআলো! সবাই আপনার শরীরেই রাস্তা তৈরি করত কেন? কেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে অন্তরালে থেকে লড়তেন?
আপনার “ঘাসের আড্ডা”য় যারা আড্ডা দেবে আপনি কী একটিবার তাদের নথিতে নিজের নাম নথিভুক্ত করবেন না? জীবিত বা মৃত, সত্ত্বা তো অস্তিত্বে অক্ষুণ্ন থাকে তাই না মাননীয়?
এই তো সেদিন সাতই মার্চ,আপনার ডাকে পৌঁছে গেলাম নন্দন। “রাস্তা কারো একার নয়” শীর্ষক মঞ্চে।পাঠ করলাম। আপনি হাসলেন। চোখাচোখি হল।ভাবলাম বলি “কেমন আছেন? ” কিন্তু বলা হল না। আসলে আপনার মতো উড়ন্ত ঘোড়াকে কি কেউ কখনো খারাপ থাকতে দেখেছে? সেবার লিটিল ম্যাগ চত্ত্বরে কবিতা পাঠ শুনে বেরিয়েছি। আপনাকে ঘিরে প্রচুর লোক। মনে মনে আমি ভাবছি, লোকটা সেলিব্রিটি নাকি ঠিক এমন সময় আমার কবিতা সহকর্মী আমার ভাই অরিজিত আপনাকে বলল “সৌরভদা এই যে আমার দিদিয়া, এখন যত মহিলারা লিখছে তাদের মধ্যে… ” ওর মুখের কথাটা থামিয়ে দিয়ে প্রায় কেড়ে নিয়ে আপনি বলে উঠেছিলেন , “ওওওওও ও তো পিয়াংকী, ওকে তুই কি চেনাবি অরিজিত, ওর নামটাই তো আনকমন ওকে আমি চিনি পড়েছিও,ভাল লেখে খুব”
সেদিনও ইচ্ছে ছিল আপনাকে জিজ্ঞেস করি, “কেমন আছেন?” কিন্তু সেবারও হল না। আসলে হয় না। ঘোড়াকে কে কবে জিজ্ঞেস করতে পেরেছে যে সে কবে থামবে