সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে পিয়াংকী (সাবেক কথা – ২)

সাবেক কথা
ঘুলঘুলি
ঘুলঘুলি, এক নির্বাক ভরণপোষণ। মিহি যাতায়াত। মিইয়ে যাওয়া এই সনাতনী শব্দের ভেতর অসংখ্য ফাঁকফোকর, সেখানে লুকিয়ে আছে বিগত জন্ম আর যাবতীয় ঋণমুকুবের দস্তাবেজ। রাজত্ব ফেলে রেখে রাজা এসেছে, সাথে তার পোষা পাখি, খড়কুটো জমিয়ে রেখে তারা চলে গেছে নির্দিষ্ট সময় অন্তর। ঘুলঘুলি বাড়েনি কমেনি
টালির ছাউনি,নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসারের ছিটকিনি আর ওই একটা দুটো সাধের ঘুলঘুলি। চুরাশি লক্ষ জন্মের পর এইটুকুই সঞ্চয়ের খতিয়ান।
শৈশবে ঘুলঘুলি দেখিয়ে আমার ঠাকুমা বলতেন,”আয় আয় চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা,চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা”। বড় হলাম সামান্য, ওই একই ঘুলঘুলি দেখিয়ে ঠাকুমা আবার ভয় দেখাতে শুরু করলেন,বললেন,”ওই ছেমড়ি, মা উনানডা নিভায়া আইসার আগে তাড়াতাড়ি খায়া ল’ ঘুলঘুলির ভিত্যর দিয়া দৈত্য আইবো নে”। শৈশবের বেভুল কথোপকথনের একটা অধ্যায় শেষ হল।আবারও খানিক লম্বা হলাম, মহল্লায় মহল্লায় ঢাকঢোল পিটিয়ে বলে বেড়ালাম, ” আমার নিজস্ব একটা ঘুলঘুলি আছে, তামাটে রঙের শরীর হলুদ হলুদ চোখ”। কিশোরী শ্যামলা মেয়ে তখন জানে ঘুলঘুলি মানে ফেলে আসা জীবনের দু’চারটে বোবা ছিদ্র বৈ কিচ্ছু নয়।
বকুলফুল খোঁপায় গুঁজে ভরসন্ধ্যায় ধূপধূনো দিতে দিতে মা বলল,” তোমার বয়স হচ্ছে, দেখছো না ঘুলঘুলিটা কেমন পুরুষ হয়ে উঠছে রোজ”। আমি সেদিন থেকে বনলতা অথবা অহল্যা। একথালা ভাতের মতো পুষ্টিকর নারী। রোজ দুপুর নিভলেই তাকিয়ে থাকি জানালা দিয়ে দরজা দিয়ে বাইরে,চৌকাঠ থেকে অনেক দূরে। ভাগ্যিস ঘুলঘুলির দুটো চোখ নেই, সে আমায় দেখে না। পুরুষ হয়ে ওঠার আড়ালে তার গায়ে থরে থরে জমছে সূর্য পোড়া অবসন্ন বিকেল। ছিদ্রগুলোর ওপর সমুদ্রস্নান ছিটিয়ে দিয়ে সরে যায় যারা তাদের বিচ্ছিন্নতাকামী বলার সাহসটুকু অর্জন করতে গিয়েই আরও একফুট উচ্চতা বাড়ে, এক গোছা খোলা চুলের ফাঁকে ফাঁকে জোনাকি সাজিয়ে বসে পসরা। হাটে-বাজারে নক্ষত্র কিনতে আসে লোকজন।
ঘুলঘুলিতে পাখি ডাকে চিঁচিঁ। ঘেঁটুফুল শিকড় বিছিয়ে রেখে নেমে আসে আমার সাদা বিছানায়। ভেন্টিলেটর বলে হাঁকডাক করে আধভাঙ্গা খিড়কি দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করি,,”আপনিই কি এত এত রাত জেগে থেকেছেন আমার শামুকভাঙা বিছানায়? হে প্রেমিক, আপনাকে কি আর একটি বার ঘুলঘুলি বলে ডাকতে পারি?”
রাত ১ঃ৫১
২২শে জৈষ্ঠ্য ১৪২৮
ইছাপুর