সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে নীলম সামন্ত (পর্ব – ৬)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (বিচিত্রবীর্য)
কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধ আসলে পরাশরের প্রপৌত্রদের যুদ্ধ।
পরাশর মুনি সম্পর্কে এই বাক্যে শেষ করেছিলাম। তারপর থেকেই মাথায় যে চরিত্র ঘুরছে সে আর কেউ না বিচিত্রবীর্য। খুব স্বাভাবিক নয় কি? বিচিত্রবীর্যেই শেষ হয় শান্তনু-সত্যবতীর ব্লাডলাইন৷ এরপর থেকে পরাশরমুনি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের হাত ধরে বংশ বিস্তার করে চলেন৷ অতয়েব বিচিত্রবীর্য সম্পর্কে একটু আধটু চর্চা না হলে কি চলে?
মাঝের দু’টো সপ্তাহ লেখার কাজ কিছুই করিনি, আসলে কলকাতা কাছে না হওয়ার কারণে চাইলেই প্রয়োজনীয় বইপত্র হাতে পাব এমনটা হয় না৷ কিন্তু লিখতে যখন বসেছি তখন পিছিয়ে যাওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না৷ এই দু’ সপ্তাহ কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তক মেলা চলার দরুন আদা জল খেয়ে কাজে লেগে পড়লাম।
খুব একটা বেশি তথ্য কিংবা রাজত্বকাল সম্পর্কে জানতে পেরেছি সেরকমটা নয়। আসলে বিচিত্রবীর্যর রাজত্বকালের সময়সীমা খুবই কম। শান্তনু যখন মারা যান তখন চিত্রাঙ্গদ নাবালক হলেও সিংহাসনে নিয়ম সাপেক্ষে তাকেই বসতে হয়েছিল। তার অহংকার তাকে পতনের মুখে নিয়ে যায় যে গল্প আমরা প্রত্যেকেই জানি। আবার চিত্রাঙ্গদের মৃত্যুর পরে বিচিত্রবীর্য যখন সিংহাসনে বসছেন তখন তিনিও কম বয়সী। তাকে সামনে রেখে রাজত্ব চালাচ্ছেন ভীষ্ম। তারপর সাবালক হলে তাকে বিয়ে দেওয়া হয় এবং বিয়ের পর তিনি সস্ত্রীক কানন ভ্রমনে চলে যান। নিজে হাতে সাম্রাজ্য সামলানো কি তিনি সেটা জানলেনই না।
মহাভারতে বিচিত্রবীর্যের বিবাহ যেন এক ধুন্ধুমার ঘটনা।
রাজ্যাভিষেক খুব কম বয়সে হওয়ার কারণে বিচিত্রবীর্য পৈত্রিক সিংহাসনে বসেও আগাগোড়া ভীষ্মের প্রতি যথাযোগ্য সম্মান দেখিয়ে তাঁর আদেশ অনুযায়ী রাজকার্য পরিচালনা করতেন। ভীষ্ম প্রথম থেকেই দায়িত্ববান ও ধর্মপরায়ণ মানুষ তাই বিচিত্রবীর্যের প্রতি তাঁর পরম যত্নের কোন ত্রুটি ছিল না। কিছু বছর পর যখন বিচিত্রবীর্য তরুণ বয়স্ক হলেন ভীষ্ম মনে মনে ভাবলেন ভাইয়ের বিয়ে দেওয়া দরকার। মা সত্যবতীর সাথে পরামর্শ করলেন এবং এও জানিয়েছিলেন তার কাছে খবর আছে কাশীপতির তিন কন্যা স্বয়ংবরা হবেন৷ সত্যবতীর অনুমতি নিয়ে রথ সমেত তিনি চললেন বারানসি নগরী। স্বয়ংবর সভায় সাধারণত বিবাহযোগ্যা রাজা ও রাজপুত্ররা উপস্থিত থাকেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে হস্তিনাপুর রাজার প্রতিনিধিত্ব করলেন মহামতি ভীষ্ম। একবার ভেবে দেখুন বড় দাদা মেয়ে নিয়ে আসবেন আর ভাই কিছু না দেখেই কোন মত প্রকাশ না করেই বিয়ে করে নেবে। এমন আনুগত্য যেন আশ্চর্য করে তোলে। ২০২৪ সালে দাঁড়িয়ে অবাকও হয়। তবে সে’যুগে জ্যেষ্ঠ দাদা যে পিতা সমান ছিল তা ঠাকুমা দিদিমার কাছে গল্পে শুনলেও নানান উপন্যাস সহ মহাকাব্যদ্বয় পড়ে অনেকটাই বুঝেছি।
স্বয়ংবর সভায় গিয়ে কনিষ্ঠ ভাইয়ের জন্য কাশীপতির তিন কন্যাকে চেয়ে তিনি কি বলেছিলেন জানেন? হ্যাঁ মহাপতী ভীষ্ম একেবারেই অপেক্ষা করেননি তিন রাজকন্যা কাকে বরমালা দেবেন সরাসরি নিজের বক্তব্য জানিয়ে তুলে এনেছিলেন। উফ কি অসম্ভব রোমহষর্ক দৃশ্য! একশ’দুইতম অধ্যায়ের সেই দৃশ্যই যেন চোখের সামনেই ভেসে উঠল, মানসচক্ষে দেখলাম বিশাল একখানা দরবার, দুই দিকে আজকালের বিয়ের কনে বসার চেয়ারের মতো অনেক চেয়ার পাতা যেখানে বসে আছেন চারদিক থেকে আসা রাজা ও রাজপুত্ররা। মাঝখানে লাল কার্পেটের রাস্তা। লম্বা লম্বা ঝালর দেওয়া, সুসজ্জিত সেই সভায় আলো করে আছেন তিন কন্যা। অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকা। একে একে রাজাদের নামধাম ঘোষণা শুরু হয়েছে মাঝখান থেকে ভীষ্ম উঠে দাঁড়িয়ে যতখানি নমনীয় ভাবে তিন কন্যাকে রথে নিয়ে গিয়ে বসালেন ততধিক গম্ভীর ও জোর গলায় ঘোষণা করলেন “কেহ কন্যাকে বিচিত্র বস্ত্রালঙ্কারে আচ্ছাদিত করিয়া ধনদানপূর্ব্বক গুণবান পাত্রীর সমর্পণ করেন; কেহ কেহ গোমিথুন প্রদানপূর্বক কন্যাকে পাত্রসাৎ করেন; কেহ বা প্রতিজ্ঞাত ধনদানপুরঃসর কন্যা সম্প্রদান করেন; কেহ বলপূর্ব্বক বিবাহ করিয়া থাকেন; কেহ বা প্রণয়-সম্ভাষণে রমণীর মনোরঞ্জনপূর্ব্বক তদীয় পাণিপীড়ন করেন; কেহ প্রমত্তা নারীর পাণিগ্রহণ করেন; কেহ বা আর্ষবিধির অনুসারে দারপরিগ্রহ করিয়া থাকেন; কেহ কেহ কন্যার পিতামাতাদিগকে বিপুল অর্থদানপূর্ব্বক বিবাহ করেন। ধর্ম্মশাস্ত্রবিদ পন্ডিতেরা এই অষ্টবিধ বিবাহবিধি নির্দিষ্ট করিয়াছেন। স্বয়ংবরও উত্তম বিবাহমধ্যে পরিগণিত। রাজারা স্বয়ংবর বিবাহকেই অধিক প্রশংসা করেন। পরাক্রম প্রদর্শনপূর্ব্বক অপহৃত কন্যার পানিগ্রহীতাকে ধর্ম্মবাদীরা ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছেন; অতএব হে মহীপালগন! আমি বলপূর্বক ইহাদিগকে হরণ করি; তোমরা যুদ্ধ অথবা অন্য যে-কোন উপায় দ্বারা পার, ইহা দিকের উদ্ধারসাধনে যত্ন করো আমি যুদ্ধার্থে প্রস্তুত আছি।” – টিভিতে দেখলে এই বক্তব্যের পর ঝনঝন করে যুদ্ধের দামামা বাজার মতো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজত আর ভীষ্ম রথে চেপে দ্রুতবেগে সভা ছেড়ে চলে যেতেন৷ ঠিক বলছি তো? মনের কল্পনায় এসব নেই শুধু সাদা পোশাক পরা এক বীর রথে করে চলে গেলেন এইটুকুই দেখলাম৷ সত্যিই মন কী আশ্চর্য এক বস্তু। দৃশ্যকল্প রচনা করল সুন্দরীর তিন মহিলার রূপ হুবহু না আঁকতে পারলেও নায়িকাসুলভ শরীর আঁকায় খামতি রাখেনি৷ পরে অবশ্য অন্য কাজ যখন করি তখন নিজের এই সমস্ত কান্ড মনে করে একাই হেসে যাই৷ তবে একটা কথা না বললেই নয় ভীষ্ম সত্যিই বীর ও সাহসীও ছিলেন৷ কেন বলুনতো?
আরেহ! বিয়ের কনে নিয়ে পালান কি চাট্টিখানি কথা নাকি? তাও আবার অতোগুলো রাজারাজড়ার মাঝখান থেকে! যেখানে প্রত্যেকেই যথাযোগ্য যোগ্যতাসম্পন্ন। এ হেন পরিস্থিতিতে অত্যন্ত রেগে রাজার সুদর্শনসাজ ও রাজবেশ খুলে ফেলে যুদ্ধের জন্য সাথে সাথেই তৈরি হয়ে গেলেন৷ রাগ হবেনাই বা কেন, তিন তিনটে পাত্রী সব কটাই হাতছাড়া! এ কি নিজেদের কাছেই কম লজ্জার ছিল নাকি ক্ষমতার কাছে খুব গৌরবের ঘটনা? কোনটাই নয়। তাই তাঁরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত রেগে গিয়ে আক্রমণ করেছিলেন। একা ভীষ্মের সাথে অনেকগুলো বিপক্ষ। প্রায় দশহাজার বাণ তাঁর দিকে ধেয়ে এসেছিল। তিনি যে একাই একশ তার প্রমান দিয়েছিলেন প্রতিটা বাণ খণ্ডন করে। দেবতা ও অসুরদের যুদ্ধের মতো এই যুদ্ধও ক্রমশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল কারণ শরনিক্ষপের কোন কমতি ছিল না৷ আত্মরক্ষা সহ বিপক্ষকে হারিয়ে দিতে অনেকের মাথা কাটা পড়েছিল ধনুক, ধ্বজাগ্র বর্ম ইত্যাদির ধ্বংসও করেছিলেন৷ শেষে এমন যোদ্ধার নৈপুণ্য দেখে শত্রুপক্ষও ভুরি ভুরি ধন্যবাদ দিতে কোন কার্পণ্য করেননি৷
তিন বিবাহযোগ্যা পাত্রী উঠিয়ে নিয়ে আসার পথে এই যুদ্ধই কিন্তু শেষ যুদ্ধ নয়৷ কিভাবে হবে? অম্বার মানস-পতি শাল্বরাজ হাওয়া খেয়ে কাটিয়ে দেবে এমন ভীতু বা কাপুরুষ তো তিনি নন৷ কোন রাজ্য জয়ের ব্যপার হলে তাও সমঝোতায় আসার কথা ভাবত হয়তো কিন্তু যেখানে নিজের প্রেমী অর্থাৎ মানস-পত্নীর প্রসঙ্গ সেখানে হাত-পা গুটিয়ে না থেকে বীরত্ব দেখাবে সেটাই তো স্বাভাবিক। তাই না? তিনিও সেরকমই এসেছিলেন লড়াই করতে৷ ক্রোধ, হিংসা সমস্ত মাথায় নিয়ে ভীষ্মকে বলেছিলেন “তিষ্ঠ তিষ্ঠ”। নাহ তিষ্ঠয়নি মহামতি ভীষ্ম, নির্ভয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে সম্মুখ সমর হয়েছিলেন৷ দুই বীরের তর্জনগর্জন সমেত তীর ছোঁড়াছুড়ি। প্রথমে ভীষ্ম পিছিয়ে পড়লেও তাঁর কানের ভেতর শাল্বরাজের ” তিষ্ঠ তিষ্ঠ” অনুরণন ঘটে আর তিনিও ঘুরে দাঁড়ান। শাল্বরাজের সারথির মস্তকচ্ছেদন সমেত সমস্ত ঘোড়াবাহিনী বিনষ্ট করে দিয়েছিলেন। যাকে বলা যায় ঢাল তলোয়ার সবই ধ্বংস করে দেওয়া। এমত অবস্থায় শাল্বরাজ হলেন নিধিরাম সর্দার। যুদ্ধ আর কিভাবে সম্ভব? অতয়েব পরাজয় স্বীকার করে ফিরে গেছিলেন নিজের রাজধানীতে। এরপর হস্তিনাপুর ফেরার পথে আর সেইভাবে কোন যুদ্ধ বা বাধার উৎপত্তি হয়নি।
দেখলেন তো, বিচিত্রবীর্যের বিবাহ অথচ এতোক্ষণ তাঁর কোন ছায়াই দেখতে পেলাম না৷ একেই বোধহয় বলে ছাতার তলায় আরামের বাস৷ দিব্য হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসে রইলেন আর তাঁর সুখসাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থাপনার জন্য কত যুদ্ধই না হয়ে গেল৷ মনে প্রশ্ন আসে এ কেমন রাজা? তিনি কি আদৌ যোগ্য রাজা? নাকি রাজা নামের কাঠপুতুল? হয়তো তাই৷ পিতা শান্তনুর মতো ন্যায় নিষ্ঠা ও ধর্মানুসারে রাজ্য শাসন করলেও ভীষ্মের পরামর্শ ছাড়া কিংবা আদেশ ছাড়া তিনি হয়তো কিছুই করতেন না। মাতা সত্যবতিরও এমনই আদেশ ছিল। কারণ সত্যবতী জানতেন ভীষ্ম হস্তিনাপুরকে যতটা ভালোবাসতেন ততটাই তাঁর কৌরববংশ এবং প্রজাদের প্রতি নিষ্ঠা ছিল। এতটা সুচিন্তক বোধহয় বিচিত্রবীর্য সেই বয়সে হয়ে উঠতে পারতেন না।
তবে রাজ্যশাসনের ক্ষেত্রে বিচিত্রবীর্যের সেরকম ব্যাখ্যা কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন দেননি। তাই ওই অংশটুকু আমাদের কাছে অধরাই থেকে গেছে।
মনে প্রশ্ন আসছে না তিন কন্যা তো হস্তিনাপুর এলো কিন্তু বিবাহ হল কি? না তিনজনের সাথে বিবাহ হয়নি। কাশিপতীর জ্যেষ্ঠ কন্যা অম্বা বিবাহের আয়োজন দেখে বলেছিলেন তাঁর শাল্বরাজের প্রতি মানস-বিবাহের কথা এবং তাঁর পিতার সম্মতির কথা। এ কথা শুনে ভীষ্ম অম্বাকে কোনভাবেই জোর করেননি উল্টে তার ইচ্ছে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি দেন। বিবাহ সম্পন্ন হয় ও অম্বালিকার সাথে। বর্ণনা অনুযায়ী বুঝেছি অম্বিকা এবং অম্বালিকা উভয়ই রূপবতী ছিলেন। সাথে পতিপরায়ণাও।আর সেই সুখ ভোগ করার উদ্দেশ্যে বিবাহের পরবর্তী সাত বছর বিহার করে কাটিয়ে দিলেন। এই সময় বিচিত্রবীর্য যক্ষারোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। অনেক চিকিৎসা করা সত্ত্বেও তাঁকে আর বাঁচানো যায়নি। তাই বলা যায় সময়ের আগেই সূর্য ঢলে পড়েছিল।
এত কম বয়সে যার মৃত্যু ঘটে সে কিভাবেই বা বীর রাজা হয়ে উঠতে পারে? বীরত্ব দেখানোর সময় বা সুযোগ কোনটাই তিনি পাননি। তবে বিচিত্রবীর্যকে আমার বিচিত্রই মনে হয়েছে। বিচিত্র না হলে কি আর রাজসিংহাসন ছেড়ে নববিবাহিতা স্ত্রীদের নিয়ে বিহার করে সাত বছর কাটিয়ে দেন? রাজ্যের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকলে এই সাত বছরটা হয়তো কমে দু’বছর কিংবা তিন বছর হতে পারত। সেক্ষেত্রে তিনি যক্ষা রোগে আক্রান্ত হতেন না, আর দীর্ঘজীবন সহ রাজ্যশাসন করবারও সুযোগ পেতেন। কিন্তু ওই যে ছাতা আছে মানে বড় দাদা ভীষ্ম আছেন তিনিই তো সব সামলে দিচ্ছেন তাই বেশি দায়িত্ববোধ দেখিয়ে নিজেকে কষ্ট দেবার দরকারই বা কি? সুবিধা পেলে কে না লুটে খায়। আবার দেখুন বিচিত্রবীর্য যদি এভাবে মারা নাই যেতেন মানে নিঃসন্তান অবস্থায় না মারা যেতেন তবে হস্তিনাপুর রাজদরবারে বেদব্যাসের সসম্মানে আগমন কিভাবে ঘটত? সবকিছুই কেমন সাজানো ইটের মত তাই না? মহাভারত পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে এই ঘটনাটা ছাড়া বোধহয় ওই ঘটনাটা ঘটতো না। মানে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সাথে ভীষণ রকম নির্ভরশীল ঘটনা।