সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ২০)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ বর্বরিক
বারবারিক সিদ্ধিমাতার উপাসনা শুরু করেন। সে এক কঠোর উপাসনা। সিদ্ধিমাতা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে তিনটি বাণ বর হিসেবে প্রদান করেন। অদ্ভুত শক্তিশালী এই তিনটি বাণ। প্রথম বাণ যুদ্ধের সমস্ত শত্রুদের চিহ্নিত করে। দ্বিতীয় বাণ চিহ্নিত করে তাদের যাদের ক্ষতি হবে না। তৃতীয় বাণ সমস্ত চিহ্নিত শত্রুর বিনাশ করে। কি শক্তিশালী বরের কারণে বর্বরিক অজেয় হয়ে উঠলেন। তবে বর্বরিক জানতেন বা বলা যায় চেয়েছিলেন তাকে একমাত্র শ্রীকৃষ্ণের হত্যা করুক। আর সেই কারণেই এমন শক্তিশালী অজেয় হয়ে ওঠার পরিকল্পনা।
ঠিক এই সময়টাতেই হস্তিনাপুরে কুরুক্ষেত্রের আয়োজন চলছিল। বর্বরিক রওনা দিলেন কুরুক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে। রক্তের টান। পান্ডবরাও যথারীতি অত্যন্ত খুশি। এমন শক্তিশালী অজেয় যোদ্ধা তাদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করবেন। কম পাওনা? তবে বর্বরিক শুধুমাত্র তার তিনটি বর নিয়েই আসছিলেন না, সাথে করে এনেছিলেন তার গুরুকে দেওয়া প্রতিজ্ঞা। তিনি তার গরুর কাছে প্রতীক্ষাবদ্ধ ছিলেন যে এত শক্তি নিয়ে তিনি কেবলমাত্র দুর্বলদের পক্ষ নিয়েই যুদ্ধ করবেন। তবে সকলে জানার পর বেশ খুশি ছিলেন কারণ ওর পক্ষে যারা মহারথি ছিলেন তাদের তুলনায় পাণ্ডবরা নিতান্তই দুর্বল। তবে শ্রীকৃষ্ণের মাথায় অন্য চিন্তা ধরছিল তিনি বুঝেছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে দুর্বল এবং সবল একটি আপেক্ষিক মুহূর্ত। সেই কারণে তো শ্রীকৃষ্ণ বর্বরিককে পরীক্ষা করার জন্য ব্রাহ্মণ বেশে প্রশ্ন করেছিলেন তুমি তো নিজেই এসেছ সাথে মাত্র তিনটে বাণ নিয়ে তোমার সৈন্যসামন্তরা কোথায়? বর্বরিক উত্তর দিয়েছিলেন তার আসলে কোন সৈন্যসামন্তের দরকার নেই। এই তিনটে পাওনি যথেষ্ট শত্রুপক্ষকে এক মিনিটে বিনাশ করার জন্য। বিস্তারিতভাবে শ্রীকৃষ্ণ জানতে চাইলে তিনি দেখান যে একটি বাণ তাঁর সমস্ত শত্রু কে চিহ্নিত করতে পারে , আরেকটি বাণের দ্বারা তিনি যাদের মারতে চান না তাদের চিহ্নিত করে দেবেন। তৃতীয় ও সর্বশক্তিশালী বাণ যেটি এক নিমিষে সমস্ত চিহ্নিত শত্রুকে মেরে ফেলবে। শ্রীকৃষ্ণ পরীক্ষা করতে চাইলেন, বর্বরিককে আদেশ দিলেন যে অশত্থ গাছের তলায় তারা দাঁড়িয়ে আছেন তার সমস্ত পাতা কে এক তীরে গেঁথে দিক। পরীক্ষা নিখুঁত ভাবে নেওয়ার জন্যই শ্রীকৃষ্ণ একটি অশ্বত্থ গাছের পাতাকে নিজের পায়ের তলায় লুকিয়ে রাখেন। বর্বরিক সেসব না জেনেই তীর ছোড়েন। সমস্ত গাছের পাতা কি বেঁধে তীরটি পায়ের উপর ঘুরঘুর করতে থাকে। বর্বরিক শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে বলেন তিনি যেন পা তুলে নেন কারন ঐ পায়ের নিচে একটি পাতা রয়েছে। না যদি না তোলেন তাহলে তীরটি পা ভেদ করে পাতা খুঁজে বার করবে৷ শ্রীকৃষ্ণ পা সরিয়ে নেন। এবং বর্বরিক তৃতীয় বাণ নিক্ষেপ করেন। এক নিমিষে সমস্ত পাতা ছেদ করে ফেলল। এই পরীক্ষার পরে শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পারলেন, বরবটির এক বর্ণও মিথ্যে বলেনি। কৌরব এবং পাণ্ডবদের মহারথীদের তিনি এই শেষ করে ফেলতে পারবেন। কেউ যদি লুকিয়ে পড়ে তাকে খুঁজে ঠিক বিদ্ধ করবে। কিন্তু এইভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিমুহূর্তেই দুর্বল দল পরিবর্তন হতে পারে। সেক্ষেত্রে বর্বরিক একবার কৌরবদের হয়ে লড়াই করবে একবার পান্ডবদের, এবং সমস্ত মহারথীরাই বীর গতি পাবেন আর কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বীর যোদ্ধা হয়ে উঠবে ভীমের নাতি বর্বরিক। কিন্তু এভাবে কিভাবে যুদ্ধ সম্ভব। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম স্থাপন। যুদ্ধক্ষেত্রে যদি সকলেই মারা যায় তাহলে কাকে দিয়ে ধর্মের স্থাপন হবে? অগত্যা শ্রীকৃষ্ণ ঠিক করলেন বর্বরীকের মুন্ডুপাত ঘটাবেন। তাই শ্রীকৃষ্ণ বর্বরিক কে বিষয়টা বোঝালেন এবং বর্বরীক যখন মানতে নারাজ এবং বললেন তিনি যদি যুদ্ধ না করেন তবে তার পরবর্তী প্রজন্ম তাকে কাপুরুষ বলে চিহ্নিত করবে। সেই মুহূর্তে বর্বরিক কে থামিয়ে শ্রীকৃষ্ণ বললেন ‘ভবতি ভিক্ষাং দেহি’। দরিদ্র ব্রাহ্মণরূপে তিনি ভিক্ষা চাইলেন। বর্বরিক বললেন কি চান তিনি, শ্রীকৃষ্ণ এই সুযোগে বর্বরিকের কাটা মাথা চেয়েছিলেন৷ বর্বরিক ব্রাহ্মণের আসল রূপ দেখতে চাইল। শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভুত হলেন নিজ বেশে। যে কারণে বর্বরিকের দীর্ঘ সাধনা ছিল সেই সাধনা আজ পূর্ণতা পাবে। আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল। শুধু বলেছিল বলা ভালো চেয়েছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ দেখতে। শ্রীকৃষ্ণ তাকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেননি। আশীর্বাদ করেছিলেন, মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে গেলেও সে দেখতেও শুনতে পাবে। তাই তারর কাটা মাথা বসানো হবে কুরুক্ষেত্রের সবথেকে উঁচু জায়গায়। সেখান থেকে তিনি দেখবেন। এছাড়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ বর দিয়েছিলেন, সেটি হলো কলিযুগে বর্বরিকের এই কাটা মাথা শ্যাম নামে পূজা হবে।
পুরোপুরি ক্ষেত্রে যুদ্ধটাই বর্বরিক হয়ে উঁচুস্থান থেকে দেখেছেন। যুদ্ধের পর যখন সকলেই অহংকার করতে ব্যস্ত কে কত শক্তি দেখিয়েছে যুদ্ধে সেই বিষয়ে, তখন বর্বরিক বলেছিল যে তারা তো কেবলমাত্র বাহুবল দেখিয়েছে। আসল যুদ্ধ তো শ্রীকৃষ্ণের। চারিদিকে শুধু শ্রীকৃষ্ণের নাম উচ্চারিত হয়েছে। তার বুদ্ধিতেই যুদ্ধের এমন পরিসমাপ্তি। বরবটিকের এই কথায় বিজয়ী পান্ডবদের অহংকারের প্রাসাদে একটুখানি ধাক্কা লেগেছিল।
বর্বরিক কে জানতে গিয়ে বুঝেছি শুধু শক্তিশালী হলেই হয় না, তাকে ব্যবহার করার জন্যও যথাযোগ্য ময়দানের প্রয়োজন হয়। আবার অতিরিক্ত শক্তিশালী অর্থাৎ প্রয়োজনের থেকে বেশি শক্তিশালী হলে তিনি যে সব জায়গায় স্থান পাবেন এমনটা নয়। মহাভারতে উদ্দেশ্য সাধনের জন্য একলব্যের পর কেউ যদি উপেক্ষিত হয় তা একমাত্র বর্বরিক। পান্ডবদের বংশধর হওয়া সত্ত্বেও মহাশক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে জায়গা পেলেন না। বিষয়টা শুনতে যত সহজ লাগে এই মুহূর্তের যুদ্ধক্ষেত্র কল্পনা করে দেখুন একেবারেই সোজা লাগেনা। বরং ঠিক উল্টোটাই লাগে, এত শক্তিশালী হওয়ার পরেও বর্বরিক নিজের ক্ষমতার প্রদর্শন দিতে পারল না৷
তাই হয়ত আজকের দিনে সীমা কথাটির গুরুত্ব অনেক বেশি।