সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে নীলম সামন্ত (পর্ব – ৭)

ব্রহ্মমুখী সূর্য ও রেবতী ঠোঁট
একই জল অথচ প্রতিটা ঢেউই নতুন করে আছড়ে পড়ছে। প্রচন্ড এই রোদের মধ্যে সমুদ্রের জল আরও ঘন দেখাচ্ছে৷ দুটো ছেলেকে নীল প্যান্ট খালি গায়ে ঝাঁপাতে দেখে আমি ভাবছি ছোটবেলায় আমিও সমুদ্রে স্নান করতে নামতাম, তখন বোধহয় আমিও ছেলে ছিলাম জামা লাগত না৷ ভাবিনি জামা একটি রহস্যময় আভরণ।
শুধু জামা নয়, চামড়া বা হাড়ের আস্তরণ তুলে নিলে লিঙ্গ বৈষম্যে আত্মার কি আসে যায়? আমার জানা নেই। সৃষ্টি সে তো একটা হঠাৎ বিস্ফোরণ মাত্র। যেভাবে পৃথিবী এলো, যেভাবে আরও গ্রহ নক্ষত্র এলো। বিনা লিঙ্গে বিনা পরিচয়ে শুধু ঘুরতে শিখেছিল। এর মাঝেই সকলকে ফেলে নীলাব্জ গ্রহ হয়ে উঠল সুজলা সুফলা, আমরা বললাম মা বসুন্ধরা। বললাম ব্রহ্ম, আত্মা, সুখ সমৃদ্ধি। উলঙ্গ শরীরগুলোয় পোশাক চাপাতে চাপাতে ভুলে গেলাম আত্মার পোশাক নেই৷ আত্মাই ব্রহ্ম আত্মাই ঈশ্বর। আত্মাই সূর্য – যা আমাদের অহরহ জ্বালায়, অহরহ পোড়ায়৷
“জগতের মাঝে ও জগৎ ছাড়িয়ে বিস্তৃত সত্যের অব্যয় রূপ”। – ব্যকরণগত ভাবে ব্রহ্ম এরকমই চুড়ান্ত উল্লাস৷ হ্যাঁ উল্লাসই বটে। আত্মজ্ঞান লাভের উল্লাস৷ আর প্রতিটি জ্ঞান যা অন্ধ নয়, এক একটি সূর্য অথবা নক্ষত্র। সূর্য বা নক্ষত্র দর্শন করতে হলে ধ্যানের প্রয়োজন আগের পর্বে লিখেছিলাম ধ্যানের কথা। ধ্যান অর্থাৎ একাগ্রতা। সেই একাগ্রতা যা আমাদের ভেতর ঘরের দরজা খুলে দেয়। আমার ভেতর থেকে আমি বেরিয়ে আসে জগত হাতে।
মাঝে মধ্যে মনে হয় আমি আমার সত্তা আমার আত্মা একটি আস্ত মহাজগৎ। যা ব্রহ্মেরই সৃষ্টি। যা লোহার সিন্দুকে আটকে পড়ে বছরের পর বছর। এই কি গুপ্তধন নয়? কাঠের আদিম বাক্সে কত হাজার হাজার রেবতী নক্ষত্র আর বিনা লিপস্টিকের ঠোঁট। কে খুঁজবে এই সব? কোথায় আছে আমারই নালক বোধ?
কোন একদিন করোটির গভীরে সমুদ্র মন্থন হবে কি? দু একটা জাহাজ ডুববে, আকাশে উড়বে থলথলে জেলিফিশ। ঘুমের ভেতরেই জানব প্রিয় মানুষ স্নান সেরে উঠে আসছে চোখের পাতায় ফোঁটা ফোঁটা জল, দুই হাতে বিক্ষিপ্ত পা৷ কিভাবে ধরে আছে মরা মাছ, ভেজা বালি? সে আসছে আমার দিকে, এক পা দুই পা করে ঠোঁট থেকে ফুল সরিয়ে ঢুকে যাচ্ছে সৃষ্টির প্লেটনিক তত্ত্বে৷ হে প্রিয়, তুমি কি পারো ছুঁতে আমার আত্মায় বেড়ে ওঠা গুহাচিত্রের সূর্যকে?