সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ২২)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (ধৃষ্টদ্যুম্ন)
মহাভারতের নানান চরিত্র নিয়ে কথা বলতে গিয়ে যে কথাটা আমি বারবার বলেছি তা হল প্রতিটা চরিত্রের নিজ নিজ তাৎপর্যপূর্ণ জায়গা রয়েছে। সেই চরিত্রটি ছাড়া যেন মহাভারত অসম্পূর্ণ থেকে যেত। কি অসম্ভব নিপুন হাতে এই মহাকাব্য রচনা হয়েছিল সেই যুগে, প্রতি পদে প্রতিমুহূর্তে ভেবে যাই। এতদিন ধরে আমি চেষ্টা করেছি কিছু অবহেলিত চরিত্র নিয়ে কথা বলতে বা কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের নানান দিক তুলে ধরতে। এই সবকিছুর মধ্যে যখন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে তখন যে চরিত্রটি কিছু শিক্ষা দেওয়ার জন্য সামান্য হলেও উঁকি দিয়েছে তা হল ধৃষ্টদ্যুম্ন।
“ক্রোধাদ ভবতি সম্মোহঃ সম্মোহঃ স্মৃতি-বিভ্রমঃ স্মৃতি-ভ্রংশদ
বুদ্ধি-নাশো বুদ্ধি-নাশত প্রণাশ্যতি”
ধৃষ্টদ্যুম্ন নিয়ে যখন কাজ করে যাচ্ছি সারমর্ম হিসেবে গীতার এই শ্লোকটার বারংবার অনুরণন ঘটেছে। কারণ ধৃষ্টদ্যুম্ন ছিলেন অত্যন্ত ক্রোধী পুরুষ৷ হতে পারে তিনি বীর যোদ্ধা, যাকে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন তিনি একাই যথেষ্ট পুরো কৌরবদের ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তার ক্রোধ তাকে দিয়ে পাপ করিয়েছে। সত্যিই তো ক্রোধ যখন মাথায় উঠে যায় তখন বুদ্ধিনাশ ঘটে। তার উদাহরণ হিসেবে ধৃষ্টদ্যুম্নই যথেষ্ট।
এ হবে নাই বা কেন ধৃষ্টদ্যুম্নর জন্য জন্মই তো প্রতিহিংসার আগুনে ঘি ঢালতে। কিভাবে? কেন?
দ্রোণাচার্য আর দ্রুপদ থেকে সেই গল্প শুরু করতে হয়। একবার রাজা দ্রুপদ আচার্য দ্রোণাচার্যকে বন্দি করেছিলেন৷ পরে ছেড়েও দেন কিন্তু দ্রোণাচার্যের মনে মনে অত্যন্ত আঘাত পেয়েছিলেন। আত্মসম্মানের প্রশ্ন যেখানে দেখা যায় সেখানে মুখ বুজে সব মেনে ক্ষমা করে দেবেন এমনটাও দেখানো হয়নি। তাই পঞ্চপান্ডব অস্ত্রশিক্ষা পূরণ হওয়ার পর গুরুদক্ষিণা হিসেবে দ্রোণাচার্য চেয়েছিলেন রাজা দ্রুপদকে হারিয়ে দিতে। তিনি হেরেও গিয়েছিলেন। কিন্তু হেরে যাওয়ার পর তার মধ্যেও প্রতিশোধ পরায়ণতা জন্ম নিয়েছিল। অথচ তার তো পুত্র সন্তান নেই। তাই তিনি পুত্র লাভ করার জন্য নানান ধরনের চেষ্টা করতে থাকেন। তো সেই ইচ্ছেপূরণ হতো তিনি গঙ্গা-যমুনা নদীর তীরে ঘুরে ঘুরে যাজ-উপযাজ নামক দুই ব্রাহ্মণের কাছে উপস্থিত হলেন। উপযাজের সেবা করে তাকে তুষ্ট করার কাজে মন দিলেন। এমনকি ঘুষ দেবার কথা ভাবতেও তিনি পিছু পা হননি। সেটা কেমন? এক সময় এমনও বলেছিলেন উপযাজ কে যে তাকে দশ কোটি গরু পাইয়ে দেবে যদি এমন একটি পুত্র সন্তান পাইয়ে দিতে পারেন যে দ্রোনকে হত্যা করতে পারবে। উপযাজ রাজি হয়নি। এদিকে রাজা দ্রুপদ নাছোড়বান্দা। প্রায় এক বছর ধরে চোখ কান বন্ধ করে সেবা করেই গেলেন। তখন একদিন উপযাজ বললেন যে তার দাদা যাজ কোন জাতপাত, শুচি-অশুচি বিচার করেন না, তিনি করতে পারেন পুত্র পাওয়ার জন্য যজ্ঞ।
রাজা দ্রুপদ যেন সোনার চাঁদ হাতে পেলেন। মুহূর্ত দেরি না করেই যাজের কাছে গিয়েছিলেন অনুরোধ নিয়ে। তিনি যোগ্য করলেন রাজা দ্রুপদ এবং তার স্ত্রীর উপস্থিতিতে। যজ্ঞ সম্পন্ন হবার পর যখন যাজ আহুতি দিলেন, যজ্ঞের আগুন থেকে শক্তিশালী যুবক বর্ম পরিহিত অবস্থায় সগর্জনে আবির্ভূত হলেন দ্রৌপদ তথা ধৃষ্টদ্যুম্ন। সাথে ছিলেন তার বোন দ্রৌপদী।
যার জন্মই হলো প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তার মধ্যে কিভাবে ক্রোধ এবং শক্তির অভাব ঘটবে? দৈববাণীকে কেইবা অস্বীকার করে৷ ঠিকই। দৈব বাণীকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কারোর নেই। সেই জন্যই হয়তো দ্রোণাচার্য সমস্তটা জেনেশুনেই ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিজের পাঠশালায় তাকে রেখে অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছিলেন৷ এমনকি উন্নত সামরিক কলায় তাকে শিক্ষিতও করে তুলেছিলেন৷ এই বিষয়টা দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষার মতো শোনালেও কোন ঋদ্ধ ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে বোঝা যায় কাল এবং কালের নিয়মকে খণ্ডানোর ক্ষমতা কারোরই নেই, যা পূর্বনির্ধারিত তা ঘটবেই। এবং ঈশ্বর সমতুল্য শিক্ষক কখনোই কোন পরিস্থিতিতেই তার শিক্ষাদান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেন না ভবিতব্যের কথা জেনেও। এই অংশে দেখা যায় দ্রোণাচার্যের ব্রহ্মদৃষ্টির প্রতিফলন এবং তার উদারতা।
ধৃষ্টদ্যুম্ন এমনিতেই শক্তিশালী পরাক্রমী যুবরাজ ছিলেন, তিনি তার ভগিনীর প্রতি যথেষ্টই দায়িত্বশালী ও ছিলেন। যখন দেখা যায় স্বয়ংবর সভায় এক ব্রাহ্মণবেশী যোদ্ধা তীরন্দাজ প্রতিযোগিতায় উপস্থিত বাকি সমস্ত অভিজাত রাজকুমারদের পরাস্ত করে রাজকুমারী দ্রৌপদীকে বিবাহ করেন তখন ধৃষ্টদ্যুম্নই সেই ব্রাহ্মণের আসল পরিচয় জানতে লুকিয়ে লুকিয়ে পিছু নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন কুম্ভকারভবনে৷ এবং জানতেও পেরেছিলেন তিনি পঞ্চ-পান্ডবদের মধ্যম পান্ডব বীর অর্জুন৷ ধৃষ্টদ্যুম্নের এই ব্যবহার হেতু স্পষ্টই বোঝা যায় তিনি শুধু যে তাঁর বাবার প্রতি কর্তব্য পরায়ণ ছিলেন তা নয়। ভগিনীর প্রতিও তার যথেষ্টই দায়িত্ববোধ ছিল৷ নইলে হয়তো তার ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণের আসল পরিচয় জানার প্রয়োজনই ছিল না৷
আমরা প্রত্যেক বোনেরাই বোধহয় এমন ভাইই প্রত্যাশা করে থাকি। অর্জুনকে বিয়ে করার পর যখন দ্রৌপদী পঞ্চপাণ্ডবদের স্ত্রী হলেন তখনও দৃষ্টিদ্যুম্নের সাথে তাদের অত্যন্ত সুসম্পর্ক বজায় ছিল। নানান ছোট বড় কাজে তাঁর উপস্থিতি দেখা যেত। যেমন, যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে তিনি উপস্থিত ছিলেন৷ অভিমন্যুর বিবাহ উৎসবেও তিনি বিরাট রাজ্যে গিয়েছিলেন৷ দ্রৌপদীর নিজের ভাই হেতু কোন জায়গায় তাঁর মান ক্ষুণ্ণ হয়নি। তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান পান্ডবরাও দিয়ে গেছেন। যখন পান্ডবদের কি করনীয় নির্ধারনের সভা বসেছিল সেখানেও জায়গা ছিল ধৃষ্টদ্যুম্নের। এবং তাঁকে তাঁর পরামর্শ সব সময়ই দিতে দেখা গেছে৷
শুধুই কি ভাতৃত্বের বন্ধনের কারণে এমন সুসম্পর্ক বজায় ছিল? নাকি রাজনৈতিক দিক থেকেও একটি সমঝোতাপূর্ণ দেওয়া নেওয়ার সম্পর্ক? আমরা যদি সামান্য কূটনৈতিক দিকগুলোতে দৃষ্টি ঘোরাই তবে বিষয়টা এরম দাঁড়ায়, ধৃষ্টদ্যুম্নের মতো শক্তিশালী বীর যোদ্ধা ও বিশাল সেনাবাহিনীর প্রয়োজন পান্ডবদের ছিল, আবার ধৃষ্টদ্যুম্নেরও পান্ডবপক্ষের প্রয়োজন ছিল দ্রোণাচার্যকে মেরে ফেলার জন্য৷ তাই সুসম্পর্ক বজায় না রেখে কোন দ্বিতীয় উপায় বোধহয় পড়ে থাকে না৷ সঞ্জয় যখন উপপ্লব্য থেকে ফিরে এসে ধৃতরাষ্ট্রকে পান্ডবদের বীরেদের বর্ণনা দিয়েছিলেন তাতে তিনি বার বারই বলেছেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন পান্ডবদের যুদ্ধের জন্য বার বারই উত্তেজিত করে। ধৃষ্টদ্যুম্নের ভাষায় এরম ছিল, “হে ভরতশ্রেষ্ঠগণ, যুদ্ধে ভয় পাইও না। যুদ্ধ কর। দুর্যোধনের পক্ষে যে সমস্ত বীর যোগ দিয়েছেন আমি তাঁহা দিব কে বধ করিব। বেলাভূমি যে রূপে সমুদ্রকে নিরোধ করে আমিও সেই রূপ ভীষ্ম, দ্রোণ, প্রমুখ বীরবৃন্দকে নিরোধ করিব”। অর্থাৎ দ্রোণকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই যে তাঁর জন্ম সে কথা তিনি কখনোই ভোলেননি। যতই দ্রোণাচার্য তাঁর শিক্ষাগুরু হোন। যে কর্ম আগে থেকেই নির্ধারিত তা থেকে কিভাবেই বা সরে দাঁড়াবেন?
অতয়েব পান্ডবদের সাথে তাঁর এই সুসম্পর্ক যে শুধুই দ্রৌপদীর কারণে নয়, তা বেশ স্পষ্টই বোঝা যায়৷ এই মুহুর্তে আমার এও মনে হচ্ছে, দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় যে তীরন্দাজ প্রতিযোগিতা হয়েছিল তা তো অর্জুনের জয়ের কথা ভেবেই তৈরি করা হয়েছিল। যেন পান্ডবদের রাজা দ্রুপদকে হাতে পেতেই হবে। তাই কন্যাকে এগিয়ে দিলেন। সে যুগে এমন রাজনৈতিক চাল তো ছিলই।
.
.
চলবে…