সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ১৬)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (ঘটোৎকচ)
নানান পৌরাণিক গল্প অনুযায়ী বারবার রাক্ষসের কথা সামনে আসে। কে এই রাক্ষস? সত্যিইকি তাদের অমন দানবীয় শক্তি ছিল? নাকি অমন কদাকার দেখতে?
শোনা যায় সত্যযুগের শেষে যখন ব্রহ্মা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তখন তার শ্বাস থেকে সৃষ্টি হয়েছিল রাক্ষসদের। তাদের বৃদ্ধি এতই দ্রুত ছিল যে তারা জন্মেই বড় হয়ে রক্তমাংসে পরিণত হয়েছিল এবং রক্তমাংসের কদাকার দানবে পরিণত হয়ে গেছিল। সেই মুহুর্তে তারা ব্রহ্মাকেই খেতে শুরু করেছিল, ব্রহ্মা নিজেকে বাঁচানোর জন্য বিষ্ণুর সাহায্য নিয়ে মর্তে অর্থাৎ পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন৷
ঋকবেদেও রাক্ষসের উল্লেখ পাওয়া যায়৷ বর্ণনা অনুযায়ী বলা হয় তারা যতুধন শ্রেণীর দানবীয় প্রাণী। যারা মানুষের মাংস খায়৷
তবে কি তারা মানুষের মতো দেখতে নয়? নাকি মানুষখেকো মানুষ? এই মানুষখেকো রাক্ষসরা অনার্য তা স্পষ্টই বোঝা যায়৷ তারা সভ্য নয়। আমাদের মানব সভ্যতার ইতিহাস দেখলে কোথাও গিয়ে মনে হয় আমাদেরই মতন কিছু মানুষ যাদের আদিবাসী বলা হয় অনেক অনেক বছর আগে তারা মানুষের মাংসও খেত। এমং সে কারণেই তাদের মধ্যে অতিদানবীয় আচরণ লক্ষ্য করক যায়৷ মানুষ মানুষের মাংস খেতে পারে তা কিন্তু অসম্ভব নয়। বেশ কিছু বছর আগে একটি প্লেন ক্র্যাশের ঘটনা ঘটেছিল। বরফাচ্ছন্ন পাহাড়ের ওপর প্লেনটি পড়ায় যেখানে সাহায্যের হাত পৌঁছোতে বেশ দেরিই হয়েছিল। ততদিকে বেশিরভাগ মানুষই মারা গেছিলেন। একজন টিকে ছিলেন যিনি ডাক্তার, যিনি খেতেন মানুষের মাংস। যার ফলে তার শরীরে অনেক পরিবর্তন ও শক্তি দেখা গিয়েছিল। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি সিনেমাও হয়েছে। ঘটনাটি জানার পর আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম মানুষ মানুষের মাংস খেতে পারে, প্রয়োজনে কাচাই।
এতোকিছু ভাবছি কারণ মহাভারতের ঘটোৎকচ। পঞ্চপান্ডবের দ্বিতীয় পান্ডব ভীম ও রাক্ষসী হিড়িম্বার সন্তান হল ঘটোৎকচ। এতো চরিত্র থাকতে কেন ঘটোৎকচ নিয়ে পড়লাম? কারন আমার বারবারই মনে হয় মোড় ঘোরাতে ব্যবহার করা হয়েছিল ঘটোৎকচকেই। না হলে হয়তো যুদ্ধের ফলাফল অন্যরকম কিছু হতে পারতো। কারণ কৌরবদের দলে যে পরিমাণ বীর যোদ্ধা ছিল সেই হিসেবে পান্ডবদের দল কিন্তু হালকাই ছিল। শুধুমাত্র রণনীতির জন্য এই যুদ্ধে জিতে গিয়েছিলেন।
বিগত লেখাগুলোতে বারবারই বলেছি মহাভারত এমন একটি কাব্য যেখানে প্রতিটি চরিত্র নির্মাণের পেছনে একটি করে কারণ আছে। যে কারণে আমি বারবারই মহাভারত কে একটা ঘরের মতো বর্ণনা করতে চেয়েছি। একটি ঘরের একটি ইট খুলে নিলে যেমন ঘরটি অসম্পূর্ণ দেখায় তেমনি মহাভারতের যে কোন একটা চরিত্র তুলে নিলে সম্পূর্ণ হয়ে যায়। সুনিপুণ ভাবে অংকের মতো করে প্রতিটা চরিত্রকে বর্ণনা করা হয়েছে। ঘটোৎকচও বাকিদের মতনই একটি প্রয়োজনীয় ইট।
আদিপর্বে দেখা যায়, বারণাবতে লাক্ষাগৃহের মারণফাঁদ থেকে রক্ষা পাওয়ার পর তারা উত্তর দিকে বনে যাত্রা শুরু করে৷ রাত্রিবেলায় সবাই ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে গেলেও ভীম ঘুমোতে পারে না৷ তার ভেতর আবেগের ওঠানামা চলছিল। কৌরবদের এমন ব্যবহার, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা, সব মেনে নেওয়া খুব সোজা সত্যিই নয়। অন্তত ভীমের মতো আবেগপ্রবণ মানুষের ক্ষেত্রে৷ সেই রাতে ভীম জেগে পাহারা দিচ্ছিলেন আর কিছু দূরেই একজোড়া নরখাদক রাক্ষস হিড়িম্ব ও হিড়িম্বার বাস৷ মানেষের গন্ধে হিড়িম্বর লোভ হয়। সে খেয়ে নিয়ে চায় ওই মানুষদের। বোন কে বলে শিকারে যাবার চিন্তা করে৷ বোনকে বলে গিয়ে দেখে আসতে তারা কারা।
ধারালো দাঁত, লাল চুল, মোটা পেট সমেত কদাকার চেহারার রাক্ষস যে মানুষের গন্ধে ছুটে যাবে জিভের রসনা তৃপ্তি করতে তা চিন্তাভাবনার বাইরে নয়। হিড়িম্বা সুন্দরী নারীর রূপে চলে যায়৷ কিন্তু ভীমকে দেখে তার নরখাদক মন ঘুমিয়ে গিয়ে জেগে ওঠে প্রেমিকা মন। এই ভালোলাগাকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই সে ভাইয়ের কথার অমান্য করে এগিয়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেয় ভীমকে বিয়ে করার। ভীমকে সামনে পেয়ে জানতে চায় সে কে, এখানে আসার হেতু কি৷ এবং জানায় তার ভাই তাদের মেরে খেয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে এখানে পাঠিয়েছে৷ তবে হিড়িম্বা এটা জানাতে ভোলেনি যে সে ভীমের প্রেমে পড়েছে। আর এই প্রেমের কারণেই ভীম সহ বাকিদেরও তার ভাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু ভীমকে তাকে বিয়ে করতে হবে৷ ভীম রাক্ষসকে ভয় পাননি এসব কথায়। ভাবছিলেন মা ও অন্যান্য ভাইদের ফেলে যাওয়া অনুচিত হবে৷ তাঁদের রক্ষা করা তাঁরই কর্তব্য। অতয়েব হিড়িম্বার প্রস্তাব তৎক্ষনাৎ খারিজ করে দিলেন৷
চলবে…