সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ২২)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (উত্তরা)
এরপর লড়াই যাই ঘটুক কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে হেরে গেল কৌরব। দুর্যোধনদের করুণ পরিনতি দেখে তার মিত্রদের রাগ হবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাই না? রাগ হল অশ্বত্থামার। তিনি চাইলেন পুরো পান্ডবদের মেরে নিঃশেষ করে দিতে। মাঝ রাতে গিয়েওছিলেন। কিন্তু নিঃশেষ হল শিখণ্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন সহ দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্র৷ আবার বলির পাঁঠা হলেন সেই দ্রৌপদীই। আবার তাঁর আঘাতের রক্তে দগদগিয়ে উঠল সেই কৌরব পক্ষই৷ প্রথমবার অপমান রাগের ফলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ হলো, সেই যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই আবার একটা যুদ্ধ হবে এমন তো হয় না, হয়তো সে কারণেই দ্রৌপদী চেয়েছিলেন অশ্বথ আমাকে মেরে ফেলা হোক কিংবা তার মাথার মণি টেনে ছিঁড়ে আনা হোক। যেই বলার সেই কাজ। কনিষ্ঠ ভাই সহদেবকে পাহারায় বসিয়ে বাকি চারজন গেলেন অশ্বথামা নিধনে। দূর থেকে পান্ডবদের আসতে দেখে অশ্বথামা ভয় পেয়ে নারায়ণাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন, অর্জুন সে অস্ত্র রোধ করার জন্য নিজেও নারায়নাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। ইতিমধ্যেই নানান মুনি ঋষিদের অনুরোধে ওর জন্য নিজেকে সামলে নিলেন। কিন্তু সেই সামলানোর মন বাড়িচ্ছে কোনটাই অশ্বত্থামার মধ্যে ছিল না। তারপর পরবর্তী বাণে আহত হল গর্ভস্থ উত্তরা। বান গেয়ে আঘাত করলো গর্ভে উপস্থিত শিশুকে। এইসব দেখিয়ে শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত রেগে গিয়ে অভিসম্পাত ল করেছিলেন এবং অশ্বত্থামাকে বলেছিলেন এই শিশু যদি মৃত ভূমিষ্ট হয় তাহলে তিনি তাকে পুনর্জীবিত করবেন।
এদিকে যুদ্ধের শেষ গান্ধারী কৃষ্ণের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে যান, মৃতপুত্র এবং অন্যান্য আত্মীয়দের দেখতে। সেখানে তিনি অভিমুন্য কে পড়ে থাকতেন। এবং কৃষ্ণ কে বলেন, যুদ্ধের অন্যান্য বীরের থেকেও যাকে অধিক বীরবল এবং বুদ্ধিদীপ্ত বলে মনে করতেন সেই অভিমন্যু এখানে পড়ে আছে, চক্রবৃহের মত কঠিন রননীতি ভেদ করেও যেদিকে থাকতে পারেনি এবং বেরিয়ে আসতে পারেনি অথচ মহান এবং বীর যোদ্ধা, সেই অভিমন্যুই পড়ে রয়েছে। তাঁর বালিকা স্ত্রী তাকে কাছে পেয়ে ক্রমাগত বিলাপ করে যাচ্ছেন। সেটাই কি স্বাভাবিক নয় মাত্র কয়েক মাসের বিয়ে তাদের গর্ভস্থ সন্তানের বয়সও মাত্র সাত মাস,এই স্ত্রী এতো বিলাপ করাই স্বাভাবিক প্রভাব। তিনি নানান কথা বিলাপ করতে করতে কাঁদছেন। তার প্রতি কান্নায় বার বার প্রকাশিত হচ্ছে অভিমুন্য কতখানি শক্তিশালী ছিলেন । এক একবার কষ্টে ভেঙে পড়ে বলছেন, এমনকি তার নরম হাত দুটো ধরে বলছেন যে এমন পুত্র মৃত অবস্থায় কুরুক্ষেত্র যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে রয়েছে অথচ তার বাবা অর্জুন কিভাবে জীবিত, মাথা উঁচু করে রয়েছে? আবার কখনো বলছেন অভিমন্যুকে নাথ সম্বোধন করে, যেই পৃথিবীতে এই জগতে তিনি মাত্র ছয় মাস তার সাথে সহবাস করেছেন, সাত নম্বর মাসেই তিনি মৃত্যুর কবলে পড়ে গেলেন। কখনো আবার বলছেন আপনি তো পিতৃলোকে চলে গেলেন, সেখানে গিয়ে নিশ্চয়ই কোন সুন্দরীর সাথে প্রণয়ের বাক্যালাপ করবেন যেমনটা আমার সাথে করেছিলেন। কিংবা কোন মনোহরূপ ও মৃদুহাস্যরস যুক্ত স্বর্গের কোন অপ্সরাকে ভেতর থেকে আলোড়িত করবেন। আসলেই উত্তরা যে কতখানি শিশুসুলভ তার এই সমস্ত বাক্যালাপই বারবার বলে দিয়ে যায়। পরে অবশ্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাকে বিরাট রাজার কুলবধূরা এসে নিয়ে যায়।
এরপর আর সেভাবে উত্তরা কি আমরা দেখতে পাই না মাঝখানে যুধিষ্ঠির ও ভীষ্মের টানা ছাপ্পান্ন দিন কথোপকথন চলে, তখনো তিনি সিংহাসনে বসেননি।ছাপান্ন দিনের বাক্যালাপ শেষে ভীষ্ম যখন স্বেচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করলেন এবং যুধিষ্ঠির তার সাধ্য শান্তি করে হস্তিনাপুরে ফিরে সিংহাসনে বসলেন। তারপর ঠিক করলেন অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন। সেই ভেবেই দিকে দিকে রাজাদের জানানো হলো। বাকি চার পাণ্ডবদের সাথে নিয়ে যুধিষ্ঠির মহাদেবকে প্রসন্ন করে মরুত্ত রাজার ধন সংগ্রহে যাত্রা করলেন। এদিকে আমন্ত্রণ পেয়ে আমন্ত্রণ রক্ষা করতে শ্রীকৃষ্ণ এসে পৌঁছলেন হস্তিনায়। হস্তিনায় তখন হাহাকার পড়েছে কারণ উত্তরা জন্ম দিয়েছিল দ্বিখন্ডিত ও মৃত একটি শব-পুত্র। কুন্তি দ্রৌপদী এদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। তারা উপস্থিত হয় কৃষ্ণের সামনে এবং কৃষ্ণকে সমস্ত ঘটনা পরিষ্কার করে বলেন। কৃষ্ণ দেরি না করে তৎক্ষণাৎ চলে যায় সূতিকা গৃহে। দ্রৌপদী তার আগেই উত্তরাকে খবর দিয়ে দিয়েছিল। বয়সের হিসেবে বিচার করলে উত্তরা তো নিতান্তই বালিকা, তাই হয়তো তার আবেগটা অনেক বেশি। যখনই দুর্বল হয়ে পড়েন তখনই তিনি কান্নাকাটি করে বিলাপ করতে শুরু করেন। এবারও তার অন্যথা হয়নি। শ্রীকৃষ্ণ কে দেখেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন, বলেন “পুণ্ডরীকাক্ষ! দেখুন অভিমন্যু ও আমি—আমরা দু’জনেই পুত্রবিহীন হয়েছি। জনার্দন! বিধাতা আমাদের দুজনকেই সমানভাবে নিহত করেছেন। মধুনাশক বীর বৃষ্টিনন্দন! আমি মস্তক অবনত করে আপনাকে প্রসন্ন করছি। আপনি অশ্বত্থামার অস্ত্রে দগ্ধ আমার এই পুত্রটিকে সঞ্জীবিত করুন।” তিনি আরো বলেন, মৃত সন্তানের কারণে তিনি আর অভিমুন্য দুজনেই পুত্রবিহীন হয়ে গেলেন। অথচ তার ভারী ইচ্ছা ছিল পুত্রকে কোলে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের পা ছুয়ে আসবেন। কিন্তু তা আর হলো না, আকুল কণ্ঠে বিনতি করলেন, যাতে ব্রহ্মাস্ত প্রয়োগ করে এই মৃত সন্তানকে জীবিত করে দেন। এও বললেন, বীর কেশব! এই প্রতিজ্ঞা আমি করেছিলাম যে, অভিমন্যু যুদ্ধে নিহত হলে, আমি অচিরকালের মধ্যে তাঁর কাছে যাব। আমি নৃশংসা ও জীবনপ্রিয় কিনা, তাই তা করিনি; কিন্তু এখন আমি অভিমন্যুর কাছে গেলে, তিনি আমাকে কী বলবেন।”
এরপর কখনো তিনি অজ্ঞান হয়ে যান এবং আবার জ্ঞান ফিরলে নানান ধরনের বিলাপ করেন, কখনো মৃত পুত্রকে কোলে নিয়ে বলেন চোখ খুলতে, সামনেই জনার্দন রয়েছেন তাকে যেন প্রণাম করেন প্রণাম করেন। তিনি বারবার ভূতলে নিপতিত হন এবং তাকে তুলে ধরেন দ্রৌপদীরা। এই সমস্ত দেখে শ্রীকৃষ্ণ আচমন সারেন। এবং জগতকে শুনিয়ে বলেন তিনি মিথ্যে বলছেন না, অর্জুনের সাথে কি হয়েছে না হয়েছে সে জানে না কিন্তু তিনি কখনোই যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যাননি। এছাড়াও যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি কথা দিয়েছিলেন উত্তরার সন্তান জীবিত অবস্থাতেই পৃথিবীর আলো দেখবেন। শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞানত কখনো অধর্মের পথে যাইনি তাই তার বলা কথা অবশ্যই সত্য হবে আর ওই বালক পুনরায় জীবিত হবে৷ এবং তারপরেই বালক চৈতন্য ফিরে পেয়ে ধীরে ধীরে অঙ্গ সঞ্চালন শুরু করে। খানিক সুস্থ বোধ করলে তারপর শ্রীকৃষ্ণ তার নামকরণ করেন পরীক্ষিৎ। হ্যাঁ সেই পরীক্ষিৎ যার হাতে হস্তিনাপুর সিংহাসনের যাবতীয় দায়িত্ব তুলে দিয়ে যুধিষ্ঠির সহ পঞ্চপান্ডব মহাপ্রস্থানের পথে এগিয়ে পড়েছিলেন।
এইটুকু অংশ অর্থাৎ ঠিক যেই অংশে উত্তরার বিবরণ রয়েছে সেইটুকু অংশ দেখলে বোঝা যায় কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস উত্তরা চরিত্রটিকে এনেছিলেন শুধুমাত্র পরীক্ষিতের জন্মের গর্ভ হিসেবে। ঠিক যেভাবে আমরা মায়েরা বলি একটা সন্তানের জন্মের জন্য আমরা মাধ্যম মাত্র। উত্তরা ও পরীক্ষিতের পৃথিবীতে আসার মাধ্যম ছিল। শুধুমাত্র সেই কারণেই এই এতটুকু জায়গা তার জন্য বরাদ্দ হয়েছিল। কারণ ওই বালিকা অবস্থায় পরীক্ষিতের জন্মের পর তার চেয়ে আসলে কি হয়েছিল এবং বাকি জীবনে সে কিভাবে বেঁচে ছিল, এছাড়াও পরীক্ষিতের জীবনে মায়ের ভূমিকা কতখানি ছিল সে সমস্ত বিষয়ে বিন্দুমাত্র আলোকপাত করেননি কবি। হয়তো করার প্রয়োজন হয়নি। কারণ উত্তরার মতো সাধারন নারী মানসিকতার আবেগপ্রবণ হৃদয়টি আর কতই বা জায়গা দখল করতে পারে একটি মহাকাব্যের। এটুকুই যেন তার জন্য যথেষ্ট জায়গা। অথচ অভিমুন্য বিহীন তার জীবনটা কতখানি অন্ধকার। রাজপ্রাসাদেও বাকি সমস্ত রানীদের মধ্যে তার একাকীত্ব একমাত্র তার হয়েই থেকে যাওয়ার কথা। সেসব কথা উল্লেখ করা হয়নি। সেই দিকে আলোকপাত করার চেষ্টাও করা হয়নি। কিবা হতো কতগুলো পাতাই বা নষ্ট হত? একেবারে অবহেলায় তাকে পর্দার পেছনে না ঠেলে দিলেই কি হচ্ছিল না। অবশ্য হয়েওছে। এরপর থেকে আমরা উত্তরা কেয়ার কোথাও কোনো ভাবে দেখতে পাই না।
তাই জানিনা কেন আমার বারবারই মনে হয় মহাভারতে বড় বা পুরনো রানীরা যতখানি দাপটের সঙ্গে রাজপ্রাসাদে নিজের জায়গা করে নিতে পেরেছেন, পরবর্তীতে সন্তানাদি স্ত্রী’রা যেন পেছন বেঞ্চের ছাত্রী হিসেবেই থেকে গেছে। রাজদরবারে আছে এই কি কম নয়? তার আবার আলাদা করে কিই বা জীবন থাকতে পারে যেটা ব্যাখ্যা করা যায়। তাই অবহেলা টুকুই থাক তার জন্য। আজকের সংসারে কি আর উত্তরা নেই? এই এত শিক্ষিত সমাজের মাঝে যদি আমরা খুঁজে দেখি আরো কত অবহেলিত উত্তরা নিজেদের মত সামান্য কিছু জায়গা জুড়ে বেঁচে আছেন এই বৃহৎ পৃথিবীতে। উত্তরার প্রতি কোথাও গিয়ে আমারও মন কেঁদে ওঠে। কি দরকার এতখানি অবহেলার। সন্তান জন্ম দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে যদি একটি নারীকে বিচার করা যায় তাহলে সমাজে তার গুরুত্ব কি অনেকটা ঊর্ধ্বে নয়? আমার চোখে তো ঊর্ধ্বে। সে যুগে কেন হয়নি কে জানে?