সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ১১)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (দুঃশাসন)

নির্ভয় দুঃশাসন শাপশাপান্তকে লাথি মেরে ফেলে সহজে। ভেতরে যে তার কিসের বাস! তিনি সেদিন স্বেচ্ছায় থামেননি, কেউ থামায়নি, থেমেছিলেন ক্লান্ত হয়ে, শ্রান্ত হয়ে৷ তবে মুখ? সে কিভাবে থামাতে হয় তা বোধকরি ক্লান্তিও তাকে সেই শিক্ষা দিতে সাহায্য করেনি। এই পাশবিক ঘটনার পরে যখন ধৃতরাষ্ট্র পঞ্চ-পাণ্ডব সহ দ্রৌপদীকে মুক্ত করতে বাধ্য হলেন, ফিরিয়ে দিলেন তাঁদের সাধের খান্ডবপ্রস্থ তথা ইন্দ্রপ্রস্থ। তারা চলে যাবার জন্য তৈরি হতেই দুঃশাসন ছুটে গেলেন দুর্যোধনের কাছে। উদ্ধত হয়ে বললেন এতো কষ্ট করে পাওয়া ধনদৌলত সব ফিরিয়ে দিতে হল! ওই বুড়োর জন্য সব নষ্ট!( দুঃখেনৈতৎ সমানীতং স্থবিরো নাশয়ত্যসৌ), আদৌ কি কষ্ট করেছিল? শকুনির পাশার চালে কি কোন লোকঠকানো বিদ্যে ছিল না? ছিল। আর তা আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু এই সব কিছু হাতিয়ে পাওয়ার পেছনে দুঃশাসনের অবদান শূন্য। তাও তার মুখের ভাষা! নিজের বাবাকেও তিনি রেয়াৎ করছেন না। দুর্যোধন প্রতিবাদও করল না। সত্যিই যেন একই ছাঁচে তৈরি দাবার দুটো বোড়ে।

ফন্দী আঁটা থামে না। এসব জানার পর ওই চার মুর্তি যে বসে থাকবে না সেটাই স্বাভাবিক৷ দ্বিতীয়বার পাশাখেলার আয়োজন হলো। আবারও হেরে গেল পাণ্ডবরাই। এবার ধার্য্য হল বার বছরের বনবাস ও এক বছরের অজ্ঞাতবাস। এভাবেই হয়তো দুর্যোধনকে সব পাইয়ে দেওয়াটা সোজা ছিল। কিন্তু ধর্ম সে কোথায় লুকিয়ে থাকবে? কোথায়ই বা চাপা থাকবে? ধর্ম সূর্যের আলোর মতো। তাকে তো প্রকাশ্যে দীপ্তি নিয়ে আসতেই হত৷ তাই দুঃশাসন যখন বনবাস পথযাত্রীদের উদ্দেশ্যে কটাক্ষের বাণ ছোঁড়ার দায়িত্ব নিয়ে সহাস্যে পায়ে পা লাগিয়ে বললেন এই রাজ্য এবার ধৃতরাষ্ট্র পুত্রদের হল। সঠিক হাতেই এলো। বড্ড টাকার গরম ছিল! আজ রাজ্যও গেছে আর সুখও গেছে। আজ থেকে এই রাজ-ঐশ্বর্য কৌরবদের- উপযুক্ত মানুষদের। সেই মুহুর্তে বোধকরি দুঃশাসন এটুকু ভাববার বুদ্ধি মাথায় আনেননি যে তেরো বছর খুব বেশি দিন নয়। আর সে হলেও তা একদিন ফুরোবে। তখন যুদ্ধ অবসম্ভাবী। যেখানে ভীম বারবার তাকে এই কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু দুঃশাসনের ঔদ্ধত্য তাকে বোধহীন করে তুলেছিল। এই দৃশ্যে তিনি কত অমানবিক! নিজের জ্ঞাতিভাইরা তাঁদেরই ছল কপটতার কারণে বনবাসে যাচ্ছেন আর তিনি এসে মুখের সামনে আগুনে ঘি ঢালছেন! ঠিক যেন চোরের মায়ের বড় গলা।

দুঃশাসন দুর্যোধন কিংবা কর্ণের মতো বীর যোদ্ধা নন। গায়ের ক্ষমতাও নেই আবার বুদ্ধির ঘরও শূন্য। অথচ মুখের বুলি শুনলে দেখে মনে হয় কী না কি! বীর যোদ্ধা না হয়েও তিনি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে রথোযোদ্ধার তকমা পেলেন। পেলেন নিজের রথ। অথচ যখনই যুদ্ধের সম্মুখ সমরে গেছেন তখনই মার খেয়েছেন। অর্জুন, ধৃষ্টদ্যুম্ন, সাত্যকি এমনকি কনিষ্ঠতম বালক অভিমন্যুর কাছেও। অভিমন্যুর সাথে যুদ্ধটা সত্যিই উল্লেখযোগ্য। বয়সে এতো ছোট হয়েও দুঃশাসনের কৃতকর্মের জন্য কটুক্তি শুনিয়েছিল ওই রণক্ষেত্রেই আর যখনই দুঃশাসন তীব্রবেগে ধেয়ে আসছিলেন তখনই সুতীক্ষ্ম বাণের আঘাত৷ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছিল দুঃশাসনের শরীর। রথের মধ্যে বসে পড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। তারপর তাঁর সারথি কোনরকমে রণক্ষেত্র থেকে তাঁকে বার করে নিয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও দুর্যোধন কর্ণকে ডেকে কোনরকমে অভিমুন্য কে আটকাতে পেরেছিল। এরপর একদিন সাত্যকিকে মারার পরিকল্পনায় অদ্ভুত ধরনের যুদ্ধবাজদের কাজে লাগালেন। যারা এলোপাথাড়ি পাথর ছুড়ে যুদ্ধ করে। দুঃশাসন ভেবেছিল সাত্যকি এধরণের যুদ্ধে কোনভাবেই টিকতে পারবে না৷ কিন্তু সে যে সত্যিই কতটা মূর্খ এবং ধারণাহীন কথা প্রমাণ হয়েছিল যখন সাত্যকির বাণে ওই যুদ্ধবাজদের প্রাণ যেতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পিছু হটছিল। দ্রোণাচার্য এই দৃশ্য দেখছিলেন। দেখলেন ওই যোদ্ধারা ভয় পেয়ে দ্রোণাচার্যের আশ্রয়ের দিকে ধেয়ে আসছে। এই মুহূর্তে দ্রোণাচার্য ক্ষুব্ধ পাণ্ডবদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। দেখলেন দুঃশাসনের এক করুণ মুখ। থাকতে না পেরে দুঃশাসনকে বললেন ফিরে আসছ কেন হয় যুদ্ধ কর নয় আমি তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। তিরস্কার করলেন, কটুক্তি ও করলেন। বলেন একা সাত্যকির সাথে লড়াইতে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছো! তবে ভীম অর্জুন এদের সামনে কি করবে? সাত্যকিতো অর্জুনের শিষ্য মাত্র। দ্রোণাচার্য দুঃশাসনের চরিত্র খুব ভালো বুঝতেন। তাই তাকে বারবার বলছিলেন পাণ্ডবদের সাথে ঝগড়া মিটিয়ে নিতে নইলে অঘোরে প্রাণ যেতে পারে। এই তিরস্কারে দুঃশাসন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন, ফিরে গেলেন রণক্ষেত্রে। সাত্যকি তাকে বারবার শরজালে ঘিরে ফেলছিল। পরে তাঁর রথের ঘোড়া এবং সারথীকে মেরে ফেলে। দুঃশাসনকে মারার পরিকল্পনা ছিল না কারণ দুঃশাসনের মৃত্যু ভীমের হাতেই তোলা ছিল। ধৃতরাষ্ট্রও দুঃশাসনের জন্য ভীম কে নিয়ে ভয় পেতেন। এবং সেটা ঘটলো।

ভীম দুঃশাসনকে দেখে তীব্র বেগে ছুটলেন যেন ক্ষুধার্ত সিংহ বহুদিন পর তার খাবার দেখতে পেয়েছে। সেদিন দুঃশাসনও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিল না। ধনুক নিয়ে যুদ্ধ চলাকালীন শ’য়ে শ’য়ে বাণ নিক্ষেপ করেছেন। কিছুক্ষণের জন্য ভীম অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন। সংজ্ঞা ফিরে পেতেই আবার সেই যুদ্ধ। ভীম নিরুপায় হয়ে একটি শক্তি ছুঁড়লেন। নেভার আগে প্রদীপ দপ করে জ্বলে ওঠে। এই যুদ্ধে জোশ যেন সে কথাই মনে করায়। দুঃশাসন ওই শক্তি টুকরো টুকরো করে কেটে ফেললেন। সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছে দুঃসাশন। প্রাণ সংশয় যেখানে সেখানে বোধহয় এতটাই তীব্র হয়ে উঠতে হয়। শেষমেশ ভীম তার গদা ধরলেন। গদার আঘাতে দুঃশাসন আহত হলেন, ছিটকে পড়লেন রথ থেকে। রথ ভাঙলো, বুকের বর্ম খুলে গেল, সোনার মালা ছেড়ে গেল। দুঃশাসন এবার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। ভীম গর্জে উঠছেন মনে করছেন পুরনো অপমান এবং তার ক্রোধ তুঙ্গে। বেশ তারিয়ে তারিয়ে তারিয়ে মারার মত করে কণ্ঠনালী ভেঙে দিলেন। দুঃশাসনের গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। ওই ভাঙ্গা গলায় পা তুলে ভীম তার রাগ দেখিয়ে চলেছেন।

দুর্যোধনের ভাই সে, ক্ষমতা চলে গেলে, প্রাণ চলে যেতে যেতেও মুখ থামেনা। কোন পস্তানো নেই, লজ্জা নেই, ভুল স্বীকার নেই। ক্ষীণ কণ্ঠে গলাবাজি করছেন, বলছেন এই সেই হাত যে হাতে তোমার স্ত্রীর চুল ছুঁয়ে ছিলাম। এই হাতেই করেছি, যা করেছি সবার সামনে করেছি। আবার এই হাতেই ব্রাহ্মণদের গোদান করেছি। ক্ষত্রিয়দের হত্যা করেছি, আর এই হাতেই আমি প্রিয়তমা রমণীদের পীন-স্তন মর্দন করেছি। একি মৃত্যুমুখী মানুষের গর্ববোধ নাকি আস্ফালন? যাইহোক এ তাঁর শেষ সুখযাপন বলেই ধরে নেওয়া যায় কারণ এরপর সেই চরম ঘটনা। ভীম দুঃশাসনের বুক চিরে রক্ত পান করছেন। আর তারপরেই মুণ্ডচ্ছেদ।

এ মৃত্যু অপমানের। এ মৃত্যু যোদ্ধার মৃত্যু নয়। যতটা সম্ভব অপমান করা যায় একজন মৃতুমুখী যোদ্ধাকে বা মৃত যোদ্ধাকে তার থেকেও বেশি অপমান ভীম করেছিলেন। কিন্তু শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দুঃশাসনের দম্ভের দর্পচূর্ণ হয়নি। দুঃশাসন কি তাঁর যুদ্ধক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন না? তবু মাথা নত করেননি৷ ভুল করেও থেমে যাননি। মরতে মরতেও মুখ তার বন্ধ হয়নি। কতবারই মনে হয়েছে ফাঁকা কলসির আওয়াজ বেশি। কিন্তু আওয়াজ করাই তার ধর্ম। গলা বুজে এলেও আওয়াজ তাকে করতে হবে। আর তা দম্ভের সাথেই। দুঃশাসন তো মারা গেলেন। কিন্তু ইতিহাসে থাকল তার অকারণ ফাঁপা দম্ভ ও অহেতুক বাক্যবাণ৷ ব্রাহ্মণকে গোদান করে তিনি পূন্য করতে চেয়েছিলেন। তিনি তার পাপটুকু বুঝতেন কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷ তবে ওই নৃশংস মৃত্য দেখে আমার মনে যে সামান্যতম করুণা জন্মায়নি তা নয়। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশার কাহিনী মনে করলে এই করুণাও কোথাও মিলিয়ে যায়। আবার মিলিয়ে গিয়েও কিছু থেকে যায়৷ ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু সত্যিই কি এভাবে প্রাণ নেওয়ার পর এতো ক্রোধ দেখানোর দরকার ছিল? যার চেতনাই হল না তার কাছে প্রতিশোধের কি মূল্য?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।