সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ২৫)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (উলুপি)

একবার এক ব্রাহ্মণের গোধন রক্ষা করার জন্য অস্ত্র খুঁজতে গিয়ে অর্জুন অনিচ্ছাকৃতভাবে যুধিষ্ঠির ও দ্রৌপদীর শয়ন কক্ষে ঢুকে পড়েন । এদিকে দাম্পত্য জীবন সংক্রান্ত পূর্ব নির্ধারিত কিছু নিয়ম অনুযায়ী এই কাজ যে করবে তার শাস্তি হিসেবে বরাদ্দ থাকবে বারো বছরের ব্রহ্মচর্য জীবন। অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও ভুলতো ভুলই। তাই অর্জুনকেও পালন করতে হয় বারো বছরের ব্রহ্মচর্য। এই সময়টা তিনি হরিদ্বারে গঙ্গা তথা ভাগীরথীর কাছাকাছি জায়গায় একটি আশ্রমে অস্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। আর নদীতে স্নান করতে আসতেন। এদিকে উলুপি এবং তার সঙ্গী সাথীরা মাঝেমধ্যেই জলের নিচের নাগলোক থেকে বেরিয়ে উপরে আসতেন নদীতীরবর্তী মহাদেবের মন্দির দর্শন করতে। দর্শন হয়ে গেলে মাটির স্বাদে নিজেদের পুনর্জীবিত করে ফিরে যেত। এরকমই একদিনেই তার বন্ধুরা অর্জুন কে প্রথম দেখতে পায় এবং সেই খবর নিয়ে গিয়ে উলুপিকে দেয়। অর্জুনের রূপ ও সৌন্দর্যের বর্ণনা শুনে উলুপি নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে সেই সুদর্শনের খোঁজে নাগলোক থেকে বেরিয়ে ভাগীরথীর ওপরে এসেছিলেন।

তখন প্রায় সূর্যাস্তের সময়, অর্জুন তার নিত্য সান্ধ্য-স্নান ও পরবর্তী মহাদেবের ধ্যান করতে ভাগীরথীতে এসেছেন। উলুপি নিজেকে অদৃশ্য করে অর্জুনের পৌরুষ সৌন্দর্য উপভোগ করতে থাকলো। সুঠাম চেহারা, কাঁধে ধনুকের দাগ দেখলেই যেন মনে হয় নিয়ম-নিষ্ঠায় যোগাভ্যাস করা শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ। সেই মুহূর্তে উলুপির মনে নানান দোলাচল দেখা যায়, তবে তার বৈধব্যের কথা ভোলেনি সেই মুহূর্তেও। নিজেকে বারবার জিজ্ঞেস করেছেন তার এই বৈধব্যের কারণ কি আর্যাবর্তের সবচেয়ে কাঙ্খিত এবং শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাকে ভালবাসতে বাধা দিতে পারে? কিন্তু মুগ্ধতা এতই তীব্র ছিল যে সবকিছুই থিতিয়ে যাচ্ছিল। তিনি যেকোন প্রকারেই অর্জুনকে পেতে চেয়েছিলেন। অন্তত এক রাতের জন্য। উলুপি বলে কয়ে নাগলোকে নিয়ে যেতে পারবে কি পারবে না সেই চিন্তায় সময় নষ্ট না করে সরাসরি মায়াময় শক্তির প্রয়োগে অর্জুনকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে নিয়ে গেলেন। খানিক পরে যখন অর্জুন জেগে উঠলো তখন সে বুঝতে পারল পরিচিত জায়গায় নেই। তবে সে যে সুরক্ষিত সে কথা বলেছিল। কারণ উলুপি কোন রকম বদ আচরণ করেননি। অর্জুন এমন বিচিত্র আচরণের কারণ জানতে চাইলে উলুপি অত্যন্ত বিনয় ও সততার সাথে উত্তর দেন,

তম মামানা~নাগমথিতাম ত্বকররিতে কুরুনন্দনা |
অনন্যাম নন্দয়স্বাদ্য প্রদঅনেন আত্মনো রহঃ ||

— হে কুরু জাতি, তোমার জন্য কামনার দেবতার দ্বারা আমি যেভাবে পীড়িত হয়েছি, আজ আমার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে আমাকে তুষ্ট কর।

অর্জুন তখন তাকে জানায় যে সে আসলে বারো বছরের ব্রহ্মচর্যে রয়েছে। এই ব্রহ্মচর্যের হেতু স্পষ্ট উল্লেখ করেন। সাথে তার দ্বিধান্বিত মনের কথা জানিয়ে দেন। কিন্তু উলুপি নাছোড়বান্দা। অন্তত এক রাতের জন্যও যদি তিনি তাকে স্বামী রূপে পেতে পারেন তবে তার জীবন ধন্য হবে এমনটা মনে করছিলেন। অর্জুন কে বোঝানোর মত করে যুক্তি সহযোগে বললেন, এই নির্বাসন শুধু মাত্র দ্রৌপদীর জন্য। সেই ব্রত থেকে উদ্ভূত কর্তব্য পালন করছেন তিনি। এই অনুনয় মেনে নিলে তাঁর সদগুণের কোন ক্ষয় হবে না। সাথে এও বলেছিলেন, “হে বৃহৎ চক্ষুর অধিকারী, দুর্দশাগ্রস্তকে উপশম করা কর্তব্য। আমাকে উপশম করে তোমার পুণ্যের কোন কমতি হয় না। হে অর্জুন, যদি তোমার পুণ্যের সামান্য হ্রাস ঘটে, তবে তুমি আমার জীবন রক্ষা করে মহাপুণ্য অর্জন করবে। হে পার্থ, তোমার উপাসক হিসেবে আমাকে জান! অতএব, আমার কাছে নিজেকে সমর্পণ কর! এভাবে না চললে জেনে রেখো আমি নিজেকে ধ্বংস করব। হে পরাক্রমশালী অস্ত্র, আমার জীবন রক্ষা করে মহান যোগ্যতা অর্জন করুন।’

যথেষ্ট বুদ্ধিমতী উলুপি তার কথার জালে ও যুক্তিতে অর্জুনকে কাবু করার জন্য যথেষ্ট ছিলেন। এতগুলো কথার মধ্যে দুটো কথায় অর্জুন মোহিত হয়ে গিয়েছিলেন এবং যুক্তিও খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রথমত এই বারো বছরে নির্বাসন শুধুমাত্র দ্রৌপদীর জন্য, অর্থাৎ দ্রৌপদী থেকে দূরে থাকা। দ্বিতীয়ত, অর্জুন তাকে প্রত্যাখ্যান করলে সে জীবন উৎসর্গ করবে।
আর অন্য কোন কিছুই না ভেবে অর্জুন তাকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে উলুপিও নিজের বৈধব্যদশা লুকিয়ে যায়নি। অর্জুনের সেসব নিয়ে কোন মাথা ব্যাথাও ছিল না। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উলুপির জীবন রক্ষা করা। তবে উলুপির রূপে যে সে একেবারেই মোহিত হয়নি সে কথা অনস্বীকার্য। অর্জুন যখন ফিরে আসছিল তখন উলুপী তাকে বর দিয়েছিলেন যে, জলের ভেতর তিনি অজেয় হবেন এবং জলচরেরা সবাই ওঁর বশীভূত থাকবে।

এরপর উলুপির পুত্র ইরাবানের জন্ম হয়। যেহেতু তিনি পরপূর্বা ছিলেন তাই ইরাবান ওঁর পূর্বপতির ক্ষেত্রজ পুত্র হিসেবেই পরিচিত হয়। এদিকে অর্জুন ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে গেল। এরপর পাণ্ডবরা তাদের রাজ্য হারিয়ে বনবাসী হয়ে ছিলেন৷ এরমধ্যেই অর্জুন দিব্যস্ত্রের জন্য স্বর্গে গিয়েছিলেন। এখানেই ইরাবনের সাথে দেখা হয়। অর্জুন তাকে ভালোবাসার সাথে সাদরে গ্রহণ করেন এবং আসন্ন মহাযুদ্ধে যোগদান করার জন্য আহ্বান করেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অষ্টম দিনে অলম্বুষা অসুরের সাথে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে ইরাবনের বীরগতি প্রাপ্তি হয়।

উলুপি দূরে থাকলেও অর্জুনের সমস্ত খবরই রাখতেন। কুরুক্ষেত্র যদ্ধ যখন শেষ হল তখন পিতামহ ভীষ্ম শরশয্যায়৷ মহাযুদ্ধের দশম দিনে শিখণ্ডী কে সামনে রেখে অর্জুন আঘাত করেছিলেন ভীষ্মকে এবং শায়িত করান তীরের শয্যায়৷ ভীষ্ম উত্তরায়ণের অপেক্ষায় দেহত্যাগ করেন। তিনি ছিলেন অষ্টম বসু৷ বশিষ্ঠমুনির অভিশাপে তিনি গঙ্গাপুত্র হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন পৃথিবীতে৷ তাঁর এই শরশয্যার কারণে, তাঁর শারীরিক কষ্টের কারণে বাকি বসুরা ও গঙ্গাদেবী অর্জুনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে অভিশাপ দিয়েছিলেন নরকবাসের৷ উলুপি এই অভিশাপ শুনেছিলেন। তাঁর পিতা কৌরব্যের কাছে এই শাপমোচনের অনুরোধ করেন। কোন স্ত্রী চাইবে তার স্বামী নরকবাসী হোক? কৌরব্য বসুগণের কাছে অনুরোধ করলে বসুগণ বলেন, অর্জুন তাঁর নিজপুত্র বভ্রুবাহনের তীরে পরাস্ত হয়ে রণভূমিতে শায়িত হলে নরকবাস থেকে মুক্তি পাবে। এ কথা অর্জুন জানতেন না। কিন্তু উলুপি জানতেন। পরবর্তীতে অশ্বমেধ যুদ্ধের শেষে যখন অর্জুন আবার বিশ্ব জয়ের উদ্দেশ্যে বেরলেন আর পৌঁছোলেন মনিপুরে, তখন বভ্রুবাহন তাঁর সাথে যুদ্ধ না করে সমাদর ও সম্মানের সাথে দেখা করেন। অর্জুন যদিও খুব একটা পছন্দ করেননি বিষয়টা। কারণ তিনি ভেবেছিলেন পুত্র তার পিতার সাথে সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করে নিজেকে প্রমাণ করবে৷ পরমুহূর্তে উলুপি বভ্রুবাহনকে নিজের পরিচয় দিয়ে একপ্রকার বাধ্য করেছিলেন অর্জুনের সাথে যুদ্ধ করার জন্য। উলুপি জানতেন এই যুদ্ধ না হলে শাপমোচন হবে না কিছুতেই৷ এবং হলও তাই। বভ্রুবাহনের তীরে আহত হয়ে অর্জুন মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তখন উলুপি তাঁর পিতার কৌরব্যের কাছ থেকে সঞ্জিবনী-মণী এনে অর্জুনকে সুস্থ করে বসুগণের শাপ থেকে মুক্ত করেন এবং সবাইকে তা জানিয়ে দেন।

অতএব এ কথা স্পষ্ট অর্জুনেরও অভিশাপ খন্ডানোর দরকার ছিল। পিতামহ ভীষ্মকে শরশয্যায় শায়িত করা হবে এই পরিকল্পনা পূর্ব নির্ধারিত ছিল। সেক্ষেত্রে অন্যান্য বসুগণ সহ গঙ্গাদেবী ক্রোধিত হবেন এবং রোষের বশে কঠিন অভিশাপ দেবেন তা আন্দাজ করা যায় আগে থেকেই। যার ফলে একটা সাহায্যপূর্ণ হাতের প্রয়োজন তো ছিলই। আমার ধারণা এই কারণেই উলুপি চরিত্রটির প্রয়োজনীয়তা। আর এভাবেই ধর্ম স্থাপনের মহাযজ্ঞে উলুপিও অংশগ্রহণ করেছিলেন।

তবে অর্জুন কখনোই নিজের কর্তব্য থেকে সরে যাননি। তিনি যে মহান হৃদয়ের মানুষ তা উলুপিকে বিবাহ করার সময়ই স্পষ্ট হয়েছিল। আবার অশ্বমেধ যজ্ঞের পরে তিনি যখন তার সমস্ত স্ত্রী এবং জীবিত পুত্রদের আহ্বান করলেন রাজপ্রাসাদে থাকার জন্য তখন উলুপিকেও বঞ্চিত করেননি। তিনিও পেয়েছিলেন সেই রাজসুখ৷ উলুপি অর্জুনের জন্য যা করেছেন অর্জুন এটুকু না দিলেই হয়তো পুরুষত্বে কালি চড়তে পারতো। কিন্তু মহাকবি বেদব্যাস সেই দিকে যথেষ্ট নজর রেখেছিলেন। আর অর্জুনের প্রতি উলুপির ভালোবাসাও প্রশংসনীয় বটে। তিনি যেভাবে অর্জুনের প্রতি যত্নশীল তা আলাদা করে উল্লেখ না করে পারা যায় না।
এমত অবস্থায় মহাপ্রস্থান পর্যন্ত উলুপি অর্জুনের রাজপ্রাসাদে ছিলেন। পঞ্চপাণ্ডব মহাপ্রস্থান এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলে উলুপি ফিরে যায় তার নাগলোকে।

ভালোবাসা প্রেম যে শুধুমাত্র কায়েম করার জন্য তা নয়। যেভাবে উলুপি উদগ্রীব হয়ে বুদ্ধি প্রয়োগ করে অর্জুনকে জীবনে পেয়েছিলেন তার মর্যাদা তিনি রেখে গেছেন। তেমন অর্জুনও এক বিধবা নারীকে নির্দ্বিধায় বিয়ে করে তাঁর জীবন রক্ষা করে সুখী ভবিষ্যৎ দিয়ে যে তৎকালীন সমাজে নিদর্শন সৃষ্টি করেছিলেন তা এত বড় মহাকাব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে আমি মনে করি। ভালোবাসা তো আর এমন না শুধু দেওয়া বা শুধু নেওয়া। দেওয়া-নেওয়া দুইই থাকবে। তবেই তো সম্পর্কের স্বার্থকতা। উলুপির বিরাট কিছু চাহিদা ছিল না। অর্জুন স্বেচ্ছায় যা দিয়েছেন তাই হাসিমুখে নিয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন সারাজীবন। উলুপি চরিত্রেই এই একাগ্র নমনীয় দিকটিও বেশ প্রশংসনীয়। তবে এত কিছুর পরেও উলুপি কিন্তু বিশেষ ভাবে স্থান পায়নি মহাভারতের গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠায় বা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের সারিতে৷ তার বাকি জীবন বা অর্জুনকে ছাড়া জীবন সম্পর্কে খুব বেশি আলোকপাত করেননি মহাকবি বেদব্যাস৷ ততটুকুই আছে যতটুকু না রাখলে নয়। এই বিষয়টিই উলুপি চরিত্রটিকে উপেক্ষিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।