সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ১৭)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (ঘটোৎকচ)
এদিকে হিড়িম্বার ভাই হিড়িম্ব অস্থির হয়ে বোনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। দেখে বোন এক সুন্দরী নারীর ছদ্মবেশে ভীমের সাথে কথা বলছে৷ এবং কথা বলার ভঙ্গিতে বুঝে নিতে তার অসুবিধে হয় না যে হিড়িম্বা প্রণয় নিবেদন করছেন৷ এ হেন অবস্থায় অত্যন্ত রাগ হওয়াটাই খুব স্বাভাবিক। হিড়িম্ব বোনকে শাসাতে শাসাতে ছুটে আয় আর ওমনি শুরু হয় ভীম ও হিড়িম্বর যুদ্ধ৷ ভীম শক্তিমান৷ কিছু সময় লড়াইয়ের পর তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়৷ আর প্রমান করে সে তার পরিবারকে রক্ষা করার জন্য একাই যথেষ্ট৷ এর পর পান্ডবরা বন ছেড়ে এগিয়ে যেতে থাকে৷ ভীমের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করতে কেউ ভোলেন না৷ এদিকে হিড়িম্বা নাছোড়বান্দা৷ সোজা গিয়ে পড়ে কুন্তীর পায়ে৷ অনুনয়-বিনয় করে৷ ভীম যেন তার চাইইই। কুন্তী শেষমেশ বলে যে নিয়ে যাও ভীমকে তবে রাতে সে যেন মা ও ভাইদের সাথে চলে আসে৷ হিড়িম্বা রাজী হয়।
হিড়িম্বার রাজী হওয়াই বড় কথা নয়, এখানে ভীমের মতামতটাও অনেক বেশি জরুরী। ভীম বলেছিল সন্তান জন্ম নেয়া পর্যন্তই ভীম হিড়িম্বার সাথে থাকবে। সেই কথা মতই বেশ কিছুদিন হিড়িম্বার সাথে বরফে ঢাকা পাহাড়, বহমান নদী, ঘন জঙ্গল ইত্যাদি জায়গা জুড়ে থেকেছেন। এই সময় পাণ্ডবরাও বনমধ্যে পাস করতেন। কয়েক মাসের মধ্যে হিড়িম্বা পুত্র সন্তান জন্ম দেন। যেহেতু রাক্ষস সন্তান তার শৈশব বলতে কিছু ছিল না। জন্মানোর পরেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়। জলের পাত্রের মতো চুল বিহীন মাথা অর্থাৎ টাক ছিল বলেই তার নাম হয় ঘটোৎকচ। মিমের কথা হিড়িম্বা ভোলেনি, সে জানতো পান্ডবদের সাথে কাটানোর তার সময়সীমা শেষ। ঘটোৎকচ পান্ডবদের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যখনই তাদের প্রয়োজন হবে এবং ডাক দেবে ঘটোৎকচ সাথে সাথেই উপস্থিত হবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। এরপর পাণ্ডবরা দক্ষিণে অগ্রসর হয় এবং ঘটোৎকচ থাকে তার মায়ের সাথে।
মহাভারতে ঘটোৎকচের জন্ম কাকতালীয় মনে হলেও আসলে কাকতালীয় নয়। কারণ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে যখন ঘটোৎকচের উপস্থিতির প্রয়োজন হয়েছিল তখন এটা প্রমাণিত হয় ঘটোৎকচের জন্মানোটা পান্ডবদের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। কেন এতোখানি জরুরী ছিল সেটা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিয়ে একটু আলোচনা করলেই আমরা বুঝতে পারবো।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে যখন কৌরবরা সমস্ত বীর যোদ্ধায় পরিপূর্ণ তখন পান্ডবদের বল প্রয়োগের থেকেও বেশি বুদ্ধি প্রয়োগ এবং রণনীতি প্রয়োগের প্রয়োজন পড়েছিল। আর সেই রণনীতির জন্য মাথা হয়ে বসে ছিলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণ সবটাই জানতেন কৌরবদের কাছে পান্ডবরা কতখানি শক্তিশালী। তিনি জানতেন কর্ণের কাছে কি অস্ত্র আছে অর্জুন এর কাছে কি অস্ত্র আছে। অর্জুনের দুর্বলতা কোথায় আর কর্ণের দুর্বলতা কোথায়। অর্জুনকে মেরে ফেলার বা রণক্ষেত্র থেকে সরিয়ে ফেলার একমাত্র অস্ত্র কর্মের কাছে ছিল, তাহলো স্বয়ং ইন্দ্রদেব প্রদত্ত ভাসাভি শক্তি৷ আবার ঘটোৎকচ যে পরিমাণ শক্তিশালী ছিলেন, তিনি একাই যথেষ্ট পূর্ব কৌরবকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার জন্য। তাকে দাবিয়ে রাখা যেত কিংবা মেরে ফেলা যেত ওই ভাষাভি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। এ কথা স্পষ্ট বোঝাই যায় ঘটকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে প্রয়োজন হয়েছিল কৌরবদের মহাশক্তিশালী যুদ্ধবাজদের শেষ করে খানিকটা কোণঠাসা করা, খানিকটা ভয় ধরিয়ে দেওয়া আর কর্ণ কে দিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে ওই ভাষাভি শক্তির প্রয়োগ করা।
কুরুক্ষেত্রের অষ্টম দিনে কৌরব পক্ষের রাক্ষস অলম্বুষ অর্জুনপুত্র ইরাবনকে মেরে ফেলে। পাণ্ডব কৌরবদের যুদ্ধে ঘটোৎকচ যে পান্ডবদের পক্ষ নেবে এ কথা আলাদা করে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। সে তার সম্পূর্ণ রাক্ষস বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হয়। নিজের ভাইয়ের মৃত্যু দেখে স্বভাবতই বাকিদের মতো কষ্ট পান এবং ক্ষোভে ফেটে পড়েন। রাক্ষসের ক্ষোভ দেখে কৌরবদের সেনারা ভয় পেলেও দুর্যোধন সাহসের সঙ্গেই মোকাবিলা করতে প্রস্তুত হয়। এগিয়ে দেয় বঙ্গের রাজা ও তার হাতি বাহিনীদের। ঘটোৎকচের শক্তির কাছে এগুলো যেন কিছুই না। কিন্তু দুর্যোধন যখন ঘটোৎকচের চারটি রাক্ষসকে হত্যা করেন: ভেগাবত, মহারৌদ্র, বিদ্যুৎজিহভা এবং প্রমথি। প্রতিশোধ হিসেবে ঘটোৎকচ দুর্যোধন ও বঙ্গের রাজাকে তীর দিয়ে ঢেকে দেন।
ঘটাত করছিলেন জাদুতে ওস্তাদ। মায়াজাল তৈরি করতে পারত এবং দিনের থেকে রাতে তার শক্তি দ্বিগুণ হয়ে উঠতো। ঘটোৎকচের সুরক্ষা সাহায্যের জন্য অভিমুন্য, ভীম খবিস কিছু সৈন্যরা এগিয়ে আসে।
ঘটোৎকচের সাথে অশ্বথামা, অম্বলুষা, নানান ভাবে ভয়ংকর যুদ্ধ ঘটেছিল। কখনো ঘটোৎকচে এগিয়ে যাচ্ছেন আবার কখনো পিছিয়ে। অসৎ তোমার কাছে বেশ কিছুটা আহত হয়ে গেছিল। কিন্তু সর্বশেষ হিসেবে কর্ণের সাথে যুদ্ধ হয়। সে ভয়ানক যুদ্ধ। নানান ভাবে নানান মায়াজাল তৈরি করে কখনো অদৃশ্য হয়ে, কখনো পাহাড় হয়ে, কোন মেঘ হয়ে কর্ণের প্রতি আঘাত হানতে শুরু করে ঘটোৎকচ৷ কর্ণ সহজে হেরে যাওয়ার মানুষ নয়। প্রতিটা আঘাতের প্রত্যাঘাত করতে থাকে এবং ঘটোৎকচকে সমানে সমানে টক্কর দিয়ে গেছেন। এভাবে ঘটোৎকচকে হারানো প্রায় অসম্ভব ছিল। কৌরবদের রথি মহারথীরা বেশ ভয়ই পেয়েছিলেন। দুর্যোধনও ভয়ে অস্থির হয়ে উঠেছিল। অনেকটা অধৈর্য হয়ে কর্ণকে এক প্রকার বাধ্যই করেছিলেন ওই ইন্দ্র প্রদত্ত শক্তি প্রয়োগের জন্য। কর্ণ যখন বারবার বলছেন ওই শক্তি প্রয়োগ করলে অর্জুন কে কখনোই মেরে ফেলা যাবে না তখনো দূর্যোধন শোনার অবস্থায় নেই। ঘটোৎকচের রাক্ষুসে যুদ্ধ থেকে খানিকটা বেঁচে যাবার জন্য তাকে মেরে ফেলা জরুরি ছিল বলে দূর্যোধন মনে করেছিলেন।
তবে ঘটোৎকচ জানতেন তিনি মারা যাবেন। যখন কর্ণ ভাষাভি শক্তি প্রয়োগ করলেন ঘটোৎকচ ভয় না পেয়ে চূড়ান্ত আক্রমণ হিসাবে, একটি পর্বত রূপে বেড়ে ওঠেন। তীর তাকে আঘাত করলে সে নিচে পড়ে যায়। কৌরব সৈন্যদের একটি সম্পূর্ণ অক্ষৌহিনী তার নীচে মারা যায়। এভাবে মৃত্যুকালেও তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। একেই বলে বীর যোদ্ধা। তবে ঘটোৎকচকে মেরে ফেলার পর কর্ণ নিশ্চিত হয়েছিল তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।
এই যুদ্ধক্ষেত্র যেন দাবা খেলা কিংবা পাশা খেলা। যে পাশা খেলায় হারিয়ে শকুনি পান্ডবদের লেজে গোবরে অবস্থা করেছিল সেই পাষানীতির মতনই ধুরন্ধর রণনীতি সাজিয়ে শ্রীকৃষ্ণ পান্ডবদের জয় নিশ্চিত করেছিলেন। দাবা খেলায় আমরা যেমন হিসেব করে চলি কার জন্য কোন ঘুটিকে খানিকটা এগিয়ে দিতে হবে আবার কার জন্য কাকে পিছিয়ে দিতে হবে সেই একই নীতি প্রয়োগ করে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সাজিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। শকুনি বশীকরণ মন্ত্র প্রয়োগে পাশার ঘুঁটিকে নিজের কথা শোনাতে পারলেও যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি আসলেই নির্বোধ অথবা তার উদ্দেশ্যই ছিল কৌরব ও পান্ডবদের এভাবে ধূলিসাৎ করা। কিন্তু সত্যিই জয় আটকানো কার সাধ্য। যেখানে শ্রীকৃষ্ণ সারথি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধনীতি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা এই কথা বলতে পারি অভিমুন্য কিংবা ঘটোৎকচ কয়েক পা পিছিয়ে দীর্ঘ লাফ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মত নীতি প্রয়োগ কিংবা দাবার চাল।
ঘটোৎকাজ যে অত্যন্ত বীর তা শুধুমাত্র কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ দিয়ে প্রমাণ হয় না। দৈত্য মুরার কন্যা কামাকান্তকাকে বিবাহের ঘটনাও প্রমান করে ঘটোৎকচ একজন বীর ক্ষত্রিয়। কামাকান্তকা শর্ত রেখেছিলেন তাকে যুদ্ধে যে পরাজিত করবে তাকেই তিনি বিয়ে করবেন। অনেক রাক্ষস অসুর তাকে বিয়ে করবে বলে এসেছিল এবং প্রত্যেককেই কামাকান্তকা পরাজিত করেছিল। শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন ঘটোৎকচ কিন্তু পারবে জয়ী হতে৷ সেও এক যুদ্ধক্ষেত্র ছিল ঘটোৎকচের জন্য। প্রাগজ্যোতিষের প্রাসাদ৷ সেখানে কামাকান্তকার ঘরে গিয়ে তাকে গল্পের ছলে বশ করার চেষ্টা করে। কিন্তু কামাকান্তকা যুদ্ধের আশ্রয় নেয়৷ ঘটোৎকচকে পরাজিত করার জন্য রাক্ষসকে তৈরি করেছিলেন। সে তার নিজের রাক্ষস দিয়ে তাদের ধ্বংস করেছিলেন। কামাকান্তক তখন তার তলোয়ার নিয়ে গেলেন, কিন্তু ঘটোৎকচ তাকে ধরে ফেললেন। মাটিতে ফেলে তার ঘাড়ে পা রাখলেন এবং কামাকান্তক আত্মসমর্পণ করলেন ।
পরবর্তীতে পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী কামাকান্তকা ঘটোৎকচকে ইন্দ্রপ্রস্থে নিয়ে যান। সেখানে তাদের বিয়ে হয়। পরবর্তীতে নবদম্পতি তখন রাক্ষস বনে চলে যান। ঘটোৎকচা আর কামাকান্তকা একসঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছেন। তাদের একটি পুত্র ছিল, বারবারিক। জন্মের সাথে সাথেই সে বড় হয়ে মানুষ হয়ে ওঠে। পরে তাদের অঞ্জনা পার্ব নামে আরেকটি পুত্র সন্তান হয়। বারবারিক একটি আশ্চর্য চরিত্র৷ যার চরিত্রায়ন করলে বোঝা যায় ঘটোৎকচকে বারবরিকের জন্মের মাধ্যম হিসেবেও অত্যন্ত জরুরি ছিল৷ কেন তা নিয়ে অন্য কোন পর্বে আলোচনা করব৷ আপাতত বলি ঘটোৎকচও মহাভারত নামক বৃহৎ ঘরের একটি অতিপ্রয়োজনীয় ইট। যার জন্ম বিবাহ এবং পরিণতি সবটাই ধর্ম স্থাপনের পথে হাতে হাত রাখার এক একটা ধাপ৷ কারণ যে কোন নীতিপরায়ণ কাজ একা একা কোন ভাবেই সম্ভব না৷ প্রতিপক্ষ শক্তিশালী কিংবা দূর্বল তা বিচারের আগে তারা প্রতিপক্ষ। আর কুরুক্ষেত্র যুদ্ধক্ষেত্রেতো সকলেই বীর৷ তাই জোট বদ্ধ পরিকল্পনার প্রয়োজন শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷