সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ২৭)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (জয়দ্রথ)

কাম্যক বন সরস্বতী নদীর ধারে অবস্থিত ছিল। বেশ ঘন বন, এখানে না ছিল রাজপথ না বণিক পথ৷ তবে পুণ্যতোয়া সরস্বতীর কারণে নানান মুনি ঋষি বা ব্রাহ্মণ যাতায়াত করতেন। এই স্বল্প পদচারণের ফলে বৃহৎ রাস্তা না থাকলেও একটা সংকীর্ণ রাস্তা তৈরি হয়েছিল যে রাস্তা শ্বাল্য-দেশে কম সময়েই পৌঁছে দেয়। জয়দ্রথের যাত্রাকাল যাতে কম সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয় তাই এই পথ অবলম্বন করেছিলেন। এদিকে পান্ডবরাও এখানে তাদের বসবাসের জন্য পর্নকুটির নির্মাণ করেছিলেন এই ভেবে যে, সাধারণ জনপদ ও কোলাহল থেকেও একটু দূরে থাকা যাবে, আর প্রয়োজনে কম সময়ে অন্য রাজ্যেও যাওয়া যাবে।

জয়দ্রথ পাড়ি দিচ্ছেন, আর মুণিঋষিরাও নিজে নিজে কাজে ব্যস্ত। দ্রৌপদী তখন পর্নকুটিরের দরজা ধরে বাইরের প্রকৃতি দেখছেন আর হারিয়ে যাচ্ছেন নানান ধরনের চিন্তায়। বনের মধ্যে সচরাচর কারো তো পদচরণ শোনা যায় না, তাই অল্পেই সে সজাগ হয়। জয়দ্রথ ভাবতে পারেননি এমন ঘন জঙ্গলের ভেতর কোন নারীকে সে দেখতে পাবে কিংবা কোন কুটির থাকবে। আকাশে যখন বিদ্যুৎ চমকায় আমরা চাই বা না চাই আমাদের চোখ কিন্তু সেদিকেই চলে যায় ঠিক সেই ভাবেই জয়দ্রথও দ্রৌপদীকে দেখতে পেয়েছিলেন। ‘তিষ্ঠন্তীম্ আশ্রমদ্বারি দ্রৌপদীং নির্জনে বনে!’

এখানে দ্রৌপদীকে শুধু যে জয়দ্রথ দেখেছিলেন তা নয়। জয়দ্রথীর সৈন্য সমেত সাথে যারা ছিল তারাও দেখেছেন। তবে দ্রৌপদীকে চিনতে না পেরে প্রথমে ভেবে ফেলেছিলেন যে এটি স্বর্গের কোন দেবতার মায়া, যে জাল পেতে বা ফাঁদ পেতে তাদের ধরার চেষ্টায় আছে। তবে জয়দ্রথ ঠিকই বুঝেছিলেন যে ইনি পাণ্ডব ভার্জা দ্রৌপদী। দ্রৌপদী সে যুগে ভারতবর্ষের মধ্যে সবথেকে সুন্দরী নারী ছিলেন। তাকে দেখে জয়দ্রথের কাম নিজের অধীনে থাকলনা। ভোগ করার জন্য উদ্ধত হন। এই চরিত্রটির এই দিকটি উল্লেখ করে আমার মনে হয়েছে মহাকবি দেখিয়েছেন, সেই যুগের নয় যুগে যুগে পুরুষের ভেতর যে একটি জানোয়ার ঘুমিয়ে থাকে এবং প্রয়োজনে তা জাগতে পারে, অশ্লীল হতেও তাদের বিবেকে বাঁধে না। সত্যিই তো এমন পুরুষ আমরা অনেক ক্ষেত্রেই দেখি যারা কোন নারীর মন, গুণ কিংবা ইচ্ছে- অনিচ্ছের কথা না ভেবে সরাসরি নিজের কামুক স্বভাবকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জয়দ্রথও অনেকটাই এই ধরনের পুরুষ। দ্রৌপদীকে দেখেও তার একই রকম অনুভূতি। তার বন্ধু রাজা কোটিকাস্যকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে তিনি যেন জেনে আসতে পারেনন। “কস্য ত্বেষানবদ্যাঙ্গী যদি বাপি ন মানুষী?”
এখানে জয়দ্রথের বিশেষ একটা যে জানার বা শোনার প্রয়োজন ছিল তা নয় কারণ তিনি যাচ্ছিলেন বিবাহ করতে। তবুও লোভ তো তা থেমে যাওয়াটা খুবই কঠিন। যে কারণে তিনি কোটিকাস্যের কাছে বলেছিলেন ‘বিবাহার্থো ন মে কশ্চিদিমাং প্রাপ্যাতিসুন্দরীম।অর্থাৎ রাস্তার মধ্যে যদি এমন সুন্দর এক মেয়েকে দেখতে পাওয়া যায় তবে তার আর কি প্রয়োজন দূর দেশে গিয়ে বিবাহ করে আনার । জয়দ্রথের কিছু কিছু মন্তব্য বারবার বলে দেয় সে কোনরকম সম্মান আদানপ্রদানের জন্য আসেনি। তবে রূপের কদর করে তিনি বলেছিলেন ‘বরারোহা’। তিনি সরাসরি নিজে যাননি তার দুষ্টুচিত্তের সঙ্গী কোটিকাস্যকে পাঠিয়েছিলেন। তিনিও যথাসম্ভব সুব্যবহার করে দ্রৌপদীর আসল পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। ঠিক যেন শিয়াল এসে সিংহের স্ত্রী এর পরিচয় জিজ্ঞেস করছেন। সেই জঙ্গল মধ্যে সে একা কিনা তাও জানতে চেয়েছিলেন। দ্রৌপদীর জীবনে তো আর ঘটনা শেষ নেই তাই তাকে অভিজ্ঞই বলা চলে। যার ফলে দূর থেকে কোটিকাস্য ও জয়দ্রথ কে দেখে তিনি অনেকটাই অনুমান করে ফেলেছিলেন। তাই প্রথম থেকেই বেশ কঠিন হয়ে কথা বলছিলেন এবং সুযোগ বুঝে তার আসল পরিচয় বাবা এবং স্বামীদের কথা বলে পরিষ্কার বুঝিয়ে দেন যে তিনি একেবারে অসহায় বা একা নন। এও জানিয়ে দেন তার স্বামীরা সামান্য দূরবর্তী অঞ্চলে মৃগয়া করতে গেছেন। এইসব বলার পর দ্রৌপদীর মনোবল বৃদ্ধি হয় ওদেরকে কুটিরে অবস্থান করতে বলে। কোটিকাস্য এসব কথা জানানোর জন্য গেলেই জয়দ্রথ সেসব না শুনেই তিনটি কথা বলেন , এই মহিলাকে কথা বলতে দেখেই অভিভূত; তুমি কাজ না গুছিয়েই ফিরে এলে কেন? তৃতীয় কথাটাই সাংঘাতিক, দ্রৌপদীকে দেখার পর থেকেই অন্য সমস্ত স্ত্রীকে তিনি বানরীর মতো দেখছেন। এই তিনটি কথাতে আরো বেশি করে স্পষ্ট হয় জয়দ্রথের ঘৃণ্য মানসিকতার। কেউ কতখানি কামুক হলে এই ধরনের কথা বলতে পারি। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো উচ্চারণ করা মানেই কোন নারীকে না ছুঁয়ে ধর্ষণ করা। সে যুগে দাঁড়িয়ে কবি এতটা দূরের কথা ভেবেছেন এটাই আশ্চর্যজনক। তবে এই ধরনের লোক হয়তো যুগে যুগেই রয়েছে।

যখন বারবার করে বলছেন যে তিনি একবার ভালো করে দেখতে চান তখনই বোঝা যায় এ কোন মুগ্ধতা বা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ নয়। এক ধরনের মানসিক বিকার । এই বিকারগ্রস্ত মানুষই চারপাশে ছেয়ে গেছেন৷ যে কারণে সমাজ আজ ধুঁকছে।

বিকারগ্রস্ত বলছি কারণ কোটিকাস্য’র থেকে শোনার পরেও তিনি যখন দ্রৌপদীর পর্ন কুটিরে পৌঁছলেন তখন একেবারেই না জানার ভান করে গেলেন। পরিচয় পর্ব শেষে দ্রৌপদী ও বুঝলেন যে ইনি তার পারিবারিক আত্মীয় বটে। তবে আত্মীয় হবার সম্মান জয়দ্রথ রাখতে পারেনি বেশিক্ষণ। সরাসরি শারীরিক প্রস্তাব দেন এবং বিবাহের কথা বলেন। দ্রৌপদী যেহেতু ভুক্তভোগী তাই সরাসরি চিৎকার করাই তার কাছে সহজ উপায় ছিল বাঁচার। চিৎকার শুনে তার পাঁচ স্বামী তৎপর হয়ে ফিরে আসছে আর জয়দ্রথও বেগতিক দেখে পালিয়ে যেতে উদ্ধত হলেন। সামান্য দূরেই ভীমের হাতে ধরা পড়ার কারণে তার পালানোর চিন্তাভাবনা বানচাল হয়ে গেল। ভীম হয়তো তাকে সেই জায়গায় মেরেই ফেলত কিন্তু জয়দ্রথের পূর্ণ পরিচয় পাওয়ার পর, যুধিষ্ঠির ক্ষমার চোখে দেখলেন এবং দাসত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়ার থেকে মুক্তি দিলেন৷

দুষ্টের দমন যেন সহজে হয় না। এই লোলুপ পুরুষ যেমন মেয়েদের চারপাশে সারাক্ষণ ঘুরঘুর করে এমনি কিছু মানুষ এমনও আছে যারা রক্ষা করার জন্য ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তবে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছতে পারি কি? জয়দ্রথের ক্ষেত্রে তা ঘটেছিল। আজকের দিনে আর ঘটে না।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।