সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ২১)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (উত্তরা)
মহাভারতের অনেকগুলো চরিত্র নিয়েই কাটাছেঁড়া করে ফেললাম। তার মধ্যে বেশ কিছু চরিত্র অবহেলার চরিত্র। এই যেমন বর্বরিক আগের পর্বে লিখেছি, তার সমস্ত শক্তি থেকেও সে বীর নয়। এইসব ভাবতে ভাবতেই আমার হঠাৎ উত্তরার কথা মনে পড়ে। নরম তুলতুলে এক রাজকন্যা সে যেন অবহেলার জন্যই জন্মেছে, যেন দুঃখবিলাসই তার জীবন। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর অমূল্য সৃষ্টি মহাভারতে এরকম বেশ কিছু চরিত্রই রেখে গেছেন যারা প্রচন্ডভাবে অবহেলিত হয়েছে। শুধু সাহিত্যের ক্ষেত্রে ধরলে অন্যায় বিচার হয়েছে এটা বলাই যায়, কিন্তু যদি আমরা বাস্তবিক জীবন ধরি, তবে দেখতে পাই আমাদের আশেপাশে এরকম অনেক মানুষই রয়েছেন যাদের জীবনের চাকা যত ঘুরেছে তারা ক্রমাগত অবহেলিত হয়েছে, সমস্ত পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কি যেন এক অজানা অপরাধে চোখের জলে কাটিয়ে দিতে হয়েছে একটা গোটা জীবন। বলতে গেলে উত্তরাও সেরকম ধরনের একটি চরিত্র।
অর্জুনের স্ত্রী হতে হতে অভিমন্যুর স্ত্রী হওয়া মহাভারতের একটি নারী চরিত্রই হলো উত্তরা। তিনি বিরাট রাজার একমাত্র রাজকন্যা। অজ্ঞাতবাস চলাকালীন বিরাট রাজার রাজ্যে পরিচয়ে লুকিয়ে অন্যরূপে বসবাস করতেন পঞ্চপান্ডব। তারমধ্যে অর্জুন হয়েছিলেন বৃহন্নলা। শোনা যায় উর্বশীর অভিশাপেই অর্জুনের এই নপংশ রূপ। অর্জুন বিরাট রাজার রাজকন্যা উত্তরাকে বৃহন্নলা রূপে নাচ গান ইত্যাদি শেখাতেন। অর্জুন এই শিক্ষা পেয়েছিলেন গন্ধর্ব চিত্রসেনের থেকে। তাও ইন্দ্রের আদেশে।
বিরাট রাজার ছত্রছায়ায় পান্ডবদের অজ্ঞাতবাস ভালোই কাটছিল এমন সময় বিরাটরাজার সেনাপতি রাজমহিষীর ভাই কীচক দ্রৌপদীর প্রতি আসক্তি থেকে দুর্ব্যবহার শুরু করেন। সেখানে তখন ভীম সেন পাচকের ছদ্মবেশে রয়েছেন। কীচক তাঁরই হাতে নিহত হন। কি খবর কৌরবদের সভায় পৌঁছে যায়। রাজা সুশর্মা এবং কর্ণ কীচকের মৃত্যুর বদলা নিতে বিরাটরাজার গোধন হরনের চিন্তা করে বিরাট আক্রমণ করলেন। বিরাটরাজা যুদ্ধে আত্মরক্ষার কারণে এবং রাজ্যকে সুরক্ষা প্রদান হেতু কঙ্করূপী যুধিষ্ঠির, বল্লবরূপী ভীমসেন, গ্রন্থিক নামধারী নকুল ও তন্ত্রিপাল নামধারী সহদেবকে নিয়ে যুদ্ধে চললেন। কৌরবদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বীর যোদ্ধা ভীষ্ম। তারা বিরাট রাজ্যের উত্তরে আক্রমণ করেছিল। রাজ্যে তখন কেউ ছিলনা রাজপুত্র উত্তর ছাড়া। প্রতিহারই যখন তাকে খবর দিল, তিনি বললেন যুদ্ধে তিনি যেতেই পারেন যদি একটা সারথি জোগাড় করে দেয়া হয়। কে হবে এই সারথী? উত্তর আগে অনুরোধ করল বৃহন্নলা কে। ইনিয়ে বিনিয়ে এদিক ওদিক করে অর্জুন রাজি হলো। যুদ্ধের জন্য যাওয়ার মুহূর্তে উত্তরা বৃহন্নলা তথা অর্জুনকে অনুরোধ করলো কৌরব পক্ষকে পরাজিত করে তাঁদের পোশাক তাঁর পুতুল খেলার জন্য নিয়ে আসতে হবে। অতএব বোঝাই যায় এখানে উত্তরা কতখানি শিশু কন্যা সুলভ। শুধু তাই নয় তিনি তখন বয়সে অনেক ছোটও৷
যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে যেতে রাজকুমার উত্তরের কাছে অর্জুন তার পরিচয় দিলেন, ফলে উত্তর হলেন সারথী যুদ্ধের জন্য রথে দাঁড়ালেন অর্জুন। ভয়ংকর সেই যুদ্ধ চলল এবং অর্জুন কৌরবদের পরাজিত করে গোধন উদ্ধার করলেন। সম্মোহন বাণ নিক্ষেপ করে কৌরব বীর যোদ্ধাদের অজ্ঞান করে তাদের উষ্ণীষ নিয়ে আসতে পাঠালেন যুবরাজ উত্তরকে। তিনি অবশ্য বলেছিলেন ভীষ্মকে বাদ দিতে৷ যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে করতেও অর্জুন উত্তরার অনুরোধ ভোলেননি।
এই ঘটনার প্রায় তিন দিন পর পঞ্চপান্ডবসহ দ্রৌপদী তাদের অজ্ঞাতবাস শেষ করে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করেছিলেন। বিরাট রাজার কৃতজ্ঞতার শেষ ছিল না। তিনি অর্জুনকে অনুরোধ করলেন যাতে উত্তরার সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন করেন। কিন্তু অর্জুন বলেছিলেন তিনি উত্তরার কাছে গুরু সমান। বিবাহ যদি দিতেই হয় তাহলে অর্জুনের পুত্র অভিমন্যু সঙ্গে দেওয়া শোভনীয়। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির অনুমতি দিলে এই বিবাহ নির্বিবাদে সম্পন্ন হয়।
কি আশ্চর্য দেখুন কৃতজ্ঞতা স্বরূপ রাজকন্যা কে অন্যের হাতে তুলে দিল। হয়তো সেই মুহূর্তে অভিমন্যুর মতো পাত্র পাওয়াও চরম সৌভাগ্যের। তাও আমার কোথাও গিয়ে মনে হয় মেয়েরা যেন একটি বস্তুর সমান। তাকে চাইলেই ভেট হিসেবে দিয়ে দেওয়া যায়। এই মুহূর্তে উত্তরার সেই একই দশা ঘটেছিল।
এভাবেই উত্তরার আগমন ঘটে মহাভারত মহাকাব্যে। ওই শিশুসুলভ রাজকন্যা অর্জুনের পুত্রবধূ হলেন এবং সংসারে নিযুক্ত হলেন দায়িত্ববান নারীরূপে। এরপর তাকে বিশেষ একটা দেখা যায় না। তিনিও যে পান্ডব পরিবারের একজন তা নানান ঘটনায় চাপা পড়ে যায়। অথচ তিনি বিরাট রাজার একমাত্র রাজকন্যা, বড় আদুরে, ও বিলাসবৈভবে বেড়ে ওঠা ভোর৷
কুরুক্ষেত্র ত্রয়োদশ অর্থাৎ তেরো নম্বর দিনে পান্ডবদের কাবু করার জন্য কৌরববীররা চক্রব্যূহের রচনা করলেন। সেখানে অর্জুন উপস্থিত নেই। অভিমন্যু চক্রব্যূহ ভেদ করে প্রবেশ করতে জানলেও বেরতে জানেন না৷ আলোচনা করে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির জানি না কোন ধর্মের অবলম্বনে ঠিক করলেন অভিমন্যু আগে চক্রব্যূহ ভেদ করে ঢুকে যাবে পেছন পেছন বাকি রা। আসলে তারা কেউই ঢুকতে পারলেন না৷ এদিকে সারাদিন একাই লড়ে গেলেন অভিমন্যু৷ আর শেষে সপ্তরথি পরিবেষ্টিত অবস্থায় মৃত্যও বরণ করলেন৷ ওই সাত মহারথির কাছে অভিমন্যু ছিল একা, নির্ভীক৷ তাও যুদ্ধের নীতির বাইরে গিয়েই তাকে মেরে ফেলেছিল৷ উত্তরা তখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা৷
চলবে…