কর্ণফুলির গল্প বলায় নুসরাত রীপা

মন

বুমার্সে বসে আছে তনু।
শুক্রবার বেলা তিনটা।
এসময়টায় লোকজন নেই বললেই চলে।
কয়েকজন ওয়েটার আর ম্যানেজার কাউন্টারে বসে আছে। চুপচাপ।

কোণের দিকে একটা টেবিলে একজোড়া নারী পুরুষ। তাদের সামনে স্যুপের বাটি। সুনসান দোকানটিতে মাঝে মাঝে চামচের শব্দ। তাদের কথার গুনগুন।

তনুর সামনে এক কাপ কফি। ক্যাপাচিনো। কফিটার টেস্ট ভালো হয় নি। কোন একটা কিছুর ঘাটতি আছে। কিন্তু সেটা কী ভাবার মন নেই এখন। মন এখন ভয়ংকর অস্থির। আপাতদৃষ্টিতে শান্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড উত্তেজিত তনু।

একটু পর স্বরবর্ণ আসবে। রোড এক্সিডেন্টের পর দীর্ঘ এগার মাস দেশের বাইরে চিকিৎসা শেষে গত পরশু দেশে ফিরে এসেছে স্বরবর্ণ। এক্সিডেন্টে বিক্ষত আর বিকৃত হয়ে যাওয়া চেহারা কসমেটিক সার্জারি করা হয়েছে। তবে এখন স্বরবর্ণ সম্পূর্ণ সুস্থ,তনু শুনেছে
গতকাল, সন্ধ্যের পূর্ব পর্যন্ত স্বরবর্ণের ফিরে আসার কথা জানত না।

জানার কথাও নয়।
তনু ভার্সিটি পড়ুয়া একটা তরুণী। মফঃস্বলেরর মেয়ে। ঢাকায় হলে থেকে পড়াশুনো করে। ফেসবুকে পরিচিতি থেকে বড়লোকের সন্তান ব্যবসায়ী স্বরবর্ণের সাথে বন্ধুত্বের সূচনা। স্বরবর্ণ একজন নি:সঙ্গ মানুষ, কেউ তার সাথে বন্ধুত্ব করে না, সে তনুর সাথে বন্ধুত্ব করার জন্য ব্যাকুল আবেদন জানায়।এবং তনু বন্ধু হলে ক্রমশ তা গাঢ়তর হতে শুরু করে মাত্র আর তখনই রোড এক্সিডেন্ট। অফিসের কাজে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল। পথেই

স্বরবর্ণ যখন এক্সিডেন্ট করে তখন তনু ভার্সিটি ছুটির কারণে বাড়িতে ছিল। পরিচিত এক বড় ভাই এক্সিডেন্টের খবর জানিয়েছিল। বিদেশে যাওয়ার খবরও। এরপর চেষ্টা করেও তনু আর স্বরবর্ণের সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি।

প্রথম প্রথম মন খারাপ হলেও সময়ের সাথে সাথে সে মনখারাপটুকু চলে গেছে তনুর। উনিশ বছর বয়সের একটা মেয়ের বন্ধু-বান্ধবী, পড়াশোনা, আড্ডা,শপিং, সিনেমা দেখা-সমস্ত কিছুর তোড়ে অনুপস্থিত বন্ধুকে ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। একেবারে ভুলে গিয়েছিল ব্যাপারটা এমন নয়। তবে যে ভালো লাগাটুকু তৈরি হচ্ছিল, যে আবেগ আর রংয়ে মন রাঙা হচ্ছিল সেটা মুছে গেছে।

স্বরবর্ণ ফোন করেছিল গত কাল সন্ধ্যায়। তনুরা তখন পাঁচ-ছয়জন বন্ধু-বান্ধবী মিলে রোকেয়া হলের সামনে বসে ফুচকা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিল। সিনেপ্লেক্সে মুভি এসেছে, রেহানা মারিয়ম নূর, ওটা দেখতে যাওয়ার প্ল্যান করছিল। এরই মধ্যে স্বরবর্ণের ফোন।

স্ক্রিনে স্বরবর্ণের নাম দেখে ভ্রু কুঁচকে ছিল তনু। দুমিনিট কথা। দেশে ফিরে আসা, সুস্থতার কথা জানাল স্বরবর্ণ। আর আজ দেখা করতে চাইল। স্বরবর্ণে কণ্ঠস্বরে অহংকার ফুটিয়ে বলল, কাল তুমি যা সারপ্রাইজড হবে না! ভাবতেই মজা লাগছে।

বুমার্সের নামটা তনুই সাজেস্ট করেছে।
কারণ এখানে দীর্ঘসময় একা বসে থাকতেও আনইজি লাগে না। বন্ধুদের কেউ স্বরবর্ণের কথা জানত না, তনু এখনো তাই জানায়নি। দুপুরের খাবার খেয়েই টুপ করে হল থেকে বেরিয়ে পড়েছে। রুমমেট শিমুকেও বলেনি কিছু।

কফিটায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা চুমুক দিল তনু। তিনটা কুড়ি। চারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে চলে যাওয়াটা উচিত হবে।

তনু স্বরবর্ণের ফেসবুক ওয়ালে ঢুকল।
এমননিতে খুব একটা ফেসবুকে থাকেনা।
ও। বাবাকে কথা দিয়েছে ফার্স্টক্লাস পাবেই। এ কারণে মোবাইলে যতক্ষণ থাকে পড়াশোনা, ক্যারিয়ার এসব বিষয়েই বেশি সময় দেয়। এরপর একটু আধটু পোশাক আর প্রসাধনীর পেজে ঢুঁ দেয়। এটুকু তো দিতেই হবে। এই যুগের মেয়ে যে!

দীর্ঘদিন পর স্বরবর্ণের ওয়ালে ঢুকে বিস্মিত হল তনু। স্বরবর্ণের দেয়াল জুড়ে অত্যন্ত সুন্দর চেহারার এক পুরুষের ছবি। স্ক্রল করতে করতে নিচে নামতে লাগল তনু।

এক্সিডেন্টের পর থেকে প্রায় সাত মাস কোনও পোস্ট নেই স্বরবর্ণের। তারপর একটা পোস্ট আগামীকাল আমার সার্জারি প্রে ফর মি।

তারপর আবার বিরতি।

তারপর বেশ কয়টা অপারেশনের ছবি। মুখে ব্যান্ডেজ। এসব ছবি অন্য কেউ তুলে দিয়েছে। বলাই বাহুল্য।

এবং শেষ কয়টা ছবিতে ক্যাপশন দিয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ, আমি সুস্থ হয়ে গেছি। —-ফিরে আসছি খুব শীগগিরই—।

তনু ছবি গুলো দেখতে দেখতে ঠোঁট কামড়ায়। স্বরবর্ণ সুদর্শন ছিল না ভাঙাচোরা একটা চেহারা ছিল ওর। মুখে অনেক দাগ, ব্রোনের গর্ত। মোটা ভ্রু। কিন্তু যখন কথা বলত, ওর কথা গুলোই কেমন ঘোর এনে দিত মনে।

সার্জারি করে নিজের চেহারাই নিতে পারত স্বরবর্ণ কিন্তু তা না করে ও অপূর্ব সুন্দর একটা চেহারা নিয়েছে। স্বরবর্ণের চেহারা দেখে যে কেউ এখন মুগ্ধ হবে।তার অর্থের অভাব নেই, যেই অসুন্দর চেহারার কারণে বন্ধু-বান্ধবহীন বিষন্ন ছিল স্বরবর্ণের দিনগুলি, এখন আর বন্ধু-বান্ধবীর অভাব হবে না তার। তনুর মতো সাধারণ মেয়ে সে সব বন্ধু বান্ধবীর কাছে ম্লান হয়ে যাবে নিশ্চিত।

স্বরবর্ণের ওয়াল থেকে বেরিয়ে নিজের আইডিটাই ডি একটিভ করে দেয় তনু।
স্বরবর্ণের জগৎ এখন ক্রমশই বর্ণিল হয়ে উঠবে। কী দরকার এত বর্ণিল সময়ে হাত রাখার। স্বরবর্ণের সাথে দেখা করার কোন ইচ্ছে হয় না ওর।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।