T3 || ঈদ স্পেশালে || লিখেছেন নুসরাত রীপা

একটা সাধারণ গল্প

বাড়ির উঠোনে পা দিয়েই অনু দেখলো মজিদ চাচা বসে রয়েছে। উঠোনে, বিশাল কাঁঠাল গাছটার নিচে পাতা চৌকির ওপর যেখানে গরমে দিনের বেলায় শীতল পাটি বিছিয়ে দাদাজান শুয়ে থাকে।
মজিদ চাচাকে অনু পছন্দ করে না। লোকটা শহরে থাকে। মাঝে মাঝে গ্রামে আসে। আর গ্রামে এলেই সে দুইচারটা ছেলে মেয়ে শহরে নিয়ে যায়। লোকের বাড়ির কাজের জন্য। অনুর বান্ধবী লিজি, মুক্তি, কাজলকেও নিয়ে গেছে অনেক টাকা বেতনের লোভ দেখিয়ে।
অনুদের গ্রামটা বড্ড গরীব। এখানে সারে সারে অপুষ্ট অনাবাদী জমি। চাষাবাদ আর নদীর নাছ ধরে কোনমতে জীবনধারণ করে এলাকার মানুষ। কর্মসংস্থানের অভাব। শিক্ষিতের হার কম। অভাবের তাড়নায় লোকজন শহরের দিকে ছোটে। যায়, কিন্তু ফেরে না। বাবা মা টাকার জন্য সন্তানদের শহরে লোকের বাড়ি কাজে পাঠায়। বেতন ছাড়াও ঈদ পার্বণে সাহায্য সহযোগিতা, কাপড় চোপড় আসে।
মজিদ চাচা এর আগেও বেশ কয়বার অনুকে শহরে নিতে চেয়েছে। অনু কান্নাকাটি করে সে যাত্রা যাওয়াটা আটকেছে।
এখন দেশে কী এক মহামারী রোগ করোনা এসেছে। সেই রোগ হলে নাকি মানুষ আর বাঁচে না। স্কুল, কলেজ অফিস সব বন্ধ। অনুর বাবা স্থানীয় বাজারে একটা ভাতের হোটেলে কাজ করে। করোনার কারণে সেই হোটেল এখন দীর্ঘদিন বন্ধ। বাবার আয়-রোজগার নাই। মা লোকের বাড়ি ঘুরে আলগা কাম করে যা আনে তা দিয়ে বেঁচে আছে ওরা।
এমন দুর্দিনে মজিদ চাচাকে উঠানে দেখে বুকটা ধ্বক্ করে ওঠে অনুর। মনের ভেতর মন বলে এখন বাড়িতে না ঢোকাই ভালো। পালাতে হবে। পালা–।
অনু দ্রুত বেরিয়ে যাবার জন্য পা বাড়াতেই পেছন থেকে বাবার ডাক শোনা যায়, মা আইছো?
অনুকে ফিরতে হয়।
মুখ হাত ধুয়ে মায়ের কাছে গেলে মা ওকে থালায় ভাত দেয়। সাথে অরহর ডালের বড়া, হেলেঞ্চার ঝোল। খাবার সামনে আসতেই অনু বুঝতে পারে কতখানি ক্ষিদা ওর পেটে। সেই সকালে বেরিয়েছিল। শাপলার খোঁজে। কয়েক আঁটি শাপলা তুলতে পারলে বাজান সেগুলো বাজারে নিয়ে বিক্রি করে। বাজানের হাঁপানি বলে সে নদীতে শাপলা তুলতে পারে না। আজ অনু শাপলা তুলতে পারে নি। সকালে ওর ঠিক করেছিল চরে যাবে। চরে সম্প্রতি ধান কাটা হয়েছে। এখন ক্ষেতে গেলে ইঁদুরের গর্তে প্রচুর ধানের শীষ পাওয়া যায়। চরে ওরা গিয়েওছিল। কিন্তু সুবিধা করতে পারে নি।
আজ বড় বড় লোক ধান টোকাচ্ছিল। অনুদের মতো ছোটদের তারা ক্ষেতের কাছে ঘেঁষতে দেয় নি। গালি দিয়ে খেদিয়ে দিয়েছে। তবু অনুরা চেষ্টা করেছে, অপেক্ষা করেছে, লোকগুলো চলে গেলে কিছু যদি জোগাড় করতে পারে সেই আশায়। কিন্তু শেষাবধি খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে।
অনু বড় বড় গ্রাসে লবণ মাখা ভাতে একটু একটু বড়া ভেঙে মুখে দিতে থাকে। হেলেঞ্চার তিতে ঝোল সুড়ুত করে চুমুক দিয়ে গেলে। অমৃতের মত লাগে। বুক পেট জুড়িয়ে আসে। ঠিক তখন মা বলে, তোগো মজিদ চাচা তরে ঢাকা লইয়া যাইতে আইছে—
আমি ঢাকা যামু না।
না গেলে কেমনে অইবো?— মা অনুকে নিজেদের দুরবস্থা, বাবার কর্মহীনতা, সংসারে দাদা-দাদীসহ সাত জন মানুষের অন্ন সংস্থানের দুশ্চিন্তা বোঝাতে বোঝাতে আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মোছে।
তোরে দূরে পাঠাইতে কী আমাদের মন চায়? কাঁন্নামাখা কণ্ঠ মার। এইবার যা। তোর নিজেরও তো খাওন পরন লাগে। যা মা। দিন কাল ফিরুক তরে নিয়া আসমু।
অনু বোঝে। ও এখন বড় হয়েছে। স্কুল খোলা থাকলে ও এবার সিক্সে উঠতো। ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ারও কথা ছিল। কী এক মহামারী এল দেশে, স্কুল যে বন্ধ দিল আর খোলেই নি।
স্কুল ঘরের বারান্দায় কারা কারা খড় রেখেছে। সামনের মাঠে লাগানো বাগানের বেড়া ভেঙে পড়েছে। আগাছায় ভরেছে বাগান। ফুল গাছ গুলো আর আলাদা করে চেনা যায় না।
অনুরা মাঝে মধ্যে স্কুলের মাঠে যায়। শূন্য মাঠ হা হা করে তাকিয়ে থাকে। সরকার থেকে মানুষকে মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকতে বলেছে। থানার ওসি সাহেব মাঝে মধ্যেই মোটরসাইকেল নিয়ে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। ছেলেমেয়েদের মাঠে খেলতে দেখলে হাতের লাঠি দিয়ে পেটান। আর বলেন, বাড়িত যা, বাড়িত থাক!
হাটে গেলে সবাই মুখে মাস্ক পরে।
অনুদের বাড়ীতে অবশ্য কারো মাস্ক নাই। স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে বাজান একটা মাস্ক এনেছিল। হাটে যেতে পরে।
অনু শোনে বড়দের মুখে এভাবে সব বন্ধ থাকলে লোকজন কাজের অভাবে, পয়সার অভাবে না খেয়ে মারা যাবে। অনু নিজেদের বাড়ির অবস্থা ও দেখছে। আগে কখনো একবেলা খেয়ে থাকতে হয় নি ওদের। কিন্তু আজকাল মাঝে মধ্যেই একবেলা খেয়ে থাকে।
অনু শহরে যেতে রাজি হয়।
যদিও এই আপনজন, মাঠ-নদী- গাছপালা,ক্ষেত,বন্ধু-বান্ধবী, পড়শী এই সমস্ত কিছুকে ফেলে যাওয়া ভীষণ কষ্টের তবু মাস শেষ ওর কাজের পারিশ্রমিক কিছু টাকা বাড়িতে আসবে, বাড়ির লোকজনকে একবেলা খেয়ে থাকতে হবে না- এ চিন্তাটুকু অনুকে শহরে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
মাজেদ চাচা অনুর মাথায় হাত রেখে বলে শহরে তোমারে যে বাসায় দিমু হেরা অনেক বড়লোক। পেট ভইরা খাওন তো পাবাই সেই সঙ্গে মাসে মাসে তোমারে তিন হাজার টাকা কইরা বেতনও দিবো। তোমরার অভাব কইমা যাইবো।
মাজেদ চাচা বলে, তুমি ঘরের কামকাজ করবা। থালা বাটি মাজাঘষা, ঘর ঝাড়ু দেওন—
এটুকু শুনে মা বলে ওঠে, মাজেদ ভাই, আমার মাইয়ারে আমি কুনুদিন মাজা ঘষা করতে দিই নাই। ও তো ঘরের কাম পারে না। শুধু ভাই-বোনদের দেইখা রাখছে। ওরে তাইলে অহন শহরে নেওনের দরকার নাই—-
মা কে আর কথা বলতে দেয় না মাজেদ। বলে, তুমি অত চিন্তা কইরো না। অনুয়ে কাজ করতে করতে শিকখা ফেলাইবো। আমি তোমার মাইয়ারে ভালো একটা বাড়িতে দিমু। কোনই সমস্যা অইবো না—
মাজেদ অগ্রিম টাকা খেয়েছে তার পরিচিত এক অফিস কর্মচারী মোকাব্বের এর কাছ থেকে। মোকাব্বের তার বড় সাহেবের বাসায় কাজের লোক দিতে পারলে বড় সাহেব তাকে অফিসে পার্মানেন্ট করে নেবেন। এখন মাজেদ যদি লোক নিয়ে না যায় মোকাব্বের টাকা ফেরত দিতে বলবে। ঐ টাকা কী এখনো আছে নাকী। মাজেদ কবে তা খেয়ে হজম করে ফেলেছে! মাজেদকে তাই যেভাবেই হোক একটা কাজের লোক নিয়েই ফিরতে হবে। কাজ পারুক না পারুক সে পরের ব্যাপার। আপাতত নিজেকে রক্ষা করাটাই কথা।
অনু যেহেতু রাজি হয়েছে সুযোগ কোনো ভাবেই ফস্কে যেতে দেওয়া যাবে না। মাজেদ তাই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নেয় রাত আটটার ট্রেনেই সে অনুকে নিয়ে রওনা দেবে। দেরি করা যাবে না। অনু মত বদলালে তার বাবা মা জোর করবে না।
রাত আটটার গাড়ি। সাতটাতেই বাসা থেকে বেরোতে হবে, এমন আচমকা কথা শুনে অনুর বাড়ির সবাই হা হা করে ওঠে।
এটা কেমনে হয়। বলা নাই কওয়া নাই এক বিকালেই যাওয়া ফাইনাল। মাইয়াটা আগে কোনদিন বাড়ি ছাইড়া কোথ্থাও যায় নাই, এখন একা অতদূর অচেনা জায়গায় যাইব,একটু মন ঠিক করা উচিত না?
অনুর বাজান ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলে। মেয়েকে দূরে দিতে তারও বুকটা ফেটে যায়, কিন্তু পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। তাই না করতেও পারে না।
মাজেদ ব্যাপারটা বুঝে ফেলে। সে একটু তাচ্ছিল্য করে বলে, মেয়েরে দিতে না চাইলে দিও না। আমি তাইলে উঠি। গেরামে অনেক মানুষ শহরে যাওনের লাইগা এক পায় খাড়া। তোমাগো লগে একটু জানা শোনা বেশি এলাইগ্যা আইছিলাম। উঠি তয়!
শহরে কাজের সুযোগটা আবার না হাতছাড়া হয়ে যায় অনুর বাজান তাড়াতাড়ি বলে, আরে বয়েন। মাইয়া যাইবো না কইছি নাকী। যাইবো তো।
তয় আপনার হাতে মাইয়া তুইলা দিতেছি দেইখেন আমার মাইয়ার যেন কষ্ট না হয়।
মাজেদ বসতে বসতে বলে তাইলে অনুরে গুছাইয়া দেন। সোজা ইসটিশান যামু গা।
একটা ছোট ব্যাগে জামা কাপড় , আয়না, চিরুনি, কাজল, তেল আর পাউডারের কৌটো ভরে দেয় মা। অনুর চুল আঁচড়ে দিতে দিতে বলে, তোমার আঙ্গুর চাচার মোবিলে মাজে মাজে ফোন দিয়া কেমুন আছো জানাইও। আর যেই বাড়িত যাইবা হেই বাড়ির সকলের কথা ঠিকমতন শুনবা। আমরার লাইগা মন খারাপ কইরো না। তুমার বাপে হোটেলে আবার কাম শুরু অইলেই তুমারে আমরা নিয়া আসমু—-
মায়ের কথা শুনতে শুনতে অনু ভাবে, বড়লোকেরা শহরে থাকে কেন? গ্রামে ফসল হয়, গ্রামে হাঁসমুরগি হয়। তাহলে শহরের মানুষ বড়লোক কেন?অনুর চোখে টিভিতে দেখা শহরের ছবি ভাসে। বড় বড় দালান বাড়ি, কত না বাহারের গাড়ি শহরের রাস্তায় ছুটে চলে। ঐ রকম উঁচু বাড়িতে কি অনুও থাকবে? অনুকে কি তারা বেড়াতে নিয়ে যাবে? তার কপালে ঐ রকম গাড়িতে চড়া লেখা আছে? মাজেদ চাচা বলেছে অনুকে যে বাড়িতে কাজে দেবে তারা অনেক বড়লোক। কত বড়লোক তারা? অনুদের দুবেলা ভাত জোটেনা আর ও যে বাড়িতে যাবে তারা ওকে খেতে তো দেবেই আবার মাস শেষে তিনহাজার টাকা!!!
বাড়ির সবার থেকে বিদায় নিয়ে বেরোবার মুখে হঠাৎ শিউরে ওঠে অনু -অচেনা শহর, অচেনা মানুষের ভয়ে বা বেঁচে থাকার যুদ্ধে প্রথম পদার্পণে!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।