গদ্যে নন্দা মুখার্জী

মনের কথা মনেই থাক
প্রিয় রূপ,
কোনদিন তোমায় চিঠি লিখিনি কিংবা বলতে পারো লেখার কোন প্রয়োজন হয়নি কারণ মুঠোফোনের দৌলতে সকাল থেকে রাত — বহুবার কথা হত। সে কত কথা —চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। ফোনে তোমার নম্বরটা আজও ঠিক সেই একইভাবে সেভ করা রয়েছে। মাঝে মাঝে কন্ট্যাক্টসে ঢুকে অকারণ ফোন করি তোমার নম্বরে। আমি জানি বলবে ‘সুইচ অফ বা এই নম্বরের কোন অস্তিত্ব নেই –‘। কিন্তু তবুও করি।
দুজনের কর্মস্থলের নিত্য যাতায়াতের সূত্র ধরে কখন যে আমরা নিজেদের কাছাকাছি এসে পড়েছিলাম তা বোধ করি দুজনের কেউই বুঝতে পারিনি। ভালোবাসা মানুষের এক অদ্ভুত অনুভূতি। সৎ মায়ের কটূক্তি আর মাতাল বাবার অত্যাচারে আমি যখন জর্জরিত ঠিক তখনই তোমার ভালোবাসা আমাকে নূতনভাবে বাঁচার দিশা এনে দিয়েছিলো। ভাবিনি তখন আমি, একবারের জন্যও ভাবিনি, আমার স্বপ্নের প্রাসাদ আমি রচনা করে চলেছি সমুদ্র পারে বসে।
প্রথম যেদিন ভিক্টোরিয়ায় বসে তুমি আমার ঠোঁট ছুঁয়েছিলে ,যা ভাবলে আজও আমি রোমাঞ্চিত হই — বিশ্বাস করো আমি জানতাম না ভালোবাসার মানুষের স্পর্শ কারও জীবনে স্বর্গীয় সুখ এনে দেয়। জন্মের পর থেকে বাবা, মা বা অন্য কারও ভালোবাসা আমি পাইনি। স্নেহ ভালোবাসা কি জিনিস আমি জানতাম না। সবথেকে কাছের মানুষের ভালোবাসার স্পর্শ পেয়ে আমি সত্যিই নিজের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর যেদিন তুমি আমাকে তোমার চিরসঙ্গী করে তোমার কাছে নিয়ে গেলে, সারাজীবনের মোতো সেদিন মনেমনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম কোনদিন কোন অবস্থাতেই তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। আজ বুঝতে পারি সে প্রতিজ্ঞা হয়তো তোমার ছিলো না। আমার নিজের হাতে গড়া সাজানো সোনার সংসার তিনবছরের মধ্যে ভেঙ্গেচুরে তছনছ হয়ে গেলো। আমার সুখের সংসার দেখে বিধাতা পুরুষ অলক্ষ্যে হেসেছিলেন হয়তো —।
তোমাকে তিনি আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলেন —। সেদিন কেউ পাশে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত রেখে বলেনি, ‘কেঁদো না—‘। তাই তো সে কান্না আমার আজও থামেনি।
তুমি চলে যাওয়ার পর আমি জানতে পারি , আমাকে দেওয়া তোমার সেরা উপহারটার কথা। তোমার আমার সন্তান ছোট্ট রূপের কথা। হ্যাঁ— আমাদের ছোট্ট ফুটফুটে একটা ছেলে হয়েছে। সে পুরো তোমার মত দেখতে। এই একাকী জীবনে অন্ধকারময় পৃথিবীতে ওই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। তুমি চলে যাওয়ার পর কোনদিনও আমার মা কিংবা বাবা একবারের জন্যও আমার খবর নিতে আসেননি। যেখানে তুমি আমাকে সম্পূর্ণ তোমার নিজের করে এনে তুলেছিলে আমি সেখানেই আছি। যেটুকু সময় আমি বাড়িতে থাকি আমি যেন তোমার গায়ের গন্ধ টের পাই। আমার মনে হয় তুমি যেন সবসময় আমার পাশে পাশে রয়েছো। অফিস যাওয়ার সময় আমার ছোট্ট রূপকে আমি এক মহিলার কাছে দিয়ে যাই। ফেরার পথে নিয়ে আসি। একদিন মাত্র ওই মহিলা আমাদের বাড়িতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছেলেকে নিয়ে ছিল। সে নাকি বাড়িতে অন্য কারও অস্তিত্ব টের পেয়েছে। আমি চুপ করে থেকেছি কারণ সত্যিটা তো আমি জানি। তারপর থেকে ওর বাড়িতেই ছেলেকে দিয়ে অফিস যাই। তুমি ঠিক এইভাবেই আমাদেরকে জড়িয়ে রেখো, সমস্ত বিপদাপদ থেকে রক্ষা করো।
এ চিঠি কোনদিনও তোমার কাছে পৌঁছাবে না। খুব যত্নে ভাঁজ করে তুলে রেখে দেবো আমার বিয়ের সেই টুকটুকে লাল বেনারসির ভিতর। রূপ, এ শুধু চিঠি নয় — এ আমার মনের ব্যাকুলতা — তোমাকে না বলা সব কথা। কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারলে কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়। কিন্তু আমার তো তুমি ছাড়া কেউ ছিলো না আর এখনো নেই। তাই শব্দাক্ষরে আমার না বলা কথারা ডাইরির ছেড়া পাতায় আজ স্থান পেলো।
যেখানেই থাকো খুব খুব ভালো থেকো। তোমার আশীর্বাদের হাতটা আমাদের মাথায় রেখো আর সমস্ত বিপদআপদ থেকে আমাদের রক্ষা করো।
ইতি তোমার
মানবী