গল্পেরা জোনাকি তে নীল মিত্র

মন ও সমাজ পরিবর্তন

বাইরে আজ সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছে। আকাশটা মেঘে ঢেকে রয়েছে। ফাল্গুনী হাওয়া বয়ে চলেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনটা কেমন যেনো করে উঠলো। ভুলে যাওয়া অনেক কথা মনের মধ্যে ভেসে উঠলো। একটা মিষ্টি মুখ মনে পড়ে গেল।
দীঘা ঘুড়তে গিয়ে ছিলাম কয়েকজন বন্ধু মিলে। সমুদ্রের ধারে বসে গল্প করছিলাম সবাই মিলে। প্রদীপ, বাপি, উৎপল, মনু আর সন্দীপ তখন বিয়ার আর সাগরের এর মজা নিচ্ছে বসে, তাই আমি একা সাগর পারে হাঁটতে লাগলাম। বেশ সুন্দর অনুভূতি হচ্ছিল বালির ওপর চলতে। মাঝে মাঝে সাগরের ঢেউ এসে পা ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে।
এদিকে লোকজন বিশেষ আসে না, ফাঁকা জায়গাটা। হঠাৎ একটা মেয়ের কথাতে সম্বিত ফিরলো – এই যে মহাশয় সামনে শ্মশান, ঐ দিকে যাবেন না। ঘুরে তাকিয়ে দেখি একটি মেয়ে। মিষ্টি মুখশ্রী, বেশ লম্বা ঘন কালো চুল খোলা রয়েছে পিঠের ওপর। চোখ দুটোতে একটা অদ্ভুত মায়া রয়েছে। আমি হেসে বললাম – ভয় পাই না আমি ভূতে। তাছাড়া আপনিও তো আছেন, আমি তো আর একা নই। মেয়েটাও মিষ্টি করে হেসে বললো “তা অবশ্য ঠিক। ভূতেরা তো কিছু করে না। ভয় তো লাগে মানুষকে। ভদ্ররূপি মানুষগুলো ভূতের থেকেও ভীষণ হিংস্র আর ক্ষতিকারক।” কেমন যেন শোনালো কথাগুলো মেয়েটির মুখে। অবাক হয়ে দেখলাম ওর চোখের দিকে। কিছুক্ষণ আগে যে চোখদুটিতে মায়া দেখে ছিলাম, সেই চোখদুটিতে একটা ঘৃণা আর অভিযোগের ভাষা ফুটে উঠেছে যেন।

” আপনি কোথা থেকে এসেছেন? আপনার নাম কি?” আমি বললাম কলকাতা থেকে। নাম নীল। এবারে মেয়েটি মিষ্টি করে হেসে বললো ” নীল আকাশ, নীল সাগর আর সাথের সাথীটাও নীল। বাহ, বেশ ভালো তো। তা নীল আকাশ আর নীল সাগরের মতো আপনার মনটাও বিশাল নাকি অন্য মানুষ গুলোর মতো ছোট আর ময়লায় ভরা?” হঠাৎ এমন অদ্ভুত কথা শুনে কি বলবো বুঝতে না পেরে একটু হাসলাম। এবারে আমি জিগ্যেস করলাম – আপনার নাম কি? মেয়েটি এবারে খুব জোরে হেসে উঠল। বললো যার যেটা পছন্দ সেই নামেই ডাকে, বাবার দেওয়া একটা নাম ছিল, প্রিয়া। অনেক নামের ভীড়ে আমার সেই নামটা হারিয়ে গেছে। আরো ও বললো বয়স তখন মাত্র ১৪বছর, দূর সম্পর্কের এক মামা তাকে নিয়ে এসেছিল কলকাতা শহরে সেই সুদূর আসাম থেকে কাজ দেবে বলে। তারপর আর ফেরা হয়নি বাড়িতে। ওকে কারোর কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল সেই মামা। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে শুনছি ওর কথাগুলো। জানতে চাইলাম কোথায় থাকা হয়? বললো – কলকাতার খুব নাম করা জায়গায় তার বাড়ি, সবাই নাকি এক নামে চেনে।

এমন সময় দুটি অন্য মেয়ে এসে ওকে বললো – কিরে ফিরবি না? রাত হতে চললো তো, বুড়ো গুলো ডাকছে। সব কটা মাল খেয়ে মাতাল হয়ে রয়েছে। চল, আর দেরী করিস না।
যাবার সময় চোখের দিকে তাকিয়ে বললো – নীল কি বিশাল ঐ নীল আকাশ আর নীল সাগরের মতো? ওর এই প্রশ্নটা নিয়ে সেদিন ফিরে এসে ছিলাম।
বার বার খোঁচা দিতো মনে যখনি মনটা উদাস হতো। অনেকবার নিজের কাছে এর উত্তর জানতে চেয়েছি। কিন্তু সামাজিক বন্ধন, দ্বিধা আর সঙ্কোচ এসে এর উত্তরটাকে চেপে দিয়েছে। আজ যখন জানালা দিয়ে ঐ দূরের আকাশটাকে দেখছিলাম তখন মনে পড়ে গেল সেই ঘটনাটা আর সেই মেয়েটার প্রশ্নটা। সত্যি তো নীল আকাশটা তো বিশাল। নীল সাগরের ও তো শেষ দেখা যায় না। তবে আমি কেনো পারব না ওদের মতো হতে! মনটা বলে উঠলো – চল নীল খুঁজে বার করে আনি তথাকথিত ভদ্র জগতের নোংরাতে হারিয়ে যাওয়া সেই প্রিয়াকে আর আশ্রয় দেই তোর বিশাল মনে ভালোবেসে।।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।