প্রবন্ধে নবকুমার মাইতি

কবি মানস কুমার চিনিঃ মানবতা ও কাব্য দর্শন

“সাহিত্য জীবন সত্যের প্রকাশ।” টেনি বলেছেন-“Literature is the transcript of Societies.” অর্থাৎ সাহিত্য সমাজের সারসংক্ষেপ। আর সেই জীবন সত্য অনুসন্ধানের জন্য ডুবুরির তৃষ্ণা নিয়ে পথচলা গুটিকয়েক কবি সাহিত্যিকের মধ্যে অন্যতম জীবন পথিক কবি,মেদিনীপুর জেলার মানস কুমার চিনি, আমাদের সবার প্রিয় মানসদা। কাব্য দর্শনের সব ক্ষেত্রে তিনি সাগর সিঞ্চন করে মুক্তো বা মনিকাঞ্চন তুলে আনতে পেরেছেন, কিনা সে বিচার করবেন নীরবধিকাল ও গবেষণালব্ধ কাব্য- প্রতিতী। তথাপি বলবো সাহিত্যের সুবিস্তৃত আকাশে মানস চিনি বহু মূল্যবান সৃষ্টি রেখে গেছেন, উজ্জল মণিম্ময় তার আভা,তার দ্যোতনা। আমাদের মত অনেক কাব্য প্রেমিক অনুজপ্রতিম ও অগ্রজপ্রতিম লেখকদের জন্য তিনি আমৃত্যু নিরলস ভাবে কাব্য সাহিত্যের সাধন ক্ষেত্রকে ঋষিতুল্য প্রজ্ঞা নিয়ে সুবিস্তৃত করে গেছেন। আঞ্চলিক স্তর থেকে দেশ-বিদেশের বহু পত্র-পত্রিকায় তার স্বর্ণাক্ষর প্রমাণ ও প্রত্যয় রেখে গেছেন।

কাব্য লক্ষ্মীর সেবার নিয়োজিত প্রাণ মানসদা একের পর এক অজস্র কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে তিনি চলমান কালের দর্পণ ও সাহিত্য সংস্কৃতির বহুধা বিভক্ত দর্শন তুলে ধরেছেন। তার রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ- নোনাবালি, স্রোতের ছায়া, নতজানু, চিররাত্রি, পটুয়া পাড়ার ঈশ্বর, পথের শেষে দেখি, বিষন্ন প্রেমিকার বেহালা, ছিন্ন পদাবলী, আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন (২০২২) প্রভৃতি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লব্ধ প্রতিষ্ঠ পত্রিকা আনন্দবাজার তথা দেশ পত্রিকায় তার প্রকাশিত বহু কবিতা পাঠকদের মুগ্ধ করেছে।

মানস চিনির কাব্য দর্শনে প্রতিভাত ছিল- হিরন্ময় আকাশ, ঝিরঝিরে বাতাস, মানব মানবীর প্রেম, বিচ্ছেদ, হাহাকার, দুঃখী মেহনতি অন্ত্যজ মানুষের বেদনার যাপন চিত্র তাঁর সাধন লিপিতে তিনি সুনিপুণভাবে অঙ্কন করেছেন। ব্যক্তি জীবনেও তিনি আপনার জনের বিচ্ছেদ ব্যথায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন নিরন্তর। পথ চলতে বারবার হোঁচট খেয়েছেন, দুঃখের অভিঘাতে মুষড়ে পড়েছেন কিন্তু পথ চলা বন্ধ করেননি। তিনি জানতেন উপনিষদিক ব্রহ্ম চিন্তার দর্শন- “চলমানতাই জীবন” তাই স্থবিরত্ব নয়,বাধা-বিঘ্নকে অতিক্রম করে নিরন্তর পথ চলতে হবে। সৃষ্টির পথ, জীবনের পথ, মানবিকতার পথ ।

কলেজে বি.এ.অনার্স পড়ার সময় কিশোর বয়সে মানসদার কাব্য কবিতা গল্প তথা তাঁর সুসম্পাদিত বিখ্যাত ‘মোনালিসা’ পত্রিকার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল বর্ষিয়ান কবি সাহিত্যিক তথা গীতিকার শ্রদ্ধেয় ক্ষিতীশ চন্দ্র সাঁতরা বাবুর সাহায্যে। তারপরে ক্রমশ কলাবেড়িয়া, ভগবানপুর, ইলাশপুর, আনন্দ বিহার (পশ্চিমবাড়) থেকে খড়্গপুর, এগরা, দাঁতন,মেদিনীপুর তথা কলকাতার বহু সাহিত্য সভায় বরিষ্ঠ কবি ব্যক্তিত্ব হিসেবে বহু জায়গায় তার অন্তরমথিত কাব্য পাঠ ও কাব্যালোচনা শুনেছি এবং ক্রমাগত ঋদ্ধ হয়েছি,সাহিত্যে অনুরাগ বেড়েছে,ক্রমশ আমার চিন্তা ও চেতনার মধ্যে। আজ প্রায় ৪০বছর ধরে সেই পথে হাঁটছি।

একপ্রকার কবিতা পাগল মানুষ ছিলেন তিনি, কবিতাই ছিল তাঁর কাছে একমাত্র আশ্রয় ও প্রশ্রয় । নিজের চাকরি জীবন খড়গপুর রেল কলোনির একঘেয়েমি ব্যস্ততম জটিল জীবন থেকে বারবার ছুটে এসেছেন কবিতার টানে, কবিতার সক্ষে,কাব্য লক্ষ্মীর উদাত্ত আহ্বানে ।
“নোনাবালি” কাব্যের পাষাণ প্রতিমা কবিতায় তিনি লেখেন তাঁর চিন্তন-
“গভীর রাতে নেমে আসে
আমার চিন্ময়ী-
আমি তার বন্দনা করি
চরণে মাথা রাখি
আর বলি-কেড়ে নাও
আমার জ্বালা যন্ত্রনা ও ভালোবাসা।
চিন্ময়ী আমায় দেখে আর কাঁদে
চিন্ময়ের ঝরে পড়া জলে আমি
দেখি ক্ষমার নিঃশর্ত বাণী
দুই হাতের পাপ ঢেলেছি সাগরে
সমুদ্র মন্থনে উঠে আসে মাটি খড় তুষ
আমি গড়ি পাষান প্রতিমা।”
“নোনাবালি” কাব্যের এই উচ্চারণেই তাঁর কাব্য নির্মাণের মূল শর্তটি এখানেই খুঁজে পাই । কাব্য নির্মাণে যে সমুদ্রমন্থন তিনি করেছেন তা জীবন সমূদ্র।

জীবন ইতিহাস সময় তার চেতনায় অবিমৃশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। নিরন্তর বিষাদের ভেতর নিজ স্বরূপকেই অন্বেষণ করেছেন সেখানে-
” চোখের ভেতর ভাঙ্গা দ্বীপ
আলো পরে নিভে যায়
নিজের ছায়ায়। “

স্বাভাবিকের তুলনায় আমাদের প্রিয় কবি মানস কুমার চিনি একটু কম বয়সেই চলে গেছেন মানবিক জগৎ অর্থাৎ ধোলামন্দির রুপ পৃথিবী ছেড়ে অনন্ত অমৃত লোকের আহ্বানে,যা খুবই দুঃখের। সৃজ্যমান কথা সাহিত্যের সারস্বত অঙ্গনে বেশ কিছুটা প্রাপ্তির অপূর্ণতায় রেখে গেলেন। তথাপি বেদান্তের চিন্তা নিয়ে বলা যায়, তিনি (মানস বাবু) দেহগত বা অবভাষিক ভাবে আপাতত প্রস্থান করলেও অগণিত কাব্য-সাহিত্যপ্রেমী পাঠকের হৃদয়ে, তাদের মানষলোকে তাঁর ও তাঁর সৃষ্টি-সৃজন কর্মের অক্ষয় আসন পাতা থাকবে । সবশেষে শ্রদ্ধার মানুষ, মানবতার কবি মনসদার উদ্দেশে আমার সভক্তি প্রণাম জানিয়ে ইতি টানলাম।
ওঁং শান্তি…..ওঁং শান্তি….ওঁং শান্তি……

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।