গল্পতে নন্দা মুখার্জী

প্রাক্তন

তোমার আমার পৃথিবী – হতেই পারতো এই সুন্দর পৃথিবীটা কিন্তু কেউ সাহস করে কারো কাছে এসে দাঁড়াতে সেদিন পারিনি।সত্যি কথা বলতে কি জানো দুজনেরই তখন বয়স ছিল অল্প। বুদ্ধি ছিল অপরিণত। মাত্র দু-ক্লাসের ব্যবধানে নন্দিতা ও সায়ন পড়ে। একই পাড়া হওয়ার সুবাদে দুজনের বন্ধুত্ব সেই ছেলেবেলা থেকে।বিকেলে পাড়ার মস্ত বড় মাঠে ছেলেমেয়েরা একই সাথে খেলাধুলা করতো। সেই সময়ে সেই বয়সে এখনকার মত ছেলেমেয়েদের একসাথে মেলামেশায় অভিভাবকেরা খুব একটা খারাপ চোখে দেখতেন না কারণ তারা জানতেন তাদের বলে দেওয়া কথার অমর্যাদা ছেলেমেয়েরা করবে না।সব ক্ষেত্রেই যে সকল ছেলেমেয়েরা তারা তাদের বাবা,মায়ের কথা শুনতো তা কিন্তু নয়।তাদের মধ্যেও ভাব-ভালোবাসা গড়ে উঠতো। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সাহস কেউই দেখাতে পারতো না।

আভাসে ইঙ্গিতে সায়ন বহুবার নন্দিতাকে বুঝাতে চেয়েছে যে সে তাকে ভালোবাসে।নন্দিতাও যে বোঝেনি তা মোটেই নয়। ভালো সেও সায়নকে বাসতো। কিন্তু খুব বোঝদার মেয়ে হওয়ার ফলে সে ভালোভাবেই জানতো তার রাশভারী বাবা কোনদিন এ সম্পর্ক মেনে নেবেন না।পরিণামে দুঃখই পেতে হবে তাকে। তবুও সায়ন দেশ ছাড়ার আগে নন্দিতার সাথে দেখা করার অনেক চেষ্টা করেও যখন সফল হয় না তখন তাদের কমন এক বন্ধুর মাধ্যমে নন্দিতার কাছে এক চিঠি পাঠায়।বাবার সম্মানের কথা ভেবে বুকে পাথর বেঁধে বন্ধুকে তার অক্ষমতার কথা জানিয়ে দিলেও সারাজীবন মনের কোন এক কোণে সে সায়নের জন্য একটা আলাদা জায়গা রেখেই দেয়।

দুটি জীবনের বাঁক দুদিকে ঘুরে যায়। আলাদা আলাদা সংসারে যে যার মত করে জীবনের চারভাগের তিনভাগ কাটিয়ে দিলেও দুজনের মনেই রয়ে গেছে সেই ভালোবাসার দাগ। তিন যুগেরও বেশি সময় কেটে গেছে জীবন থেকে তাদের।চোখের দৃষ্টি ঝাপসা,চুলেও পাক ধরেছে।এখন সকলেই অ্যান্ড্রয়েড ফোনের সাহায্যেই সময় কাটায়।সেই সূত্র ধরেই সায়নের কাছে একটা রিকোয়েষ্ট আসে।পদবীটা আলাদা হলেও নামের প্রতি দুর্বলতা বশত সায়ন অনুরোধ গ্রহণ করেই নন্দিতার প্রোফাইলে ঢুকে দু,তিন বছর আগের পোষ্টকৃত একটি পুরনো ছবি দেখে নন্দিতাকে চিনতে পারে।ঠিক সেই মুহূর্তে নন্দিতাও অনলাইনে থাকার ফলে সায়ন ইনবক্সে তাকে কল করে।

পুরনো দিনের কথা,এখনকার কথা চলতেই থাকে তারপর থেকে ঘণ্টার পর ঘন্টা রোজ নিয়ম করে দুবেলা। সব দায়িত্ব,কর্তব্য দুজনের জীবনে শেষ। সায়নের একমাত্র মেয়ের বিয়ের পর সে এখন লন্ডন প্রবাসী।দুই সন্তানের জননী সে।বাবার সাথে ভিডিও কলে সপ্তাহে তিন,চারদিন কথা হয়।আর নন্দিতার ছেলে কর্পোরেট দুনিয়ায় বিশাল মানুষ আজ।মাকে সময় দেওয়ার মত সময় তার হাতে আর নেই।তবে হ্যাঁ মা ফোন করলে “ভালো আছি”- কথাটা বলতে একটু দ্বিধাবোধ করে না।সে তার স্ত্রী আর ছেলে,মেয়ে নিয়েই সুখী।মায়ের জন্য আলাদা সময় তার নেই।

সায়নের স্ত্রী দুরারোগ্য ক্যান্সারে আজ বছর দশেক হল সায়নকে ছেড়ে চলে গেছে।আর নন্দিতার স্বামী হার্ট অ্যাটাকে কিছুদিন হল নন্দিতাকে একা ফেলেই পাড়ি জমিয়েছেন অমৃতলোকে। চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বেও মাঝে মাঝে কিছু থাকে আর এই থাকাটাই বোধহয় কখনো কখনো সেই অদৃশ্য হাতের ছোঁয়ায় শেষ বয়সে তার ইচ্ছাতেই দেখা কিংবা কথা হয়। নন্দিতা সায়নকে অনুরোধ করে কানাডার বাড়ি বিক্রি করে সবকিছু মেয়েকে দিয়ে একবারে কলকাতা চলে আসতে।নিজেও ঠিক করে বাড়িঘর সবকিছু ছেলের নামে লিখে দিয়ে সেও অন্যত্র কোথাও চলে যাবে।ছেলে বহুদিন আগেই বাপের তৈরি বাড়ি ছেড়ে বিশাল ফ্ল্যাট নিয়ে অন্যত্র আছে তার পরিবার নিয়ে। যত সহজে তারা কথাগুলো ভেবেছিলো তত সহজে কিন্তু কাজটা হয়নি।তবে হ্যাঁ অনেক ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে তারা কাজটা শেষ পর্যন্ত করতে সক্ষম হয়েছে। পূর্ব কথা মতো দেখা করে শেষ বয়সে দুজনেই আশ্রয় নেয় একটা বৃদ্ধাশ্রমে। ওই যে চাওয়া-পাওয়ার বাইরেও কিছু শাশ্বত ইচ্ছা থাকে আর সেই ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে শেষ বয়সে এসে কিছুটা হলেও একটু সাহস দেখাতে হয় বৈকি!ছেলেমেয়েরা খোঁজ-খবর না নিলেও তারা তাদের অধিকার একবিন্দুও ছাড়তে রাজি হয় না।সেই ক্ষেত্রে শেষ বয়সে এসে একটু এডামেন্ট হয়েই নাহয় নিজের কথাই ভাবা যাক।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।