ক্যাফে এক মাসের গল্পে নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত

অহিংসা পরমো ধম্ম
(লেখাটি সম্পূর্ণ কল্পনা প্রসুত। ঐতিহাসিক নয়। )
৪
রাজপ্রসাদের একধারে মাধব একটি শিলালেখ জোরে জোরে পড়ছিল, “দেবতাদের প্রিয় রাজা সমস্ত পরস্পর বিরোধী ধর্ম সম্প্রদায়, সন্ন্যাসী ও গৃহস্থদের পুরস্কার ও সম্মান দিয়ে থাকেন …”।মাধব মন খুব নরম হয়। রাজার এই আশ্বাস বানী তাঁর ভালো লাগে। রাজার প্রতি তার অবিচল বিশ্বস্ততা। সেদিন রাতে দাক্ষায়নের সাথে জয়সেনের কথাবার্তা ভালো লাগছিল না। জয়সেন রাজার সাথে সৌজন্যে সাক্ষাৎ করে বার হয়ে এলেন। “তুমি বিশ্রামাগারে ফিরে যাও ,আমি একটু ঘুরে আসছি।” জয়সেনের অশ্ব মুহূর্তে চোখে সামনে থেকে অদৃশ্য হল। নিগ্রোধ কুমারের অস্থায়ী আবাস, পশু চিকিৎসালয়ের পাশে। নতুন তৈরি পশু-চিকিৎসালয়টি দেখে অবাক হল জয়সেন। নিগ্রোধ কুমারের চেহারাটা দেখতে পাওয়া খুব দরকার। সে চেনে না। এমনি তে সব বৌদ্ধ ভিক্ষুকেই তার এক রকম লাগে। নিগ্রোধ কুমারের সাথে দেখা করা গেল না। তিনি একান্তে কোথাও গিয়েছেন। হয়ত আজ সন্ধ্যাকালে ফিরতে পারেন। নিজে রাজপুরুষ হিসাবে যা কিছু ধারণ করে থাকেন জয়সেন, সেগুলি খুলে অশ্বের পিঠের গোপন পেটিকায় রাখলো। কতগুলি ফলের গাছ লাগানো হয়েছে । তাঁর নীচে বহু মানুষ বসে আছে । সেখানে অপেক্ষা করবে বলে মনস্ত করল। মৃদু হাওয়া দিচ্ছে। একটা আছন্ন মত অবস্থা আসে তার। আবার নারী মূর্তি তার শরীরে হাত দেয়। নিজের শরীর উন্মুক্ত করে । মুখের বস্ত্র খন্ড এতো মোটা কেন? অথচ চুম্বন কি নিবিড়। ঘোর দ্বিপ্রহরে কাকে শরীরের গোপনে ধারণ করছে জয়সেন। চমকে ঘোর ভাঙল। গাছে ঠেস দিয়ে বসে আছে সে। নিজের মস্তিষ্ক ধাতস্ত হল জয়সেনের। হৈমবতী? হ্যাঁ সেদিন হৈমবতী এসেছিল। বুকের মধ্যে সব আলো নিভে গেল জয়সেনের। জয়সেনের দ্বিতীয় পত্নী। প্রানোচ্ছল হৈমবতী কে অপহরণ করে বিরুদ্ধ পক্ষ।কুম্ভীর প্রদেশের এক শাসক হঠাৎ খুব শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। জয়সেন সদ্য বিবাহ করে ফিরেছিল। প্রথম পত্নী পিতার অতি স্নেহের জন্যে কখনো জয়সেনের খুব কাছে ছিল না। কিন্তু হৈমবতী তার সব কিছু অকাতরে জয়সেন কে সমর্পণ করেছিল। তাকে এক সন্ধ্যাকালে অতর্কিতে কুম্ভীর এর যোদ্ধারা ঘর থেকে অপহরণ করে। প্রবল অত্যাচার হয় তার ওপর। এক ভোরবেলা হৈমবতী তার ধস্ত শরীর নিয়ে ফিরে এসে, জয়সেনের কাছে আশ্রয় চায়। জয়সেন দিতে পারেনি।তার পরিবার তার সমাজ মেনে নিত না।অশ্রুহীন চোখে জয়সেনের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে কোন কথা না বলে চলে যায় হৈমবতী।এরপর যখন পুনরায় খুঁজতে গিয়েছিল জয়সেন তখন সকলে বলেছিল সে নিজে আগুনে পুড়ে মরেছে। মন মানেনি জয়সেনের। তবে কি সে চরম পরিহাস করে গেল সেদিন।মাধব কেন চিনতে পারেনি? মাধব কে পাঠাতে হবে। খুঁজে আনুক হৈমবতী কে। সে সময় তার কিশোর বয়স। সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেনি জয়সেন। এবার তাকে প্রধানা মহিষী করবে । রাজা হবে জয়সেন, দেখে নেবে কোন সমাজ কি বলে।যারা হৈমবতীর বিরুদ্ধে এই কোন কথা বলবে তাকে নিজে হাতে গলা কাটবে জয়সেন।দুচোখ বেয়ে অশ্রু নামে তার। সে রাতে কেন চলে গেলে হৈমবতী।একবার যদি বলত।
না সন্ধ্যাকালে নিগ্রোধ কুমার ফিরলেন না। একদল সুন্দরী অর্ঘ নিয়ে বুদ্ধের পূজা সেরে ফিরে গেলেন। জয়সেন বিশ্রামাগারে ফিরে এসে মাধব কে ডাকলেন। মাধব এসে উৎফুল্ল চিত্তে বললেন, “ রাজার কাছ থেকে লোক এসেছিল। তারা বলেছে আপনার সাথে আমিও দ্বীপ রাজ্যে যাব।আমাকেও ওরা নিতে চায়।” “তুমি আবার ঐ গ্রামে ফিরে যাবে মাধব” জয়সেন বিরক্ত হয়ে বলে। “না না আমি আপনার সাথে যাব।।” কথা শেষ হয় না মাধবের। “আমরা কোথাও যাচ্ছি না।” দাঁত চিপে জয়সেন বলে। মাধব অবাক হয়। চুপ করে থাকে। মাধব কে গোটা পরিকল্পনা বলা যাবে না। অন্যভাবে বলতে হবে। “মাধব, সেদিন তোমার সাথে যার দেখা হয়েছিল তাকে তুমি চিনতে পারনি?আমার দৃঢ় ধারণা সে হৈমবতী! তাকে আমি ফিরিয়ে আনতে চাই। তুমি আর একবার সেখানে যাও। দিনের আলোতে খোঁজ কর। আমি কাজ শেষ করেই সেখানে চলে যাব।” মাধবের থুতনি নেমে যায়। সে বসে পড়ে। “আপনি ঠিক বলেছেন। আমি অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। যেন কতদিনের চেনা। আমি যাব।” জয়সেন নিশ্চিন্ত হয়। বাইরে একজন শবর দেখা করতে এসেছে উদ্ধব এসে জানায়। শবর আর কেউ নয়। দাক্ষায়নের সহচর। সে খোঁজ দেয় উত্তরের উপবনে নিগ্রোধ কুমার ধ্যান করছেন। সব কথায় ইঙ্গিতে হয়।জয়সেন মধ্যরাত পর্যন্ত উচ্চস্বরে তার আরাধ্যা দেবীর মন্ত্র পাঠ করে। হৃদয় থেকে এই কাজে সফলতার জন্যে প্রার্থনা করে। কাজ সমাধা হলে ছাগ শিশু বলি দেবার মনের ইচ্ছা জানায়।