ছোটবেলার একটা জোক ছিল- একজন খুব অলৌকিক শক্তিধর বাবাজী গ্রামে এসেছেন।সবাই তাকে ধরেছে, বক্তব্য দিতে হবে। বিরাট গাছের নীচে প্রচুর লোকজন জমা হল। উনি তিলক কেটে,বীরাসনে বসে বললেন, “আমি ধর্মকথা বলব, কিন্তু কোন বাঙালী থাকা চলবে না।” যাই হোক বাঙালিরা উঠে চলে গেল। উনি বলতে শুরু করেছেন “ হিমালয়ে দেখা এক বিরাট যোগী পুরুষ। তিনি এতো শক্তির অধিকারী সে আর বলার নয়। এক নদীর ধারে গাছের নীচে বসে আছেন । গাছ থেকে পাতা পড়ছে। উনি মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন। গাছ থেকে যে পাতাটা মাটিতে পড়ছে সেটা বাঘ হয়ে যাচ্ছে ,আর যে পাতাটা জলে পড়ছে সেটা কুমীর হয়ে যাচ্ছে…” এমন সময় একজন চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করে, “ আর যে পাতা টা অর্ধেক জলে আর অর্ধেক মাটিতে পড়ছিল! সেটা কি হচ্ছিল বাবাজী ?” ব্যাস বাবাজী উঠে দাঁড়াল… “বাঙালি আছে… আমি আর বলব না”। ইস ভাবুন তো এতো ভালো আলোচনা সভা বাঙালির জন্যে পণ্ড হোল।
বাঙালি সমন্ধে একটা কথা খুব ব্যবহার হয়, ‘আত্মঘাতী’। মানেটা আমার মাথায় ঠিক ঢোকে না। কারণ কি বলুন তো? আসলে বাঙালি বলতে কাকে পাই? চাটুজ্যে, বাড়ুজ্জে, মিত্র, ঘোষ, বোস… গড়িয়া হাট, নন্দন, রবি ঠাকুর,সত্যজিত… খবরের কাগজ আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া এটাকেই ‘বাঙালি’ বলে দেখায়।এটার প্রেম, এটার ঝগড়া, এটার সাফল্য, এটার পরাজয়, এর খাওয়াদাওয়া । একটা অতি কূপমণ্ডূক অবস্থা। আমিও তার মধ্যে ঘুরে বেড়াতাম। আজ এই বদ্ধ, পজ হয়ে যাওয়া সময়ে কেবলি এই বদ্ধ জলাশয়ের মতো সংস্কৃতি থেকে বার হয়ে আসতে চাইছে মন। এরা ‘বাঙালি’… কিন্তু সমগ্র নয়। আমার এই দেশে জনসংখ্যা বিরাট তাই মন আর মস্তিষ্কের বৈচিত্র অপার।অর্থে হয়তো দীন… কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতা তে কি ধনী সেই মানুষরা।
আমি মফস্বলের ইস্কুলে পড়তাম। আমি ইস্কুলে শিখলাম “দাগকাঠি”, “নজর লাগা”, আর অবশ্যই খিদে। ওদের মধ্যে অনেকেই বাড়ি গিয়ে বিকেল বেলা দিনের প্রথম ভাত খায়।মিতালী, কনিকা, প্রীতিকনা, রূম্পা, মিলন, অরুপ, রাজেশ, মৌসুমি আরও কত জন। মনে পড়ে “বালিকা” নামের একটি মেয়ে প্যান্ট না পড়ে ইস্কুলে এসেছিল। আমাদের “প্রথম শ্রেণী”টি বসতো বারান্দায়।আমি স্পষ্ট দেখতে পাই সুচিত্রা দি নাম ডাকছেন, আমরা লাইন করে “ধন ধান্য পুস্পে ভরা” গাইছি, উমা দি পৃথিবি কেমন করে সূর্যের চারপাশে ঘোরে দেখাছছেন, আমি তেরো ঘরের নামতা পারছি না, কান ধরে দাঁড়িয়ে আছি অরুপ আর বিশ্বজিৎ এর মধ্যে খানে। ওদের সবার পদবীর সাথে ছড়া হতো।যেমন ঘোষ খায় পচা মোষ, দাস খায় ঘাস, দত্ত হেগে করে গত্ত, কুণ্ডু বাঘ নিল মুণ্ডু, আমাকে কেউ খ্যাপাতে পারে না।কিন্তু বাড়িতে ছিল সুরজিত দা। মামের ছোট বোনের ছেলে এই সুরজিত দা । জেঠুদের কাছে থেকে পড়াশোনা করতো। ও ছিল ঘোষ। ওকে খুব জ্বালাতাম আমি। সুরজিত ঘোষ –খায় পচা মোষ। ও আমাকে বলতো “মার্জিত খায় শুধু খারজিত”। “খারজিত মানে কি?”জিজ্ঞেস করলে বলতো খুব খারাপ একটা জিনিস। কি জিনিস আজও জানিনা। আমার বাড়িতে যে মেয়েটি গৃহ সহায়িকা ছিল তার পদবী ছিল ‘ফুলমালী’। কি সুন্দর না পদবী টা। আমার বহুদিন ধারনা ছিল রবি ঠাকুর ওদের নিয়েই ঐ গান লিখেছেন। ঐ যে ‘নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুল বনে’ । আহা ‘নিত্য’ নামে মালীটার পদবী নিঘ্যাত ছিল ‘ফুলমালী’।আর গ্রাম থেকে আসতো তাদের অনেকের পদবী ছিল ‘মাল’। এরা গর্বের সাথে বলত ,তারা ‘রাজমাল’ ( উচ্চারণ ছিল ড়াজমাল। রাজমল্ল)।এরা মানুষ হিসাবে গ্রাহ্য হত। আমাদের রান্না ঘর, পুজার ঘরে অবাধ যাতায়াত ছিল। আমরাও আসলে ঠিক বড় জাতের ছিলাম না বোধহয়, ভাগ্যিস। মা এদের সাথে মিশতে কখনো বারণ করতেন না। কিন্তু বহু ‘ভদ্রবাড়ী’, অর্থবান মানুষের সাথে মিশতে দিতেন না।এদের সাথে থেকে আমার কথা বলার ধরণ ওদের মতো হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির ভদ্র আত্মীয় স্বজনদের ব্যাপারটা নিয়ে খুব চিন্তা ছিল। তাদের বড় বড় আত্মীয় স্বজনের সামনে আমার আর ভাই এর এই আচরণ ‘ ‘বাঙালির’ মতো ছিল না।যে ভাষাতে কলকাতায় কথা বলা হয় মানে কলকাতার বাঙাল আর ঘটি দুই ধরণের মানুষ বাড়িতে ছিল। মানে ‘এলুম-গেলুম’, আর ‘তোগো মনে লাগে না’ দুই ধরণ এর চেয়ে আমার মুর্শিদাবাদী ভাষা তে আমি স্বছন্দ ছিলাম। এই ভাষারও আবার অনেক গুলো ভাগ। রাঢ়ী-বাগড়ি ভাগ মানে গঙ্গার পূর্ব আর পশ্চিম পাড় এর তফাৎ। শিশুকালের গান মনে আসে-“মাছ খেং খেং মাছের কাঁটা মাথায় গুজ্যাছো।” মানে মাছ খেয়ে খেয়ে মাছের কাঁটা মাথায় গুঁজেছ। গানের শেষে ‘তুমি কি কর্যাছো’। কে কেন মাছের কাঁটা মাথায় গুজেছিল কে জানে। বাঙালির লেখা ,সাধে বাবাজী বাঙালি কে ভয় পায়।
প্রচুর বাঙালি রান্নাতে মিষ্টি খায় না। বাঙালি জানে! রাঢ় বঙ্গে ছোট মাছ দিয়ে তেঁতুলের টক হয়। তেল তাতে খুব কম।চিনি দেওয়া হয় না।বাবুদের কলকাতার বাড়ি এসে দই মাছ খেয়ে, ‘ঈহ্ মাছ গুলান লস্টো কর্যাছে’
দশমীর দিন সকালে ‘সাইত’ হয়। কৃষিকাজের সব যন্ত্রে আলপনা দেওয়া হয়। চাষারা একে অপরকে সাদা ধূতি পরে কোলাকুলি করে। এইসময় বিজয়া করতে আসে গেরস্ত লোকের বাড়ি পেন্নাম করতে মাছে ছোট মাছের চুবড়ি নিয়ে। তারা কোঁচর ভর্তি করে মুড়ি মুড়কি নাড়ু নিয়ে যায়। আর এরা নিজেদের কথন শৈলীতে এতো সৃজনশীল যেমন, ‘ভোকনা মতুন মেয়েছেল্যাটা’ ,‘পাঁপ্লুস’, ‘আল্কুনি’ ‘হ্যালসা’ ‘ল্যাহ্লা’ ‘হুঁশনাশা’ ‘ভ্যাস্টা’ । কারো নাম ‘নিবারণ’, তাকে ডাকা হবে ‘লিভাড়ুন’। আমাকে ছোট বেলায় অনেকে ডাকত ‘নিবেজিতা’। কলকাতা ঘুরে গিয়ে শিয়ালদা ইস্টেসান এর বর্ণনা করতে গিয়ে একজন বলে ছিল, “বাপড়ে কি লোক লোক ,থু থু ফেল্বাড় জায়গা নাই গো”। ঝগড়া হলে কি অসাধারন শব্দবন্ধ। ‘গুখেকো’ ‘ঝ্যাঁটাখেকো’ ‘কল্লামুখী’ থেকে শুরু হয়। বিশেষ সুর থাকে নানান অঞ্চলের নানান সুর।
প্রচুর বাঙালি রবিঠাকুর জানে না।রামকৃষ্ণ দেবের কথা জানে না। পথের পাঁচালি দেখেনি কিন্তু দিব্যি ভালো ভাবে বেঁচে আছে.. বাঙালি জানে!