T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় নির্মাল্য ঘোষ

মেয়েটি
একেই দার্জিলিং, তার ওপরে শীতকাল- জানুয়ারি মাস। প্রচন্ড শীত এখন দার্জিলিং এ। গোটা অফিস কয়লার চুল্লি এবং ইলেক্ট্রিক হীটার দিয়ে গরম করে রাখা হয়েছে। আমি পদোন্নতি নিয়ে দার্জিলিং ট্রান্সফার হয়ে এসেছি বেশ কয়েকমাস হল। ভারতীয় জীবনবীমা নিগমের শাখা অধ্যক্ষ আমি দার্জিলিং শাখার। অফিসের পাশেই কোয়ার্টারে থাকি একাই। ভালোই আছি। দার্জিলিংয়ে পোস্টিং সবাই এড়াতে চায়, কারন, পাহাড় ঘোরার পক্ষে মনোরম, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে থাকার পক্ষে নয়। কিন্তু আমি এখানে পোস্টিং চেয়ে নিয়েছি। আমার একটু লেখালিখি করার বদ অভ্যাস আছে। তাই আমার মনে হয়েছিল দার্জিলিং এর মত অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জায়গাতে পোস্টিং হলে লেখালিখির কাজটা আমি আরো ভালো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব অফিসের কাজের পাশাপাশি। আর এ জন্য আমি একাই এসেছি এখানে। স্ত্রী, পুত্র, কন্যা রয়ে গিয়েছে আমার জন্ম স্থান এবং প্রাণের শহর জলপাইগুড়িতে।
আমি একটু ভাবুক বরাবরই। তাই অফিসের কাজ করতে করতে দূরে জানালা দিয়ে পাহাড় আর মেঘের খেলা দেখতে দেখতে কোথায় যেন হারিয়ে যাই মাঝে মাঝেই । শুনশান শীতের রাত্রিতে একা একা দার্জিলিং এর চৌরাস্তা বা ম্যালে গিয়ে বসে থাকি। ম্যালে আকাশ একদম হাতের নাগালে মনে হয় । হারিয়ে যাই সেখানে আমি। কিম্বা ভোরবেলা চলে যাই মহাকাল মন্দিরে – সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখি প্রাণ ভরে। সাদা বরফের মুকুট মাথায় দিয়ে প্রভাতী সূর্যের রক্তিম আভা গায়ে মেখে কাঞ্চনজঙ্ঘা আমাকে ডাকে যেন। এই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য টাইগার হিলে অব্দি গিয়েছি বেশ কয়েকবার। এখানে এসে ধীরে ধীরে নেপালি ভাষাটাও আয়ত্ত করে নিয়েছি। এমনকি বলতে সঙ্কোচ নেই যে নেপালি ভাষাতে বেশ কয়েকটি কবিতাও লিখে ফেলেছি। দুটি কবিতা এখানকার “ হিমালয় দর্পণ “ সংবাদপত্রে প্রকাশিতও হয়েছে। একজন বাঙালি হয়ে নেপালি ভাষাতে কবিতা লেখার জন্য এখানকার গোর্খা পার্বত্য পরিষদ আমাকে একটি অনুষ্ঠানে সম্বর্ধনাও দিয়েছে। আমি সত্যিই আবেগমথিত হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন।
সেদিনও অফিসে বসে মন দিয়ে কাজ করছিলাম। কুয়াশা মাখা জানুয়ারি মাসের একটি শীতল দিন। হাল্কা হাল্কা বৃষ্টিও পড়াতে শীতটা যেন রুম হীটারকে উপেক্ষা করে গায়ে এসে চাবুক মারছিল। হঠাৎ মনে হল কে যেন আমাকে দেখেছে। একটা সিক্স্থ সেন্স কাজ করল যেন। ফাইল থেকে চোখ উঠিয়ে সামনে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে তাকাতেই বুঝলাম আমিই ঠিক। একটি সুন্দরী নেপালী মেয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ফর্সা ধবধবে চেহারা, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। মায়াবী চেহারা। আমি চোখ নামিয়ে নিলাম। আমার মাথায় তখন অন্য জিনিস ঘুরপাক খাচ্ছে – এ মুখ আমার খুব চেনা – কোথায় যেন দেখেছি। আমি আবার চোখ তুললাম – কিন্তু অদ্ভুত, মেয়েটিকে দেখতে পেলাম না। একটু অবাক হলাম আমি। এই তো ছিল, গেল কোথায় !!!
রাত্রে কোয়ার্টারে ফিরে টিফিন করে নিজের রুমে গিয়ে টিভি খুলে বসলাম। কিন্তু মেয়েটির মুখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চোখের সামনে ভাসতে লাগল। একটা স্বপ্নের আবেশে আমি যেন ডুবে যাচ্ছিলাম। এরকম কোনদিন হয়নি। ডিনার করলাম সেদিন একটু তাড়াতাড়ি। চ্যাপ্টা নাক, ছোটো চোখ আর উঁচু গালের নেপালি কুক জিজ্ঞাসা করে বসল : “ কি ভায়ো দাজু…. এস্ত ছিট অজু ডিনার গরদেইছ তপাইলে? সব ঠিক ছ তো?” ( কি হল দাদা,এত তাড়াতাড়ি আজকে ডিনার করছেন? সব ঠিক আছে তো?)। আমি উত্তর না দিয়ে একটু এড়িয়ে যাওয়ার হাসি হাসলাম।
আগেই বলেছি নেপালি ভাষাটা ধীরে ধীরে আয়ত্ত করেছি। গত ছয় মাস ধরে নিজের আগ্রহে আমি নেপালি শিখছি – ভুল বলতে বলতে এখন মোটমুটি ঠিক ঠাক বলি – আমি সবাইকে আমার সঙ্গে নেপালিতেই কথা বলতে বলি চর্চার জন্য। আমাকে নিরুত্তর দেখে আমার নেপালি কুক আবারও একই প্রশ্ন করাতে আমি নেপালিতেই উত্তর দিলাম : “ এস্তৈ গরদেইছু আজু…সব ঠিকই ছ…”( এমনি খাচ্ছি আজকে তাড়াতাড়ি…. সব ঠিকই আছে…)
রাত্রে ঘুমোতে যাবার সময় ব্যাপারটা পরিষ্কার হল – আমার মনে পড়ে গেল মেয়েটিকে আমি কোথায় দেখেছি…স্বপ্নে…মেয়েটিকে আমি মাঝে মাঝেই স্বপ্নে দেখি…বিচিত্র সে সব স্বপ্ন… বেশির ভাগই ভালোবাসার – প্রেমের – কিন্তু দিনের বেলায় সে সব কিছু মনেও থাকে না…আজকে অফিসে ঘটনাটা না ঘটলে সে ভাবে হয়ত আজকেও মনে পড়ত না। আপনার হয়ত অবাক হচ্ছেন ভেবে যে এ আবার কি রকম কথা !!! এরকম আবার হয় নাকি ???? কিন্তু, বাস্তব হল এটাই যে মেয়েটিকে আমি সত্যিই স্বপ্নে দেখেছি অনেকবার – বিশ্বাস করুন।
এরপর বেশ কয়েকটি দিন কেটে গিয়েছে। সেরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। ঘটনাটি মন থেকে প্রায় মুছতেই বসেছিল। অফিসের কাজেও খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। অডিট আসবে আর কিছুদিন পর। ফাইল পত্র সব নিখুঁত করার চেষ্টা করছি। ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হওয়ার জন্য গোটা অফিসের দায়িত্ব আমার – তাই, সবদিকে নজর রাখতে হচ্ছে। আজকে সকাল থেকে শীতটা যেন একটু বেশি। কুয়াশাও বেশ ঘন আর ছিপছিপে বৃষ্টিও হয়েই চলেছে। দার্জিলিং থাকলে একটা ছাতা আর হাল্কা জ্যাকেট বা সোয়েটার বারোমাসই এমনকি গরম কালেও সঙ্গে রাখতে লাগে – কারন কখন যে বৃষ্টি আর ঠান্ডা এক সাথে নেমে আসবে কেউ বলতে পারে না। পাহাড়ের রানীর মুড সত্যিই বোঝা দায়।
হঠাৎ কিছু একটা হল – আচমকা গোটা দার্জিলিং শহর ঘন কালো মেঘে যেন ঢেকে গেল…বাইরে দুপুর ১২ টা র সময়ও কিছু দেখা যাচ্ছে না…আচমকা বিদ্যুত চলে গেল…প্রচন্ড জোরে মেঘ ডাকতে লাগল। বিদ্যুত চমকাচ্ছে আকাশে। প্রবল বৃষ্টি শুরু হল। কিন্তু তারপর যেটা হল, সেটার জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউই। চারিদিকে প্রবল শব্দ শুরু হল। শিল পড়ছে। শিলাবৃষ্টি। কিন্তু যে সে শিলা বৃষ্টি নয়…. অস্বাভাবিক শিলাবৃষ্টি। আমি জীবন বীমা নিগমের অফিসের চার তলা থেকে নীচে জাজ বাজারের রাস্তায় তাকিয়ে দেখলাম পুরো রাস্তা শিল দিয়ে ঢেকে গিয়েছে…আশেপাশের বাড়ি, হোটেলের চালগুলোও শিল পড়ে সাদা হয়ে গিয়েছে – মনে হচ্ছে যেন তুষারপাত হয়েছে। প্রায় ৪৫ মিনিট প্রবল শিলাবৃষ্টি হবার পর প্রকৃতি শান্ত হল। সে এক ভয়ানক ব্যাপার !!!
আমরা অফিসের লোকজন চারতলার থেকে নীচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পুরু শিলে গোটা দার্জিলিং শহর যেন ঢাকা পড়ে গিয়েছে। দু একজন বলাবলি করছে যে বাবা ঠাকুর্দার কাছে শুনেছিল প্রায় ১০০ বছর আগে এ রকম তুমুল শিলা বৃষ্টিতে গোটা দার্জিলিং শহর ঢেকে গিয়েছিল। সেই শিল গলে গিয়ে দার্জিলিংকে আগের জায়গায় ফিরে আসতে দিন পনেরো লেগেছিল। আজকেও যা অবস্থা দেখছি সেটা অভাবনীয়। নীচে রাস্তায় পুরু শিল। লোকজন হাঁটতে গিয়ে পা ঢুকে যাচ্ছে শিলে। কেউ কেউ স্লিপ কেটে পড়েও যাচ্ছে রাস্তায়। তবে একটা বিষয় না বললেই নয় – সাদা চাদরে মুড়ে গিয়ে দার্জিলিং শহরকে যেন অপরূপা লাগছে আরো।
আমি একটু আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম – হঠাৎ মনে হল কে যেন আমাকে দেখছে – ঠিক সেই দিনকার মত অনুভূতি। আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না। মনের ভুল ভেবে যেই নীচে রাস্তার দিকে তাকিয়েছি – চমকে উঠেছি – সেদিনের সেই মেয়েটি নীচ থেকে ওপরে আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমার সারা শরীরে রোমাঞ্চ খেলতে লাগল – আগেরবারের ভুল এবার আর করলাম না – চোখ না সরিয়ে আমিও মেয়েটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম – এভাবে কতক্ষণ কেটেছে জানি না – আশেপাশের কারো কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না যেন -সম্বিত ফিরল যখন দেখলাম মেয়েটি ধীরে ধীরে দার্জিলিং রেল স্টেশনের দিকে হাঁটা দিয়েছে। আমার কি হল জানি না, কিন্তু মনে হল কে যেন আমাকে টেনে নীচে নিয়ে যাচ্ছে। আমি দ্রুত নীচে নেমে শিল দিয়ে মোড়া জাজ বাজারের রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম।
ঐ তো মেয়েটি যাচ্ছে। লাল রঙের সুন্দর একটি সোয়েটার পরা – খোলা বাদামী রঙ করা চুল। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে স্টেশনের দিকে। আমি সব কিছু ভুলে গিয়ে মেয়েটিকে অনুসরণ করা শুরু করলাম – একবার রাস্তায় পড়েও গেলাম স্লিপ কেটে – কিন্ত আমার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি দ্রুত উঠে মেয়েটির পেছনে চলতে লাগলাম। বলা ভাল আমার ভেতর থেকে কে যেন আমাকে টেনে নিয়ে এসব করাচ্ছে মনে হল। মেয়েটি উঁচু হিল পরে ছিল কিন্তু একবারও পুরু শিলে ঢাকা রাস্তায় পড়ে যায়নি। আমি এর মধ্যেই তিনবার পড়েছি -উঠেছি।
মেয়েটি ধীরে ধীরে দার্জিলিং স্টেশনে প্রবেশ করল, তারপর প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করে পাশের গুম্ফটার সিঁড়ি ধরে নামা শুরু করল। দার্জিলিং স্টেশনের পাশে এই গুম্ফাটি সর্বজনবিদিত। মেয়েটি কিন্তু গুম্ফায় প্রবেশ করল না। গুম্ফার পাশে বাগানটা ধরে এগোতে লাগল সামনে বিশাল খাদের দিকে – পেছনে আমি অনুসরণ করছি মন্ত্রমুগ্ধের মত। মেয়েটি খাদের একদম কিনারায়- আরেকটু হলেই খাদে পড়ে যাবে, পেছনে আমি। মেয়েটি এবার আমার দিকে ফিরে মায়াবী হাসি দিল – হাত বাড়িয়ে দিল আমার দিকে – আমি সম্মোহিতের মত খাদের কিনারায় ওর হাত ধরার জন্য পা বাড়ালাম – সারা শরীরে আমার রোমাঞ্চ।
“কি করতেছেন আপনি? “ নেপালি টানে বাংলা উচ্চারণ করে কে যেন আমাকে জাপটে ধরল হঠাৎ পেছন থেকে। তাকিয়ে দেখি গুম্ফার এক লামা আমাকে জাপটে ধরে আছে। মুখে চোখে বিস্ময়।
“ খাদ মা গির্নু সখস তপাই…খাদে পড়ে যাবেন…” লামা বলে উঠলেন।
আমি অবাক চোখে ওঁকে বললাম- “ কিন্ত মেয়েটি…..?”
“কোন মেয়ে? কোনো মেয়ে নাই…আপনি একা একা খাদের একদম কিনারার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন দেখে আমি ছুটে আসলাম…. ভাবলাম আপনি আত্মহত্যা করবেন বোধ হয়…” লামা এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল। তারপর নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে।
আর আমি অবাক চোখে সামনের খাদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম দেখলাম ধূ ধূ সাদা কুয়াশা কিম্বা মেঘ….. কোনো মেয়ের চিহ্নমাত্র নেই।