ছোটগল্পে নন্দিনী চট্টোপাধ্যায়

বসন্ত পবন

অনুশকা বালিশের ওপর শুয়ে বব ডিলানের গান শুনছিল। কানে ইয়ার প্লাগ গুঁজে বালিশে মুখ ডুবিয়ে এই সব পুরনো গান শুনতে যা লাগে না আঃ। গানের আমেজে অনুশকা পারলে নিজের গালেই নিজে চুমু দেয় আর কি।
টুংটাং করে রিংটোন বেজে উঠতে স্ক্রিনে চোখ ফেলল অনুশকা। বিশেষ একটি নাম ভেসে উঠছে সেখানে। এই নামের মালিক কে সে নামে নয় অন্য কোন সম্বোধনে চিনত। কিন্তু আজ সবই স্মৃতি। অনীক নামে একটা ছেলের ফোন পাওয়ার আকুতি সেই কবেই ঘুচে গেছে অনুশকার।
তবু সেই দিনটার কথা আজও বড্ড মনে পড়ে যেদিন সম্পর্কটা ভেঙে যাচ্ছে দেখে সে পাগলের মতো অনীকের মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে ছিল। আন্টির হাতদুটো ধরে বলে ছিল
—–আন্টি একটু দেখ না তুমি। আমাদের সম্পর্কটা ভেঙে যাচ্ছে গো। তুমি তো দেখেছ যে অনীকের জন্য আমি কতটা—
—-কতটা কি?
অনীকের পরমাসুন্দরী মা মুচকি হেসে ছিলেন। আর
অনুশকা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল ওনার দিকে। সত্যি এই বয়সেও ভদ্রমহিলা মারকাটারি সুন্দরী যা হোক। মাঝে মাঝে তো অনুশকার মনে হতো আচ্ছা একচুয়ালি সে কার প্রেমের কাঙাল? অনীকের না অনীকের মায়ের? অনুশকা নিজে দেখতে সাধারণ হলেও রূপের প্রতি তার একটা অমোঘ আকর্ষণ আছে। সুন্দর দেখতে নারী পুরুষদের সে পছন্দ করে। তবে অনীক তার ছ’ ফুটিয়া চেহারা আর তপ্ত গৌরবর্ণ নিয়েও মায়ের ধারে কাছে লাগত না। অনীকের ঝকঝকে মা এসে দাঁড়ালেই বাকি সব কিছু কেমন ম্যাড়মেড়ে হয়ে যেত। আন্টি তাকে কিছু বললে সে প্রায় ধন্য হয়ে যেত। আন্টি ছিল তার সব ভরসার কেন্দ্রস্থল। বাড়িতেও আন্টির প্রশংসা করে সে তার মাকে প্রায় পাগল করে দিত। আসলে অনীকের মায়ের এমন একটি বিভা ছিল যে কিছু করে দেখাতে পারুক আর নাই পারুক লোকজন মুগ্ধ হয়ে যেত।
সেই বিশ্বাস থেকেই আন্টিকে কথাটা বলেছিল অনুশকা। অনীক কে হারাতে চায় নি সে। সম্পর্কটা তলানিতে আসার আগে অবধি সে নিজেই তো বুঝতে পারে নি যে অনীক কে হারানো তার কাছে কতটা কষ্টের। আসল কথাটা ছিল যে সে অনীককে সারা মন জুড়ে বসিয়ে রাখলেও অনীক একটি দিনের জন্যও তাকে সে ভাবে গ্রহণ করেনি। সে ছাড়াও অনীকের আরও দু তিন জন গার্ল ফ্রেন্ড ছিল। হায়ার সেকেন্ডারি পড়ার সময় থেকেই অনীকের কথা ও কাজের মধ্যে মিল পেত না অনুশকা। অনীককে জিজ্ঞেস করলে সে বলত
—–উফ তুই বড় বেশি ভাবিস অনু। প্লিজ এত ভাবিস না। যেটুকু সময় আমার কাছে থাকিস সে টুকু অন্তত আমাকে ভালো করে প্রেম করতে দে। প্লিজ।
অনুশকা ভুলে যেত সব। ভুলে যেত অজস্র গরমিল আর না কষা অংকের হিসেব। সেই ক্লাস নাইন থেকে এই সেকেন্ড ইয়ার। ছ’বছরের উথাল পাথাল মান অভিমানের গল্প তাদের। অনুশকার চোখের জলে মোতি আর অনীকের হাসিতে ঝলমলে মুক্তো। সেই প্রেমটা ভেঙে যাচ্ছে এটা অনুশকা কিছুতে মানতে পারছিল না। পৃথিবীতে এমন কে আছে যে তার চাইতে বেশি করে অনীক কে ভরিয়ে তুলতে পারবে? কে ওই মেয়ে গুলো যারা অনীককে বার বার মেসেজ করে আর অনীক গোটা ব্যাপারটাতে অনুশকার কাছে বার বার মিথ্যে বলে পরিস্থিতি উত্তরোত্তর ঘোরালো করে তোলে?
অনীকের মা উপাসনা অনুশকার কথা শুনে একটু মুচকি হেসে বিষয়টা লঘু করে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু এ মেয়ে নাছোড়বান্দা দেখে আলগোছে জিজ্ঞেস করলেন
——কেন ভাঙছে সম্পর্ক? আই মিন বন্ধুত্ব?
অনুশকা কান্না ভেজা গলায় বলে ছিল
—–অনীক আমাকে সবসময় মিথ্যে বলে ঠকিয়ে যাচ্ছে আন্টি। সত্যিটা হল ও আরো অন্যান্য মেয়ে দেরও টাইম দিচ্ছে। আমি জাস্ট ভাবতে পারি না আন্টি। আমরা সেই কবে থেকে দুজন দুজনের—-
—–দুজন দুজনের কি বলতো?
উপাসনা চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলে চলেছিলেন।
অনুশকা অবাক হয়ে গিয়েছিল। এই কি সেই ভদ্রমহিলা যিনি প্রায় সবসময় বলতেন
অনু তুই আমার বাড়িতে চলে আসলে আমি আর আংকেল তোর কাছে আমাদের ছেলেটাকে ফেলে দিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্যুর করে আসব। প্রেম করে বিয়ে করে ছিলাম বলে তোর আংকেল আর আমার ঠিক ঠাক হানিমুনটাও হয় নি। তোরা শুধু একটু দাঁড়িয়ে নে। আমি শুধু সেই দিনের আশায় বসে আছি।
এই সব কথায় অনুশকা মোমের মতো গলতে থাকত। ভালোবাসা কথাটাই যে এত সুন্দর তা কি আন্টিকে না দেখলে সে পুরোপুরি জানতে পারত? মনে মনে ঈশ্বর কে থ্যাংকস দিত অনুশকা নামের একটা সাধারণ দেখতে মেয়ে। এমন সুন্দরী স্নেহময়ী একটি মাকেও সে অনীকের সঙ্গে ফাউ পাবে এই ভাবনাটা খুব তৃপ্তি দিত তাকে। কিন্তু আজ এসব কি বলছেন উনি!! অনুশকা কোনমতে বলেছিল
——-তুমি একটু ওর সঙ্গে কথা বলো না আন্টি। তাহলে ও ঠিক আবার আগের মতো হয়ে যাবে। দেখো। আমি—-
অনুশকাকে কথা শেষ করতে দেননি উপাসনা। নির্লিপ্ত ভাবে বলেছিলেন
—–অনীকের সঙ্গে যদি বন্ধুত্ব রাখতে না চাও তো রেখো না। সকলেরই অল্প বয়সে এরকম দু তিনটে কেস হয়। আবার যে যার আলাদা পার্টনার দেখেও নেয়। তুমিও তাই কর না। প্যানপ্যান করে সময় নষ্ট করে দিও না প্লিজ।
উপাসনা আর দাঁড়িয়ে থাকেননি। শপিংমলে এক বান্ধবী অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। সিনেমা দেখার কথাও আছে। উপাসনা উঠে যাওয়ার পর আর বসে থাকার কোন মানে হয় না। চরম অপমানিত হয়ে অনীকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল অনুশকা। উপাসনার কাছ থেকে পাওয়া আঘাতটা অনীকের বলা মিথ্যেগুলোর চাইতে অনেক বেশি বাজিয়ে ছিলো অনুশকাকে। উপাসনাকে সে মায়ের আসনে বসিয়ে ছিল।
অনীকের সাথে সে এরপর আর দেখা করতে চায়নি। গুটিয়ে গেছিল নিজের মধ্যে। নিজের চারপাশে গুটি পোকার মতো একটা শক্ত গুটি বানিয়ে নিয়েছিল অনুশকা। কারো সাথে বিশেষ কথা বার্তাও বলত না । এড়িয়ে চলত কমন ফ্রেন্ড দের।
ছেলেবেলার প্রেম ভাঙলে কতটা কষ্ট হয় বুঝতে পেরে ছিলেন অনুশকার মা। মেয়েকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে অনীকের সঙ্গে আবার একবার সামনাসামনি কথা বলতে পাঠিয়েছিলেন।
সেদিনও অনুশকা অবাক হয়ে দেখেছিল যে অনীক ব্রেকআপের বিষয়ে কিছুই বলছে না। বরাবর সে যেমন বলে এসেছে ঠিক সেই একই ধারায় সে অনর্গল মিথ্যে বলে চলেছে। একই ভাবে বলে চলেছে
—–অনু তুই এখনো আমাকে ভুল বুঝছিস রে। তুই আমাকে ছেড়ে যাস না প্লিজ। তুই চলে গেলে আমি কি করব আমি জানি না। আমি হয়তো মরেই যাব।
অনুশকা হতবাক হয়ে গিয়ে বলেছিল
——-আমি তোর ফেসবুক একাউন্ট হ্যাক করেছি। আমার যা দেখার দেখা হয়ে গেছে রে। তুই এরপর আর কিছু বলবি কি আমাকে?
অনীক থামেনি। স্বভাব বশে অনেক কিছু বলতে শুরু করে ছিল আবার। কিন্তু অনুশকা আর কিছু শোনার প্রয়োজন মনে করেনি। চলে এসেছিল
বরাবরের মত।
তারপর কেটে গেছে তিনটি বছর। কোন যোগাযোগ ছিল না। বলতে গেলে মুখ দেখাদেখিই বন্ধ। সেখানে অনীক আবার কেন ফোন করছে! কি ব্যাপার?
ধরবে না ভেবে ওর ফোনটা না ধরে পারল না অনুশকা।
—-হ্যালো
—-আমি অনি রে।
——হ্যাঁ বল কি বলবি।
——আমাকে আর এক বার ক্ষমা করবি অনু?
কত বড় সাহস!! বলে কিনা অনু আমায় ক্ষমা কর। অনুশকা কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকে। অনীক বলে
—-আমি তোর সাথে অনেক অন্যায় করেছি।
অনুশকা নির্লিপ্ত ভাবে বলে
—-তো কী?
—-না বলছিলাম আর কি।
—-তুই আর কিছু বলবি অনীক?
—–হ্যাঁ। তুই আমার খুব ভালো বন্ধু। তাই আজ তোকে একবার ফোন না করে পারলাম না। তোকে একটা কথা বলার ছিল। আমার মা কাল মারা গেছেন রে অনু।
অনীক হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে।
উপাসনা আর নেই? সেই অনিন্দ্য সুন্দর অপরূপা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে!!
অনুশকা প্রথমটা ভাবল তারও বোধহয় খুব কান্না পাচ্ছে।। এক সময় আন্টি খুব স্নেহ করতেন অনুশকাকে বা অনুশকা ওরকম ভেবে তৃপ্তি পেত। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো ধুসস কোন কান্না পাচ্ছে না তার। বরং বুকের মধ্যে ফুরফুর করে কি যেন একটা চোরা স্রোত বয়ে চলেছে। সে ঠিক বুঝতে পারে না বুকের মধ্যে এ কিসের কাঁপন! সে খুব কষ্ট করে বলে
—আই এ্যাম সো সরি রে। সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছে তোর। যাক সাবধানে থাকিস। তবে ফোন করলি যখন আমার একটা ভালো খবর তোকে না দিয়ে পারছি না। এম এস সি তে আমার সাবজেক্টে ইউনিভার্সিটি টপ করেছি আমি। তুই শুনে নিশ্চয়ই খুবই খুশি হবি।
অনীক কোন মতে বলে
কনগ্রাচুলেশনস।
থ্যাংকস রে। টেক কেয়ার।
দুদিকেই কেটে যায় ফোন।
আরে এখনও তো বইছে সেই স্রোত। শিরশির করছে গাটা হঠাৎই।এসব কিসের জন্য হয়? অনুশকা ভেবে পায় না।
ও হো বসন্ত আসছে যে। এ সময় হালকা মিষ্টি হাওয়ায় একটু আধটু কাঁপন লাগে গায়ে।
অনুশকা ওড়নাটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নেয়।।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।