“বিভূতির পথে অপুর সাথে” পথের গল্প না পাঁচালী -তে নিবেদিতা চক্রবর্তী

একটি সত্যি ভুতের গল্প
ইমার্জেন্সির সামনে থিক থিক করছে মানুষের ভিড়। শ্রাবনের গুমোট সন্ধ্যায়, জল কাদা মাখামাখি রাস্তায় টাটকা লাল রক্তের স্রোত, নিয়নের আলো মেখে যেন এক অদৃশ্য ইশারায় মেতেছে।
গেটের সামনেই থমকে গেল অভিপ্সা। বুঝতে পারল, কিছু একটা অঘটন ঘটে গেছে একটু আগেই। ইমার্জেন্সির সামনে, ছোট্ট জটলাটা ক্ষিপ্রগতিতে পার হতে হতে মেট্রন অফিস পৌঁছে গেল সে।
কলকাতার রাস্তায় যানজট নিত্য দিনের গল্প। তারমধ্যে এই ঝড় বৃষ্টি। আজ নাইট ডিউটিতে প্রায় এক ঘন্টা লেট অভিপ্সার। একরকম প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে অ্যাটেনডেন্স দিতে গেল অভিপ্সা। সামনের চেয়ারে বসা ম্যাম একটু বিরক্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “গো ফাস্ট এন্ড টেক হ্যান্ডওভার।” ওয়ার্ডে যখন ঢুকলো অভিপ্সা, বিথী ততক্ষনে হ্যান্ডওভার নিয়ে ইভিনিং শিফট এর মেয়েকে ছেড়ে দিয়েছে। বৃষ্টি জল কাদা মাখামাখি হয়ে অভিপ্সা, চেঞ্জ করে আসার জন্য বিথীর কাছে একটু সময় চেয়ে নেয়। নার্সারিতে ঢোকার মুখে, অভিপ্সা দেখল,একটি ছোট্ট শিশুকে অজ্ঞান এবং ভীষণরকম আহত অবস্থায় এডমিশন করা হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি বাচ্চাটিকে বেডে সিফ্ট করা হলো। হার্ট রেট, ব্লাড প্রেসার, অক্সিজেন স্যাচুরেশন, সবই খুব কম। ডক্টর বললেন,” সিস্টার তাড়াতাড়ি সব রেডি করুন। বাচ্চাকে ভেন্টিলেটরে দিতে হবে।” অভিপ্সা চোখের নিমেষে, ইমারজেন্সি ইঞ্জেকশন, মেডিসিন, ইত্যাদি রেডি করতে থাকে। বিথী ভেন্টিলেটার রেডি করতে থাকে। ডক্টর ব্যানার্জি বললেন,” সিস্টার, বাচ্চাটির অবস্থা খুবই খারাপ। রাতে আমি পাশের ঘরে থাকবো। দরকার হলেই ডেকে নেবেন।”
বাচ্চাটিকে ভেন্টিলেশনে দেওয়া হল। কিছুক্ষণ পর বাচ্চাটি কিছুটা স্টেবলও হলো। বাচ্চাটির বয়স আড়াই বছর। মুখ, মাথা, চোখ ভীষণ রকম ফুলে গেছে। শরীরের বাকি অংশ সাদা ব্যান্ডেজে বাধা। অভিপ্সার মনের ভিতরে যেন গুমরে উঠলো তার মাতৃমন। আজ ডিউটি আসার পথে ছেলেটার গায়ে 101 ডিগ্রি জ্বর দেখে এসেছে।কান্নাকাটি করছিল খুব। কিছুতেই মাকে ডিউটি আসতে দেবে না। এইসব ভাবতে ভাবতে অভিপ্সা ফোনটা তুলে নিয়ে বাড়িতে একবার ফোন করে, জানতে পারে, জয়ের জ্বরটা কিছুটা কমেছে। নিশ্চিন্ত মনে সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে, নার্সিং স্টেশনের গোলটেবিলটাতে চেয়ার টেনে বসে অভিপ্সা। পেপার ওয়ার্কস, সকালের ইঞ্জেকশনস মেডিসিনস ইত্যাদি রেডি করতে থাকে। বাচ্চাটির অবস্থা যেহেতু খুবই খারাপ, তাই, বাচ্চাটি কে আলাদা একটি ঘরে রাখা হয়েছে। অন্য আরেকটি ঘরে, অন্য বাচ্চাদের এটেন্ড করছে বিথী। প্রায় রাত দশটার সময় এল ‘গ্রুপ ডি’ লক্ষী মাসি। ঝড় জলের রাতে,এত দেরি করে আসার জন্য মনে মনে বিরক্ত হলেও কিছু বলল না অভিপ্সা। রাত প্রায় 12 টার সময়, গেটে আওয়াজ পেয়ে, অভিপ্সা দেখে, একজন ভদ্রলোক হাতের প্লাস্টিকে ব্লাড ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে এসেছেন। ব্লাড রিসিভ করতে করতে, অভিপ্সা জানতে পারে, উনি বাচ্চাটির বাবা। অভিপ্সা জিজ্ঞেস করে, এমন ঘটনা কি করে হলো। চোখের জল মুছতে মুছতে ভদ্রলোক জানান, মায়ের হাত ধরে রাস্তা পার হতে গিয়ে, একটি লরি এসে… এ পর্যন্ত বলে ভদ্রলোক কঁকিয়ে কেঁদে উঠলেন। ওনাকে আশ্বস্ত করতে করতে, অভিপ্সা বলে, ” আপনারা বাইরে অপেক্ষা করুন, কোন কিছু দরকার হলেই ডেকে পাঠানো হবে।” মেন গেট বন্ধ করে, আবার ভেতরে এসে বসে অভিপ্সা। নার্সারীর ছোট্ট কাঁচের ঘরটির উল্টো দিকে, একটি ছোট্ট স্পেস। ওখানে একটি বহুদিনের পুরনো লিফ্ট আছে। ওই লিফ্টের দিকে সরাসরি এই ঘরে ঢোকার একটি দরজাও আছে। তবে লিফ্ট খারাপ হওয়ার পর থেকে বহুদিন হলো দরজাটি তালা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। রাত প্রায় দু’টোর সময় কিছু আওয়াজ শুনে, অভিপ্সা তাকিয়ে দেখে, উল্টোদিকের কাচের দরজায়, অন্ধকারে একজন মহিলা বাচ্চাটির দিকে আঙ্গুল তুলে কিছু দেখাতে চাইছে। হতভম্ব অভিপ্সা সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করে, মনিটর স্ট্রেট লাইন দেখাচ্ছে। হার্ট রেট জিরো। সেই মুহূর্তে মনিটরের রেড অ্যালার্মও বাজতে শুরু করেছে। অভীপ্সা চিৎকার করতে থাকে “ডক্টর ব্যানার্জি ডক্টর ব্যানার্জি…. ” চিৎকার করতে করতেই সিপিআর দিতে শুরু করে সে। এক মিনিটের মধ্যে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসেন ডক্টর ব্যানার্জি। কিছুক্ষণ খন্ডযুদ্ধের পর বোঝা গেল বাচ্চাটিকে কোনোভাবেই ফেরানো যাবে না। ডক্টর ব্যানার্জি বললেন,” সিস্টার বাড়ির লোক বাইরে আছেন তো? ওনাদের ডাকুন। খবরটা দিতে হবে।” হঠাৎ কি মনে হয় অভিপ্সার, ডক্টর ব্যানার্জি কে জিজ্ঞাসা করে,” আচ্ছা আপনি কি আমার চিৎকার শুনে ছুটে এলেন?” ডক্টর বিশ্বাস অবাক হয়ে বলেন,” না তো? বন্ধ কাচের ঘরের আওয়াজ ওপাশ থেকে আমি পাব কিভাবে? আমাকে তো ডেকে দিল লক্ষ্মী মাসি।” ” লক্ষ্মী মাসি? সেতো পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছে! সে কিভাবে জানবে এখানে বাচ্চা খারাপ হয়েছে?” ” অতশত জানিনা। ওইতো বলল দিদি ডাকছে, তাড়াতাড়ি যান। বাচ্চাটা খারাপ আছে।” হাঁপাতে হাঁপাতে এক ছুট্টে অভিপ্সা পাশের ঘরে গিয়ে দেখে, লক্ষী মাসি তখন অকাতরে ঘুমোচ্ছে। একটু আগে ঘটে যাওয়া তোলপাড় সে টেরও পায়নি। তবু কি ভেবে, ঘুম থেকে ডেকে তুলে জিজ্ঞাসা করল,”লক্ষী মাসি, তুমি কি ডাক্তারবাবুকে ডাকতে গিয়েছিলে?” চোখ রগড়ে আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলতে তুলতে লক্ষী মাসি বলল “আমি? না আমি তো ডাকতে যাইনি?” বলার সাথে সাথে বুকটা ধড়াস করে ওঠে অভিপ্সার। একটা প্রশ্ন তার মনে এতক্ষণ আসেনি, এবার এলো। “সে নিজে কিভাবে টের পেল? মনিটর অ্যালার্ম দেওয়ার আগেই, পেপার ওয়ার্ক করতে করতে, কাচের দরজায় ধাক্কা দিয়ে কেউ আওয়াজ করেছিল। সেই শব্দে চোখ চলে গিয়েছিল ওই পুরনো বন্ধ হয়ে যাওয়া কাচের দরজার দিকে। তার পরিষ্কার মনে আছে, আবছা অন্ধকারে,তাকিয়ে দেখে ছিল, একজন শাড়ি পরা ভদ্র মহিলা। আঙ্গুল তুলে বাচ্চাটির দিকে দেখাচ্ছে। কিন্তু ওই দিকের দরজা এবং লিফ্ট দুটোই তো বন্ধ! তবে… তবে কি!