ক্যাফে গল্পে মুহাম্মদ সেলিম রেজা

ছেঁড়া পাণ্ডুলিপি

 

ফাল্গুনের এক মিঠে বিকেল। তাজকেরা বিবি পুকুর ঘাটে দুপুরের এঁটো থালাবাসন ধুতে এসেছে। একখানা কাঁসার থালা মাজতে মাজতে স্বামীকে মাঠের দিকে যেতে দেখে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল, অ আরসেলার বাপ, ই-সুময় তুমি কোতি য‍্যাছো?
– কবে থ‍্যাকি মাঠে য‍্যায়েনি। ফসলগুল‍্যা ক‍্যামুন আছে কে জানে, এট্টু দ‍্যাখি এ‍্যাসি। মিউ মিউ করে বলল সাদের আলি।
– না না! এ‍্যাই শরীল লি তুমাকে কোতু য‍্যাতে হোবে না। তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসে স্বামীর হাত ধরে বাড়ির দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকল তাজকেরা। – ডাক্তোর তুমাকে এ‍্যাখুন বাড়ি থ‍্যাকি বেরহ‍্যাতে বারুণ কোর‍্যাছে। আগে ভালো হও, তাপ্পর….
– বাড়িতে বোসি থাকতে আর ভাল্লাগে না। কতদিন খুলা আকাশ দেখিয়েনি, সবুজমাঠ দেখিয়েনি। এট্টু ঘুরি এ‍্যাসি।
– অতোবড়ো রোগ থ‍্যাকি এ‍্যাই উটল‍্যা। কতো ধকল গেলছে এই শরীলের উপর দি। যদ্দিন সাব্বল না হোছো হামি তুমাকে কোতু য‍্যাতে দিবো না।
– মুন্নাকুরির মাঠ, এ‍্যাইতো ক’-পা গহন। যাবো আর এ‍্যাসবো। অতঃপর হঠাৎ করে প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে সাদের আলি বিবিকে জিজ্ঞাসা করল, হা হে আরসেলার মা মুন্নাকুরির ডাঙাখ‍্যান পতিত পরি আছে না সষ‍্যাটস‍্যা কিছু ছিটালছো?
বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে মুন্নাকুরি মাঠ। সেখানে কাঠা সাতেক ডাঙাজমি আছে তাদের। বছর সাতেক আগে জায়গাটা কিনে তাজকেরার নামে লিখে দিয়েছে সাদের। দাদো কখন তার নামে এলআইসি পলিসি কিনে রেখেছিল জানা ছিল না। সে বছর পলিসিটা ম‍্যাচুয়‍্যোর করলে লাখ তিনেক টাকা হাতে আসে। অনেকে ব‍্যাঙ্কে ফিক্সড করার কথা বলেছিল। তাগিদ অনুভব করেনি সাদের। বরং খানিকটা মাটি কিনে রাখা উত্তম মনে হয়েছিল তার। আর যাইহোক মাটি কখনও বেইমানি করে না। চাষী মানুষ, মাটির সাথে নিবিড় সম্পর্ক। মাটির গন্ধে তাদের প্রাণশক্তি পুনুরুজ্জিবিত হয়।
এর মধ‍্যে মুন্নাকুরির মাঠ দিয়ে পাকারাস্তা হয়েছে। ওদিক থেকে দাঁতুড়া গ্রামখানি বাড়তে বাড়তে এদিকে আসছে। আবার আগরডাঙার অনেকেও মুন্নাকুড়ির মাঠে বাড়ি দিচ্ছে। জমির চাহিদা তুঙ্গে, দাম হু হু করে বাড়ছে। সাদের কিনে তখন বিঘে প্রতি দাম ছিল সাড়ে তিন-চার লাখ। এখন দেড়-দু’লাখ টাকা শতক হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। দাম আর একটু উঠলে ডাঙা বেচে দিয়ে মাঠে তিন-চার বিঘে জমি কেনা যায়। সেরকম বাসনা এতদিন মনে মনে লালন করে এসেছে সাদের।
– উ-মাঠে য‍্যায় কাম ন‍্যাই। বাড়িতে থাকো। একপ্রকার জোর করে স্বামীকে বাড়ির ভিতরে পাঠিয়ে দিল তাজকেরা। তারপর বাইরে থেকে দরজার শিকল তুলে দিয়ে ঘাট অভিমুখে দৌড় লাগাল। একজোড়া কাঁসার থালা পরে আছে সেখানে। দিনকাল ভালো না, কেউ একখানা তুলে নিয়ে গেলেই হল। গেল বছর ঠিক এমনটাই ঘটেছে তার সাঙ্গে। পুকুরে ওজু করতে গিয়ে কাঁসার বদনাটা ঘাটে রেখে চাচিশ্বাশুরীর বাড়ি ঢুকেছিল । কথায় কথায় একটু দেরী হয়ে যায়। ফিরে দেখে বদনাটা নেই। কে যে সেটা নিয়ে গেল আজ পযর্ন্ত হদিশ পায়নি।
পনের-বিশ বছর আগে কেউ কারও জিনিস কুড়িয়ে পেলে, যতই দামি হোক না কেন খোঁজখবর করে ফিরিয়ে দিয়েছে। প্রতিবেশির সুখ-দুঃখে পাশে থেকেছে। সে সময় আর নেই, আর্থসামাজিক উন্নয়নের সাথে সাথে পরস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের পারাকাষ্ঠা ভেঙে পড়েছে। স্বার্থ নামক পিশাচ জাকিয়ে বসেছে মনুষ‍ের মন জুড়ে। ভাই ভাইয়ের খোঁজ রাখে না। ছেলেমেয়ের মন কাঁদে না বাপ-মায়ের কষ্টে।
সাদের আলির বয়স সাত-আট তখন বাপ মারা যায়। কচুর জমিতে কাজ করতে গিয়ে সাপে কেটেছিল। কাছাকাছি রঘুনাথগঞ্জ হাসপাতাল। আধুনিক চিকিৎসার যথেষ্ট সূযোগ থাকা সত্ত্বেও পীর নির্ভরতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে পারেনি পরিবারের লোকজন। রুগীকে পীরের কছে নিয়ে যায়। তিনি পানিপড়া-তেলপড়া দিয়েছিলেন। কিছু হয়নি তাতে। সারাদিন অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করে শেষরাতে মারা যায় লোকটা।
জাফেরুন তখন ঊনিশ-বিশের তাজা যৌবনবতী। দেখতে ভালো। এক ছেলের মা হলেও শরীরের বাঁধন ধরে রেখেছে। তারওপর স্বামীর সম্পত্তির একটা বড় অংশ তার ভাগে পরে। চাইলে যে কোন ছেলে তাকে বিয়ে করতে হামলে পড়বে। তাতে করে শুধু সম্পত্তি হাতছাড়া হবে তাই নয়, নাতিটার ভবিষ‍্যত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে? এইসব নানা দিক চিন্তা করে দাদো এস্তেফান চাচা আদিল সেখের সাথে মায়ের বিয়ের তোড়জোড় শুরু করেন।
রাজি ছিল না জাফেরুন। যাকে ছোটভাইয়ের চোখে দেখে এসেছি তাকে স্বামীর আসনে বসানো কি সম্ভব? বলেছিল সে। তাছাড়া আদিলের একটা পা পোলিও আক্রান্ত। ক্র‍্যাচের সাহায‍্য নিয়ে চলাফেরা করে। কামকাজ করতে পারে না। যেচে কেন এমন একটি মূল‍্যহীন বোঝা বওয়ার দায় ঘাড় নেবে সে?
‘মেয়ে মানুষের জীবন লতাগাছের সমান’- লতাগাছ যেমন একটি শক্ত অবলম্বন না পেলে উপরে উঠতে পারে না, তেমনি পুরুষের অবলম্বন ছাড়া মেয়েরা পরিচয়হীন। শৈশবে বাবা, যৌবনে স্বামী, বার্ধক‍্যে পুত্রসন্তান; কখনও কারও মেয়ে, কখনও কারও স্ত্রী, কখনও বা কারও মা। এইভাবেই গড়ে উঠেছে সমাজ। সেখানে নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা মূল‍্যহীন। কর্তাব‍্যক্তির সিদ্ধান্ত যতই অপছন্দের হোক না কেন ঘাড়কাত করে মেনে নিতে হয়। জাফেরুনের বেলায়ও তার ব‍্যতিক্রম ঘটেনি। যাবতীয় আপত্তি উপেক্ষা করে একদিন অভিভাবকগন জোর করে আদিল সেখের সাথে তার নিকাহ পড়িয়ে দিল।
এই ঘটনায় শিশু সাদেরের মন ক্ষতবিক্ষত হয়। এতদিন মায়ের উপর তার একক অধিকার ছিল। আবদার করেছে, অন‍্যায় করেছে, জ্বালতন করেছে। আবার সন্ধ‍্যা নামলেই মায়ের কোলে মাথা রেখে ডুব দিয়েছে গভীর ঘুমে। কোন এক যাদুবলে তার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে চাচা। মনে মনে সে চাচাকে খলনায়ক ভাবতে শুরু করে। অথচ আদিল তাকে কম ভালোবাসে তেমন নয়। প্রতিবন্ধী মানুষ, বাড়ি থেকে বের হবার খুব একটা সূযোগ নেই। ভাতিজাকে নিয়েই তার সময় কাটে। সময়ে চান করিয়ে দেয়, তেল মাখিয়ে দেয়। খেতে বসে ভাতিজার মুখে গ্রাস তুলে দেয়। কতদিন সাদের আঙুল কামড়ে দিয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটিয়ে ছেড়েছে। জাফেরুন ছেলেকে বকবকি করলে বলেছে, থাক ভাবি ওকে আর বকো না। জ্ঞান থাকলে কি কেউ কামড়ায়?
বিয়ের কিছুদিনের মধ‍্যে আদিল অনুভব করে সাদেরের মধ‍্যে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো আর কাছে আসে না। আইসক্রিমওয়ালার ডাক শুনে ছুটে এসে বলে না, চাচা এসকেরেপ কিনি দ‍্যাও। কিংবা পিংপং বল নিয়ে ক্রিকেট খেলার আবদার করে না। কেন এমন হল? তার অপরাধ কোথায়? ইত‍্যাদি প্রশ্ন আদিলকে বিচলিত করে তোলে। থাকতে না পেরে একদিন সে সাদেরকে চেপে ধরল, কি হোলছে বল দেখি তোর? ক‍্যানে হামার কাছে এ‍্যাসিস ন‍্যা?
সাদের যেন এই মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল। সপাটে জবাব দেয়, ক‍্যানে যাব তুমার কাছে? তুমি একটা খারাপ লোক।
– ক‍্যানে ই-কথা বুলছি বাপ, কী কোর‍্যাছি হামি?
– হামার মাকে তুমি ক‍্যাড়হি লিয়‍্যাছো। তুমার ল‍্যাগি মা হামাকে আগের মিতুন ভালোবাসে না।
– কে বুল‍্যাছে তোকে ই-সব কথা?
– তাহালে মা ক‍্যানে আর হামার কাছে শোয় না, তুমার সাথে শোয়?
জাফেরুন চুলায় জ্বাল দিতে দিতে চাচা-ভাতিজার কথা শুনছিল। ছেলের কথা শুনে তার কান গরম হয়ে উঠল। – এতো চরম বেয়াদবি? চকিতে উঠে এসে সে প্রহার করতে শুরু করল। – হারামজাদা যতবড়ো মুখ লয় ততবড়ো কথা। এ‍্যাজ তোকে হামি ম‍্যারিই ফেলব।
বেদম মার খেয়েও সেদিন কাঁদেনি সাদের। এমনকি তার চোখ দিয়ে একফোঁটা পানি গড়াতে দেখা যায়নি। মায়ের হাত থেকে চাচা ছাড়িয়ে নেবার আগে মুহূর্ত পর্যন্ত সে ঠাঁই দাঁড়িয়েছিল এক জায়গায়। তারপর এক ছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল দিনকার মতো। সন্ধ‍্যাবেলা দাদো তাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল ঈদগাহ ময়দান থেকে।
সে সময় পড়শোনার তেমন চল ছিল না। বিশেষ করে মধ‍্য ও নিম্নবিত্ত মুসলমান পরিবারের লেখাপড়া করাকে বিলাসিতা ভাবা হত। ছেলেদের হাঁটতে শেখার সঙ্গে সঙ্গে ঠেলে দেওয়া হত মাঠের কাজে। মাটির কাজ করতে না পারুক, মুনিষের ভাত ক’টাতো বয়ে মাঠে নিয়ে যেতে পারলেই অনেক করা হয়। সেখানে সাদের দাদোর নিত‍্যসঙ্গী, যে কিনা এলাকার নামকরা চাষা। সকালে নাস্তাপানি খেয়ে পোতাকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে যায়। কিভাবে লাঙ্গলের মুঠো ধরতে হয়, কোদাল দিয়ে কিভাবে জমির আল ছাঁটতে হয় শিখিয়ে দেয়। বীজতলা থেকে চারা তোলার সময় কোথায় হাত দিয়ে টান দিলে চারাগাছ ছিঁড়ে না, হাত ধরে দেখিয়ে দেয়।
ওদিকে মা জাফেরুন সাফল‍্যের সাথে সংসার ধর্ম পালন করে ছলেছে। জন্ম দিয়েছে এক ছেলে, এক মেয়ের। তারাও বড়ো হচ্ছে পাশাপাশি। বাপের ঔরসজাত না হোক, এক মায়ের পেটের সন্তান। ভাইবোনদের যথেষ্ট ভালোবাসে সে। সময় পেলে তাদের সাথে খেলাধুলা করে, খুনসুটি করে। এসব দেখে জাফেরুন বিবির মন প্রসন্নতায় ভরে ওঠে। ভাবে ছেলে হয়তো তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। চেষ্টা করে কাছাকাছি হবার। কিন্তু পারে না। একটা সূক্ষ্ম অপরাধবোধ তাকে স্বাভাবিক হতে দেয় না। ওপরদিকে বয়স বাড়ার সাথে সাথে সাদের বুঝতে পারে মা ইচ্ছা করে তাকে দূরে সরিয়ে রাখেনি, পরিস্থিতির শিকার। সে ও চেষ্টা করে মায়ের কাছাকাছি হবার। কিন্তু মনের অন্তর্গহিনে সৃষ্ট শূন্যতা কিছুতে মেরামত করে উঠতে পারে না। যতদিন যায় ততই তাদের মধ‍্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।
কথায় আছে বিপদে রক্ত সাড়া দেয়। সেদিন মাঠ থেকে ফিরে সাদের লক্ষ করে আদিলের লুঙ্গি রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে। মা জাকেরুন অসুস্থ স্বামীকে বুকে ধরে বসে বসে কাঁদছে। সাদের নিঃশব্দে কাঁধের লাঙল গোয়ালঘরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখল। তারপর বলদ জোড়া গোয়ালঘরের খুঁটিতে বেঁধে রেখে দ্রূতপায়ে বেরিয়ে এসে মায়ের সামনে দাঁড়াল, চাচার লুঙ্গিতে এতো অক্ত ক‍্যানে মা?
– আল্লাহ্ জানে কী হোলছে। পেসাব করবো বুলি বাথরুমে য‍্যালো, ফিরলে দেখি এ‍্যাই অবস্থা। জাফেরুন বিবি ডুকরে কেঁদে উঠল।
মাকে কাঁদতে বারণ করে সাদের ছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। বারো-তেরো কিলোমিটার দূরে জঙ্গীপুর মহাকুমা হাসপাতাল। বড়ো বড়ো ডাক্তার আছে সেখানে। হাসপাতালের পরিসেবাও ভালো। সমস‍্যা রুগীকে হাসপাতাল পর্যন্ত প‍ৌঁছানো। সে সময় যানবাহনের এত বাড়বাড়ন্ত ছিল না। গরুগাড়ি করে নিয়ে যাওয়া যায়, তাতে করে ঘন্টা দেড়েক সময় লাগে। মন্দের ভালো ঘোড়াগাড়ি, আধঘন্টার মধ‍্যে পৌঁছানো যায়। পূর্বপাড়ার সাদেমানের ঘোড়াগাড়ি আছে। শরীর খারাপ তাই সেদিন বিকেলে সে গাড়ি নিয়ে বের হয়নি। রুগি নিয়ে যেতে হবে শুনে অসুস্থ শরীরেই গাড়িতে ঘোড়া জুতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
পরীক্ষানিরীক্ষা করে জানা গেল আদিলের দু’টো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। ডাক্তার সেদিনই জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন। তবে যদি অন্তত একটিও কিডনি প্রতিস্থাপন করা যায়….
জাফেরুন কিডনি দিতে চেয়েছিল। ব্লাড গ্রুপ ম‍্যাচ না করায় তা সম্ভব হয়নি। এদিকে আদিলের ছেলেমেয়েরা ছোট। তাদের কিডনি নিতে রাজি হলেন না ডাক্তার। বাকি থাকে সাদের, সে কি রাজি হবে? জাফেরুন বড়ছেলের কাছে মুখ খুলতে পারেনি। সাদের নিজেই বলেছিল, মা হামার কি হক ন‍্যাই চাচার ল‍্যাগি কিছু করার? হামাকে কিছু বুলছো না ক‍্যানে?
– উ হামার সোয়ামি, তু ব‍্যাটা। একজুনহা হামার কোলজ‍্যা তো একজুনহ‍্যা দিল। অর কিছু হোলে হামার কোলজ‍্যা ছিঁড়‍্যা যায়। তোর কিছু হলে দিল ফ‍্যাটে। তু-ই বোল হামি কি কোরব?
কিডনি প্রতিস্থাপনের জন‍্য আদিলকে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হল। সাদেরও নেওয়া হল হাসপাতালে। তাকে প্রস্তুত করা হচ্ছিল কিডনি দানের উপযুক্ত করে গড়তে। কিন্তু সব চেষ্টা ব‍্যর্থ করে দিয়ে হঠাৎ একদিন আদিলের হৃদযন্ত্র ক্রিয়া বন্ধ করে দিল। এই দূর্ঘটনায় জাফেরুনের জীবনে যেমন গভীর শূন‍্যতার সৃষ্টি হয়, তেমনি মা আর সন্তানের মাঝের সৃষ্ট ফাটল চিরদিনের মতো ভরাট হয়ে যায়।
তারও বছর খানেক আগে দাদো এস্তেফান এন্তেকাল করেছেন। এখন মাথার ছাতা বলতে মা। তাকে সামনে রেখে সংসারের হাল ধরে সাদের। প্রথমেই সে ভাইবোনের শিক্ষার ব‍্যাপারে যত্নবান হল। মিত্রপুর বেসিক স্কুলে ভর্তি করে দিল তাদের। বোনটা লেখাপড়ায় ততটা ভালো না হলেও ভাই নাদের অল্পদিনের মধ‍্যে জানান দেয় লম্বা রেসের ঘোড়া সে।
মেয়ের বয়স চোদ্দ-পনের হতে না হতে মা বিয়ের জন‍্য চাপাচাপি শুরু করে। না করে না সাদের। দেখেশুনে ভালো ঘরেই বোনের বিয়ে দিয়েছে। তা করতে গিয়ে চাচার ভাগের জমি সবটাই বেচতে হয়েছে।
যদিও সে সময় জাফেরুন আপত্তি জানিয়ে বলেছিল, বড়ো ঘরে বিহ‍্যা দিতে য‍্যাছি। অদের দাবিদাওয়া ম‍্যালা। তাপ্পর দানদেহাজের ব‍্যাপার আছে। এতো সামল‍্যাতে পারবিতো বাছা? ভালো কোরি ভ‍্যাবি দ‍্যাখ, এ‍্যাখুনও সময় আছে।
– ভাববার কিচ্ছু ন‍্যায় মা। ভালো ঘর, বোহিনটো ভালো থাকবে। আর কিছু দেখবো না হামি।
– কিন্তু বাবা সব জমি বেচে দিলে নাদের খ‍াবে কী?
– হামার জমি কি নাদেরের লয় মা? হামার যে টুকু আছে দু-ভ‍্যাইয়ে ভাগ করি লিব।
এরপর কিছু বলার থাকে না। জাফেরুন শুধু বড়ছেলের হাত ধরে বলেছিল, তু ছাড়া অর আর কেহু ন‍্যাই ব‍্যাট‍্যা। দেখিস বাপ ছ‍্যালাটো পাথারে ভ‍্যাসি না যায়।
কথা রেখেছে সাদের। ছোটভাইকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলেছে। নিজের ভাগের সম্পত্তি বেচে, পরের জমিতে জন খেটে তার পড়াশোনার খরচ যুগিয়েছে। সেই নাদের আজ উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরে। কলকাতায় অফিস তার, সেখানেই থাকে। মাসে ছ’মাসে গ্রামে আসে। তখন দূর দূর থেকে কত নামিদামি মানুষ দেখা করতে আসে। স‍্যার স‍্যার করে কথা বলে। গর্বে সাদেরের বুকের খাঁচা ফুলে সাত হাত হয়।
মা বেঁচে থাকতে সাদেরের বিয়ে দিয়েছিল। গ্রামেরই মেয়ে তাজকেরা। গরীব ঘরের মেয়ে। যেমন দেখতে, তেমনি তার মিস্টি আচারণ। জাফেরুন তাকে ছেলের জন‍্য মনোনীত করলে অনেকে ভালো ঘর দেখে সমন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিল। আসলে তারা বলতে চাইছিল অবস্থাপন্ন ঘরে ছেলের বিয়ে দিলে নগদের সাথে জমিজায়গাও কিছুটা পেতে পারে। জাফেরুন তাদের সটান জানিয়ে দেয়, ব‍্যাটার বিহ‍্যা দিবো, ভালো একখ‍্যান বহু আনবো। সুখ থ‍্যাকি বড় সম্পদ কি আছে?
পরের বছর আরসেলার জন্ম। কাকতালীয় হলেও ঘটনাটা সত‍্যি, সেদিনই চারকির নিয়োগপত্র হাতে পায় নাদের। সাদের মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে মেয়ের পয়ে-ই ভাইয়ের চাকরি। তাই বাড়িতে আরসেলার কদর খুব। চাচাও খুব ভালোবাসে মেয়েটিকে। যখনই গ্রামে আসে জামাকাপড়, দামি খেলনা, চকোলেট-হরলিক্স ইত‍্যাদি দামি খাবার নিয়ে আসে। দাদা-বৌদির জন‍্যও থাকে নানারকম উপহার। নিয়মিত টাকাপয়সাও দেয় সংসারে। সবমিলিয়ে সুখেই দিন কাটাচ্ছিল সাদের।
আলো ঝলমলে আকাশের বুক কালো করে কালবৈশাখী ঝড় ছুটে এসে যেমন সবকিছু তছনছ করে দিয়ে যায়, তেমনি সাদেরের সুখনিবাসে বুলডোজার চালিয়ে দিয়ে গলায় একটি ছোট টিউমার দেখা দিল। প্রথম প্রথম ততটা গুরুত্ব দেয়নি সে। কিন্তু দিন দিন সেটা বড়ো হতে থাকল, সঙ্গে অশেষ যন্ত্রণা। সহ‍্য করতে না পেরে একদিন ফোনে ভাইকে সব কথা জানায় সাদের। তৎক্ষণাৎ নাদের তাকে কলকাতা চলে আসতে বলে। ক‍্যানসার হয়েছিল তার গলায়। দীর্ঘ ছ’মাস কলকাতায় থেকে সুস্থ হয়ে দিনকতক হল বাড়ি ফিরেছে সে।
তাজকেরা থালাবাসন ধুয়ে বাড়ি ফিরলে সাদের চেপে ধরল, অ আরসেলার মা মুন্নাকুরির মাঠে য‍্যাতে বারুণ কোচ্ছো ক‍্যানে?
তাজকেরা ধোয়া থালাবাসন রান্নাঘরে রেখে এসে সাদেরের পাশে বসল। তারপর তার মাথাটা বুকে নিয়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ডাঙাখ‍্যান নাদেরকে এজেসটিরি করি দিয়‍্যাছি হামি।
একথা শুনে সাদেরের মুখ দিয়ে কথা সরে না। স্ত্রীর মুখপানে তাকিয়ে চুপ করে থাকে। তাজকেরা পুনরায় বলল, তুমার চিকিস্সা কত্তে তিন লাখ টাকার উপর খরচ হোলছে। এতোগুল‍্যান টাকা কি কেহু শুধু শুধু দ‍্যায়? হামিই বা ক‍্যানে লোকের দয়াদখিণা লিব।
ছাড়ো উসব, তুমি ভালো হুঁই বাড়ি ফির‍্যাছো হাজার শুকুর।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।