হৈচৈ গল্পে মুহাম্মদ সেলিম রেজা

ছাত্র চরিতামৃত



উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে বাবার অনুপ্রেরণায় গুটিকয়েক মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রী জোগাড় করে টিউশানি পড়াতে শুরু করেছি। একদিন পাশের গ্রামের এক ভদ্রলোক তাঁর অষ্টমশ্রেণী পড়ুয়া ছেলেকে পড়ানোর আবদার নিয়ে এলেন। বাড়িতে গিয়ে পড়াতে হবে, বিনিময়ে মাসে পাঁচশ টাকা পারিশ্রমিক দেবেন। সে সময় পাঁচশ টাকা মানে অনেক। লোভ সম্বরণ করা গেলা না, সপ্তাহে চারদিন সন্ধ্যার পর পড়াতে যাবার শর্তে রাজি হয়ে গেলাম। ভদ্রলোক খুশি মনে বিদায় হলেন।
পরদিন সাইকেলে চড়ে রওনা দিলাম নতুন ছাত্রের বাড়ির উদ্দেশ্যে। খুব বেশি কসরত করতে হল না। গ্রামের ভিতরে ঢুকে একজনকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি কাঙ্খিত বাড়িটা দেখিয়ে দিলেন। এগিয়ে গিয়ে বন্ধ দরজার কড়া নাড়ালাম। এক বুড়ি দরজার পাল্লা সরিয়ে আবির্ভূত হলেন। – কে গা! কি চায়?আজ্ঞে! এটাইতো বিশ্বনাথবাবুর বাড়ি?

হ্! কেন বলত?

আজ্ঞে! আমি বিশ্বনাথবাবুর ছেলেকে পড়াতে এসেছি।
বুড়ি বিস্ময়ে হাঁ হয়ে আমার আপদমস্তক জরিপ করতে থাকলেন, যেন আমি চুড়ান্ত কু-কথা বলে ফেলেছি। বেশ কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করার পর গলার স্বর উঁচু করে বললেন, অ বউমা বোল্টুর লয়া মাস্টার এয়েছে গা।
ভিতর থেকে অন্য এক মহিলার কন্ঠস্বর ভেসে এল, তাই নাকি? ভিতরে আসতে বলুন মা।

কিন্তু বউমা এযে একেবারে কচি ছেলে গা। এ কী আমাদের বল্টুকে সামলাতে পারবে?
মাধ্যমিকের ছেলেমেয়ে পড়াচ্ছি, ক্লাস এইটের ছেলেকে সামলাতে পারব না? বলে কী বুড়ি! প্রচণ্ড রাগে কপালের রগ চিনচিন করে উঠল। কোনরকমে রাগ দমন করে দাঁড়িয়ে রইলুম।
বুড়ি বলতে থাকলেন, শোন বাপু তোমাকে আগেভাগেই বলে রাখছি, বল্টু আমাদের খুব আদরের পুত। বেশি খাটাখাটনি করতে পারে না। খাতাকলমের কাজ সব তোমাকেই করে দিতে হবে। পাতার পর পাতা মুখস্ত করতে বলবে না, ও যতটুকু পারবে পড়বে।
সাবধান বাণী শুনিয়ে বুড়ি একপাশে সরে গিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার পথ করে দিলেন।
ছয় বাই সাত ফুটের ছোটঘর। একদিকের দু’টো আলমারিতে থরে থরে সাজানো নানারকম বইয়ের সম্ভার। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিম, নজরুল, সুকান্ত, মুস্তাফা সিরাজ, আশুতোষ, বিমল কর, সুনীল, শীর্ষেন্দু, কে নেই সেখানে? পাশাপাশি রয়েছে নানারকম গবেষণামূলক গ্রন্থ, ধর্মীয় পুস্তক। এসব দেখে মনে আশার আলো সঞ্চারিত হল, বাড়িতে লেখাপড়ার পরিবেশ আছে, তা নাহলে কেউ পকেটের কড়ি খরচ করে এত এত বই কেনে? বুড়ি পুরানো দিনের মানুষ তাই হয়তো একটু আলাদা স্বভাবের।
বিপরীত দিকে দেওয়ালের তাকে পরাপাটি করে সাজানো রয়েছে বল্টুর পাঠ্যপুস্তক, খাতা, সৌখিন কলমদানিতে একগাদা নানা রঙের বলপেন। তাকের নীচে একটা টেবিল, তার এপারে-ওপারে দু’খানা চেয়ার পাতা আছে। বুড়ি এপারের চেয়ারে বসতে ইশারা করে বললেন, আমাদের বোল্টু খুব ভালো ছেলে বুঝলে মাস্টার। আজ পযর্ন্ত কোন পরীক্ষায় ফেল করেনি।

বাহ্! বাহ্! বুড়িকে আর বললাম না ওটা তোমার নাতির ক্রেডিট নয়, সরকার বাহাদুরের বদ‍্যনতা।

দোষ বলতে মাঝে মাঝে মাথা গরম করে ফেলে। তখন ওর হুশ থাকে না, সামনে যাকে পায় আঁচড়ে-কামড়ে খাম করে দেয়।

সেকি!

এইতো গেল মাসের ঘটনা, দেবু মাস্টার চড় মারব বলায় বোল্টু পেপার ওয়েট ছুড়ে মেরেছিল। বেচারা কাটা কপাল নিয়ে সেই যে পালিয়েছে আর এ বাড়ি মুখো হয়নি।
একথা বলে বুড়ি ফোকলা মাড়ি বার করে খিকখিক করে হেসে উঠলেন। ততক্ষণে আমার বুকের ভিতরে সাইক্লোনের তাণ্ডব শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছিল কাঁটার আসনে বসে আছি। কেটে পড়ার চিন্তা মাথায় আসল। কিন্তু পাঁচশ টাকার মায়া ছেড়ে উঠতে পারলাম না।
এমনসময় পনেরো-ষোল বছরের দশাসই বল্টুকে নিয়ে এলেন তার মা । একগাল হেসে বললেন, এই নাও মাস্টার তোমার ছাত্র। তারপর ছেলেকে বললেন, একদম দুষ্টুমি করো না বল্টু সোনা। এই মাস্টার খুব ভালো। বকাঝকা করে না, মারে না।

না না। মারবো কেন? এস বস। যতটা সম্ভব গলার স্বর নরম করে বললাম।
বল্টুর মা সময় নষ্ট করলেন না। শ্বাশুরিকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তখন বল্টুকে বললাম, এস আজ আমরা অঙ্ক শিখি।
অঙ্কের কথায় বল্টু খোঁচা খাওয়া গোখরোর মতে কুটিল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। পরক্ষণে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, অঙ্ক খুব বাজে সাবজেক্ট। আমার একটুও ভাল্লাগে না। দুধে জল, তামায় লোহা, পেট্রোলে ডিজেল, সোনায় খাদ মেশানো, যতসব অনৈতিক কাজ করতে শেখানো হয়। তুমিই বল মাস্টার এসব ঠিক? দুধের দামে কেউ জল কিনবে কে?

ঠিক বলেছ বল্টু সোনা জল দিয়ে দুধের দাম নেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু এতে অঙ্কের দোষ কোথায়? অঙ্কে সাধারণত বলা হয়, যদি এমন হয় তাহলে কী হবে। তার মানে এই নয় যে তোমাকে তাই করতে হবে।
বল্টু চটাস করে টেবিলে চাপড় মেরে বলল, আমিতো সে কথাই বলছি, যা করা ঠিক নয় তা শিখে কাজ নেই। তুমি বরং অন্য সাবজেক্ট পড়াও।
কিছুতেই তাকে অঙ্কবই খোলানো গেল না। তখন তাকে ইংরেজি বই বার করতে বললাম। তা না করে সে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, বলো দেখি মাস্টার ‘টি-ও’ কি হয়।

যাচ্ছলে! শিক্ষক আমি না ও? মস্ত একটা ঢোক গিলে বললাম, টি-ও টু হয়।

আর ‘জি-ও’?

গো।

তা কেন হবে? ‘টি-ও’ টু হলে ‘জি-ও’ গু হওয়া উচিত। তেমনি বি-এ-এল-বি বাল্ব হলে টি-এ-এল-কে টল্ক না হয়ে টক হচ্ছে কী করে? তাই জন্যই আমি এই বিদঘুটে ভাষাটি মোটেই সহ্য করতে পারি না।

ইতিহাস পড়তে তোমার কেমন লাগে? এখানে আমার চিড়ে ভিজবে না বুঝেও পাঁচশ টাকার চাকরিটা ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা আর কি।

ছো! ওটা আবার পড়ার বিষয় হল নাকি? পাতায় পাতায় শুধু পরনিন্দা-পরচর্চা। আকবর ভালো মানুষ ছিলেন না খারাপ, শাহজাহান তাজমহল বানিয়ে ঠিক করেছেন না ভুল। শিবাজি সত্যিকারের রাজা ছিলেন নাকি ডাকাত। অশোক তার শত ভাইকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেছেন। জগৎশেঠ, মীরজাফররা বিশ্বাসঘাতকতা করে নবাব সিরাজকে যুদ্ধে হারিয়েছেন। তুমিই বলো মাস্টার এভাবে লোকের কেচ্ছাকাহিনি ঘাটাঘাটি করা কী ঠিক?

না মানে! বলছিলাম কী….

আমাদের পূর্বপুরুষরা দেখতে কেমন ছিল, কি খেত, কোথায় বাস করত ইত্যাদি জানতে গেলে ইতিহাস পড়তে হবে। একথাই বলবে তুমি। কিন্তু….
ততক্ষণে আমার মাথা ঘুরতে শুরু করেছে, গা গোলাচ্ছে। অপরাগতা স্বীকার করে হতাশ কন্ঠে বললাম, ক্ষমা কর বল্টু তোমাকে পড়ানো আমার কর্ম নয়।

জানিতো তোমার দ্বারা হবে না। বাবাটাও তেমনি, যাকে তাকে ধরে এনে মাস্টারের চেয়ারে বসিয়ে দিচ্ছে।

ওয়াক! বল্টুর কথা শুনে আমার পাকস্থলি মন্থন করে তেঁতো ঢেকুর উঠে আসতে চাইল। অশোভন হবে বলে ঢক করে গিলে ফেললাম।
বল্টু বলতে থাকল, যাবার আগে ভূগোলের বিষয়ে আমার ওপিনিয়ন শুনবে না? ভূগোল হল গিয়ে….থাক আর শুনে লাভ নেই, আমি বরং এখন আসি। পাঁচশ টাকার মোহ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। অমনি বল্টু চিৎকার দিয়ে উঠল, ও ঠাম্মা বাঁচাও। বাঁচাও। নতুন মাস্টার আমাকে মেরে ফেলল।
ঘটনার আকস্মিকতায় আমি স্তম্ভিত। এই মুহূর্তে করণীয় কি স্থির করতে না পেরে স্থির হয়ে দাঁড়িয় থাকি। বল্টু সমানে চিৎকার করে যাচ্ছে – বাঁচাও। বাঁচাও। বাঁচাও।
বল্টুর আর্তনাদ ঠাম্মার কানে পৌঁচেছে। তিনি ঝাড়ু হাতে দৌড়ে আসছেন এদিকে। মুখের কী চোপা? বাপরে বাপ! – ওলাউঠো। ঘাটের মরা। পইপই করে বারণ করলুম তাও তুই বল্টুর গায়ে হাত দিয়েছিস। দাঁড়া মিনসে, মাস্টারি করার সাধ আজ তোর মিটিয়ে তবে ছাড়ব।
পাঁচশ টাকা হাত ছাড়া হওয়ায় এমনিতেই বুকের ভেতরটা কচকচ করছিল। তারওপর বুড়ির খিস্তিখেউর। মেজাজ গেল বিগড়ে। চট করে ইতিকর্তব‍্য স্থির করে দরজার মুখে এসে পাল্লার আড়ালে পজিশন নিয়ে দাঁড়ালাম। তারপর যেই সে ঘরে ঢুকেছে, সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পাছায় দিলাম একলাথ। অতর্কিত আক্রমণে টালসামলাতে না পেরে বুড়ি টেবিলের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
এই সূযোগে রাস্তায় নেমে সাইকেল নিয়ে দিলাম দৌড়। শুনতে পাচ্ছি বুড়ি তারস্বরে চিৎকার করছে, ওরে কে আছিস মিনসেকে ধর। ওলাউঠো আমার কোমর কোমর ভেঙে দিয়ে পাল্লাছে। ওরে ধর ধর ধর।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।